ভারতে আন্দোলনরত তরুণদের প্রতি সংহতি জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের আটক, ইন্টারনেট বন্ধ এবং প্রতিবাদ কর্মসূচিতে বিধিনিষেধ আরোপের ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে তিনি আন্দোলনকারীদের পাশে থাকার ঘোষণা দিয়েছেন।
শনিবার (১০ অক্টোবর) এক বিবৃতিতে ভারতের তরুণ ও গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোর প্রতি সংহতি জানান নাহিদ ইসলাম।
বিবৃতিতে তিনি বলেন, “নির্বাচনী জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার দাবিতে আন্দোলনরত ভারতের তরুণদের সঙ্গে আমরা দৃঢ় সংহতি প্রকাশ করছি। নয়াদিল্লিতে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারী, সংগঠক ও সাংবাদিকদের সাম্প্রতিক আটক, পাশাপাশি ইন্টারনেট বন্ধ এবং যন্তর মন্তরে বিধিনিষেধ আরোপ মৌলিক স্বাধীনতার জন্য সরাসরি হুমকি। নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা ও প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা নিয়ে ওঠা প্রশ্নের স্বচ্ছ জবাব প্রয়োজন, ব্যারিকেড ও সেন্সরশিপ নয়।”
নাহিদ ইসলাম বলেন, “এই লড়াই শুধু আপনাদের নয়। জবাবদিহিমূলক ক্ষমতা, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও মানবিক মর্যাদার অভিন্ন দাবিতে একে অপরের বন্ধু হিসেবে ঢাকা থেকে আমরা আপনাদের পাশে আছি।’’
বিবৃতিতে বাংলাদেশের ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমরা এই লড়াইকে গভীরভাবে বুঝি, কারণ আমরাও এর মধ্য দিয়ে গিয়েছি। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে নিয়োগের ক্ষেত্রে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ১৫ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়।
রাষ্ট্র এর জবাবে প্রাণঘাতী গুলি ব্যবহার করে। পরে জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, ওই অভ্যুত্থান ও তা দমনের ঘটনায় ১ হাজার ৪০০ জন পর্যন্ত নিহত হয়ে থাকতে পারেন। আমাদের আন্দোলনের সময় ভারতীয় শিক্ষার্থী, লেখক ও স্বাধীন কণ্ঠের মানুষ যে সংহতি জানিয়েছিলেন, তা আমরা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি।”
ভারতের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসের প্রশংসা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, “ভারতের গণতান্ত্রিক প্রতিরোধের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য রয়েছে। দিল্লির শীত উপেক্ষা করে শাহিনবাগের নারীরা সমান নাগরিকত্বের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় (জেএনইউ) ও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রজন্মের পর প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা সংগঠিত প্রতিবাদের ধারা ধরে রেখেছেন।
এগুলো গণতন্ত্রের অমূল্য উত্তরাধিকার। আজ আবারও ভারতের তরুণীদের রাজপথে সাহসী ভূমিকা রাখতে দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশেও জুলাই বিপ্লবে নারীরা সামনের সারিতে ছিলেন। তাদের সাহস ও আত্মত্যাগ আমাদের বিজয় অর্জনে সহায়তা করেছে।”
বিবৃতিতে হিন্দুত্ববাদী সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদ, ফ্যাসিবাদ ও ধর্মীয় আধিপত্যবাদের বিরোধিতা করে তিনি বলেন, “হিন্দুত্ববাদী সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদ, ফ্যাসিবাদ ও যেকোনো ধরনের ধর্মীয় আধিপত্যবাদ দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে না। বাংলাদেশে যেমন কর্তৃত্ববাদ, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ও রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা প্রত্যাখ্যান করি, তেমনি ভারতেও এসবের বিরোধিতা করি।
ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ কিংবা শ্রেণি নির্বিশেষে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সামাজিক ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে আমাদের অভিন্ন ভবিষ্যৎ গড়ে উঠতে হবে। সংখ্যালঘুরা ভয়ের মধ্যে থাকলে, ভিন্নমতকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হলে এবং পরিচয়ের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব নির্ধারিত হলে কোনো সমাজই প্রকৃত গণতান্ত্রিক হতে পারে না।”
ভারত সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, “শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। আটক আন্দোলন সংগঠকদের অবস্থান ও আটকের আইনি ভিত্তি জানাতে হবে। অধিকার চর্চার কারণে আটক ব্যক্তিদের অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে এবং সাংবাদিকদের ভয়ভীতি বা সরঞ্জাম জব্দের আশঙ্কা ছাড়াই সংবাদ সংগ্রহের সুযোগ দিতে হবে।”
ভারতে তরুণ আন্দোলনকারীদের আটক ও দীর্ঘদিন কারাবন্দি থাকার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, “আজ অনেক তরুণ নেতাকে অন্যায়ভাবে আটক করা হয়েছে। শারজিল ইমাম ও উমর খালিদ বছরের পর বছর বিচার ছাড়াই কারাগারে রয়েছেন। ভারতের সব তরুণ বিক্ষোভকারী ও বন্দিকে আমরা সহযোদ্ধা হিসেবে দেখি। তাদের সাহস দক্ষিণ এশিয়ার তরুণদের অনুপ্রাণিত করে।”
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার বিভিন্ন অমীমাংসিত বিষয়ও দুই দেশের জনগণের অভিন্ন স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত বলে উল্লেখ করেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, “আমাদের সংগ্রাম পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। সীমান্তে হত্যাকাণ্ড, পানিবণ্টন, পরিবেশ সুরক্ষা ও জাতীয় সার্বভৌমত্বের মতো অমীমাংসিত বিষয়গুলোও এর অন্তর্ভুক্ত।
আমরা এমন একটি দক্ষিণ এশিয়া চাই, যেখানে দেশগুলো একে অপরকে সমান মর্যাদায় বিবেচনা করবে, সরকারগুলো জবাবদিহির আওতায় থাকবে এবং আধিপত্য বিস্তারের অজুহাত হিসেবে সার্বভৌমত্বকে ব্যবহার করা হবে না।”
বিবৃতির শেষে ভারতের গণতন্ত্রকামী জনগণের প্রতি সংহতি জানিয়ে তিনি বলেন, “ঢাকা থেকে এবং আমাদের জুলাই প্রজন্মের অপূর্ণ গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার জায়গা থেকে আমরা আপনাদের পাশে আছি। দৃঢ় থাকুন, একে অপরকে রক্ষা করুন, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ প্রত্যাখ্যান করুন এবং দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎকে ফ্যাসিবাদ ও বিভাজনের হাতে ছেড়ে দিতে অস্বীকার করুন। ইনকিলাব জিন্দাবাদ।”
উল্লেখ্য, ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সাত হাজারের বেশি আন্দোলনকারীকে আটক করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগে মামলা করার প্রস্তুতি চলছে। শনিবার (১০ অক্টোবর) দিল্লি পুলিশের কর্মকর্তাদের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে টাইমস অব ইন্ডিয়া।
ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) উদ্যোগে আয়োজিত এ বিক্ষোভের মূল দাবি ছিল প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়া এবং ভোটার নিবন্ধনের জন্য ব্যবহৃত ফরম-৬-সংক্রান্ত পরিবর্তন নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ তুলে এই কর্মসূচির ডাক দেয়া হয়।