বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির জানিয়েছেন, সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনের আজই তার শেষ দিন। দীর্ঘ ও ঘটনাবহুল এই দায়িত্বকাল শেষে বিদায়ের মুহূর্তে সহযোদ্ধাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোর পাশাপাশি নিজের বিভিন্ন সাফল্য, ব্যর্থতা ও অপূর্ণতার কথাও তুলে ধরেছেন তিনি।
শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সকালে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক দীর্ঘ স্ট্যাটাসে এসব কথা জানান নাছির উদ্দীন নাছির।
তিনি বলেন, ‘ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনের আজ শেষ দিন। এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘ, কঠিন, ঘটনাবহুল এবং একই সঙ্গে গৌরবের একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটছে।’ বিদায়ের মুহূর্তে সংগ্রাম, সাফল্য, ব্যর্থতা, আনন্দ-বেদনা এবং সহযোদ্ধাদের ভালোবাসার অসংখ্য স্মৃতি মনে পড়ছে বলেও জানান তিনি।
নোয়াখালীর সুবর্ণচরের সন্তান নাছির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। ২০২৪ সালের ১ মার্চ সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান তিনি। রাজনীতি শুধু পদ-পদবির বিষয় নয় উল্লেখ করে নাছির বলেন, মানুষের জন্য কাজ করা, সংকটে পাশে দাঁড়ানো এবং নিজের বিশ্বাসের পক্ষে দাঁড়িয়ে থাকার নামই রাজনীতি।
নিজের দায়িত্বকালের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায় হিসেবে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের কথা উল্লেখ করেন নাছির। ওই সময় ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের রাজপথে সক্রিয় রাখা, সাহস জোগানো এবং সংগঠনের প্রতিটি স্তরকে আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত রাখা বড় চ্যালেঞ্জ ছিল বলে জানান তিনি।
জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে নাহিদ, আসিফ, হাসনাত, সারজিস, কাদের, মাহিন, রিফাত রশিদ ও হান্নান মাসুদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন নাছির। আন্দোলনের সময় তারা ছাত্রদলকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করেছেন জানিয়ে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি। তবে পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় ছাত্রদলের অবদান সবসময় সমানভাবে স্বীকার করা হয়নি বলেও মন্তব্য করেন।
আন্দোলনের পর নোয়াখালী ও ফেনীতে ভয়াবহ বন্যার সময় দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অভিজ্ঞতাও তুলে ধরেন নাছির। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের নির্দেশনায় তিনি বন্যাকবলিত এলাকায় গিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ান। এই অভিজ্ঞতা তাকে শিখিয়েছে, রাজনীতি শুধু মিছিল-মিটিং নয়; মানুষের দুর্দিনে পাশে দাঁড়ানোও রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
নিজের দায়িত্বকালে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ‘মব সংস্কৃতি’, অপপ্রচার, বিভ্রান্তি ও রাজনৈতিক চাপকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন নাছির। এসব পরিস্থিতির মধ্যেও সংগঠনের নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ রাখা এবং দায়িত্বশীল রাজনৈতিক আচরণ নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছেন বলে জানান তিনি।
সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে নাছির জানান, তার দায়িত্বকালে দুই হাজারের বেশি সাংগঠনিক কমিটি গঠিত হয়েছে। তবে এটিকে নিজের ব্যক্তিগত কৃতিত্ব হিসেবে দেখতে চান না তিনি। ছাত্রদলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের সম্মিলিত পরিশ্রমেই এটি সম্ভব হয়েছে বলে উল্লেখ করেন।
দায়িত্ব পালনের কিছু অপূর্ণতার কথাও স্বীকার করেন নাছির। বিশেষ করে কেন্দ্রীয় কমিটির বর্ধিত অংশ সম্পন্ন করতে না পারার আক্ষেপ থাকবে বলে জানান তিনি। এ ছাড়া ছাত্রসংসদ নির্বাচনে প্রত্যাশিত ফলাফল না পাওয়াকেও নিজের দায়িত্বকালের অন্যতম আক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন।
নাছির বলেন, রাজনীতিতে পরাজয়ও শিক্ষা দেয়। কোথায় ঘাটতি ছিল এবং কোথায় আরও ভালো করা যেত, তা নিয়ে তিনি নিজেকেই প্রশ্ন করেছেন। এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে ছাত্রদল আরও শক্তিশালী, গ্রহণযোগ্য ও সংগঠিত হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
দায়িত্ব পালনের সময় পাশে থাকার জন্য বেগম খালেদা জিয়া, বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান, মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, রুহুল কবির রিজভী, ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক রকিবুল ইসলাম বকুলসহ বিএনপি ও ছাত্রদলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান নাছির। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয়, জেলা, মহানগর, বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
নিজের দায়িত্বকালের ভুল ও সীমাবদ্ধতার কথাও তুলে ধরেন তিনি। কোনো আচরণে কেউ কষ্ট পেয়ে থাকলে, কোনো সিদ্ধান্তে অন্যায় হয়ে থাকলে কিংবা কারও প্রাপ্য সম্মান দিতে ব্যর্থ হলে সহযোদ্ধাদের কাছে ক্ষমা চান নাছির।
তবে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব ছাড়লেও ছাত্রদল থেকে বিদায় নিচ্ছেন না বলে স্পষ্ট করেন তিনি। নাছির বলেন, ‘পদ থেকে বিদায় নেওয়া যায়, কিন্তু আদর্শ, ভালোবাসা ও সহযোদ্ধাদের কাছ থেকে বিদায় নেওয়া যায় না।’
নতুন নেতৃত্বের প্রতি আস্থা প্রকাশ করে নাছির বলেন, আগামী দিনে তাদের নেতৃত্বে ছাত্রদল আরও শক্তিশালী, সংগঠিত ও গতিশীল হবে। নতুন নেতৃত্বের প্রয়োজন হলে আগের মতোই পাশে থাকার প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেন তিনি।
সবশেষে নাছির উদ্দীন নাছির বলেন, তিনি একটি দায়িত্ব থেকে বিদায় নিচ্ছেন, তবে সম্পর্ক, সংগ্রাম ও আদর্শ থেকে নয়। ভবিষ্যতে অন্য কোনো প্ল্যাটফর্মে কিংবা অন্য কোনো দায়িত্বে আবারও দেখা হবে। একই সঙ্গে একটি সুখী, সমৃদ্ধ ও সফল বাংলাদেশের প্রত্যাশা জানিয়ে ছাত্রদল সেই বাংলাদেশ গড়ার লড়াইয়ে অবিচল থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।