আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র ৬০–৭২ ঘণ্টা আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকার একটি বড় বাণিজ্যিক চুক্তি স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ। সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) সকালে ওয়াশিংটন ডিসিতে বাংলাদেশের একটি প্রতিনিধিদল ১০ বছর মেয়াদি এ দ্বিপাক্ষিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। সময় ও প্রেক্ষাপট বিবেচনায় অন্তর্বর্তী সরকারের এই পদক্ষেপকে কূটনৈতিক ক্ষেত্রে তাড়াহুড়ো ও বিতর্কিত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
চুক্তির মূল অংশ হিসেবে রাষ্ট্রায়ত্ত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স–এর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের Boeing থেকে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনা হচ্ছে, যার মোট মূল্য ৩.৭ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা)। এর মধ্যে রয়েছে আটটি বোয়িং ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার, দুটি ৭৮৭-৯ এবং চারটি ৭৩৭-৮ ম্যাক্স বিমান।
বিমান কর্তৃপক্ষ দাবি করছে, বহরের দীর্ঘদিনের সংকট নিরসন ও পতাকাবাহী সংস্থার ভবিষ্যৎ টিকিয়ে রাখতে এ ক্রয় অপরিহার্য। তবে অর্থনীতিবিদ ও আইন বিশেষজ্ঞরা এটিকে “নীতিগত মৌলিক লঙ্ঘন” হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন। তাদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকার যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসী বাণিজ্য নীতি সামাল দিতে রাষ্ট্রীয় ঋণকে কার্যত ‘কূটনৈতিক মুদ্রা’ হিসেবে ব্যবহার করছে, যা জাতীয় কোষাগারের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বিমান চলাচল কৌশলেরও পরিপন্থী। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বহরে বৈচিত্র্য আনতে বোয়িংয়ের পাশাপাশি এয়ারবাস কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর ঢাকা সফরের সময় ১০টি এয়ারবাস A350 কেনার সিদ্ধান্ত হলেও ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সে পরিকল্পনা কার্যত বাতিল হয়ে যায়।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রশাসনের শুল্ক চাপের মুখে পড়ে বাংলাদেশ। ওয়াশিংটন প্রথমে বাংলাদেশি রপ্তানির ওপর ৩৭ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপের হুমকি দেয়, যা পরে আলোচনার মাধ্যমে ২০ শতাংশে নামানো হয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও নীতিনির্ধারক মহলের ধারণা, এই বোয়িং চুক্তি এবং তুলা আমদানির প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর কৌশল নেওয়া হয়েছে।
সূত্র জানায়, ১৪টি বিমান কেনা হচ্ছে প্রথম ধাপে। প্রকৃত পরিকল্পনায় মোট ২৫টি বোয়িং কেনার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যা ২০২৫ সালের জুনেই নীতিগতভাবে চূড়ান্ত হয়েছিল। তবে ইউরোপীয় কূটনীতিকদের অসন্তোষ এড়াতে তা প্রকাশ্যে আনা হয়নি।
চুক্তির অর্থায়নের ক্ষেত্রে সরকার নিজেই গ্যারান্টর হিসেবে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকেই অর্থ পরিশোধ করতে হবে। অথচ ২০২৪–২৫ অর্থবছরে বিমান ৯.৩৭ বিলিয়ন টাকার নিট মুনাফা দাবি করলেও নিরীক্ষকদের মতে, প্রতিষ্ঠানটির ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা এখনও অত্যন্ত দুর্বল। বর্তমান ঋণ-ইকুইটি অনুপাত প্রায় ৪:১, যেখানে শিল্পের আদর্শ অনুপাত ১.৫:১।
নিরাপত্তা ঝুঁকির প্রশ্নও উঠেছে। গত তিন বছরে বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স মডেলের অন্তত চারটি দুর্ঘটনা তদন্তাধীন রয়েছে, যা এসব উড়োজাহাজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই চুক্তি দেশের প্রতিযোগিতা আইন ২০১২-এর সঙ্গেও সাংঘর্ষিক। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো—এই চুক্তির অর্থ পরিশোধের দায় আগামী নির্বাচিত সরকারকে বহন করতে হলেও, কোনো বিমান বর্তমান সরকারের মেয়াদে দেশে আসবে না। সবকিছু ঠিক থাকলে বোয়িংগুলো সরবরাহ শুরু হবে ২০৩১ সালের অক্টোবরের পর।
সব মিলিয়ে, নির্বাচনের প্রাক্কালে এমন বহুবিলিয়ন ডলারের দায়বদ্ধতা তৈরি করা নিয়ে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও আইনি অঙ্গনে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।