যাত্রীদের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে বাংলাদেশ রেলওয়ের লোকোমোটিভ ও কোচ (ক্যারেজ) সংখ্যা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার বলে জানিয়েছেন রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ। তিনি বলেন, নতুন রেলপথ নির্মাণের পাশাপাশি পর্যাপ্ত লোকোমোটিভ ও কোচ সংগ্রহের মাধ্যমে যাত্রীসেবা সম্প্রসারণে সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) সচিবালয়ে নিজ কার্যালয়ে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রতিমন্ত্রী এসব কথা জানান।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও যোগাযোগ অবকাঠামোর উন্নয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। এর অংশ হিসেবে বাংলাদেশ রেলওয়েকে আধুনিক, নিরাপদ ও জনবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থায় রূপান্তরের লক্ষ্যে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
প্রতিমন্ত্রী জানান, বর্তমানে রেলওয়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো লোকোমোটিভ ও কোচের ঘাটতি। ফলে যাত্রীদের চাহিদা অনুযায়ী ট্রেন পরিচালনা সম্ভব হচ্ছে না। নতুন রেললাইন নির্মিত হলেও পর্যাপ্ত ইঞ্জিন ও কোচের অভাবে অনেক ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত সেবা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
এই সংকট মোকাবিলায় নতুন লোকোমোটিভ ও কোচ সংগ্রহে সম্ভাব্যতা যাচাই, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং ক্রয় প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
হাবিবুর রশিদ বলেন, ভারত থেকে প্রায় ২০০টি ব্রডগেজ কোচ ও লোকোমোটিভ আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এগুলো যুক্ত হলে ব্রডগেজ লাইনের বিদ্যমান সংকট অনেকটাই কমবে। তবে মিটারগেজ অঞ্চলে এখনও উল্লেখযোগ্য চাপ রয়েছে। নতুন মিটারগেজ লোকোমোটিভ সংগ্রহ না হওয়া পর্যন্ত সেখানে কাঙ্ক্ষিত উন্নতি সম্ভব হবে না।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগামী এক থেকে দুই বছরের মধ্যে নতুন লোকোমোটিভ সংগ্রহের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হবে এবং এতে যাত্রীসেবার মান আরও উন্নত হবে।
ভবিষ্যতে নতুন রেললাইন নির্মাণের সঙ্গে সমন্বয় করেই প্রয়োজনীয় লোকোমোটিভ ও কোচ সংগ্রহ করা হবে, যাতে নতুন রেলপথ চালুর সঙ্গে সঙ্গেই পূর্ণাঙ্গ যাত্রীসেবা নিশ্চিত করা যায় বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী।
নতুন প্রকল্পের বিষয়ে তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জ-কুমিল্লা কর্ড লাইন নির্মাণের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা চলছে এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি সিরাজগঞ্জ-বগুড়া নতুন রেললাইন প্রকল্পের কাজও এগিয়ে চলছে। এটি বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার মধ্যে যাতায়াতের সময় ও দূরত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।
রাজধানী ঢাকার সঙ্গে আশপাশের জেলার রেল যোগাযোগ আরও শক্তিশালী করতে গাজীপুর, মুন্সীগঞ্জ, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ ও ভাঙ্গাসহ বিভিন্ন এলাকায় কমিউটার ট্রেন সার্ভিস সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। এর ফলে কর্মজীবী মানুষ সকালে ঢাকায় এসে কাজ শেষে বিকেলে নিজ গন্তব্যে ফিরতে পারবেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, আগে আমদানি করা ডেমু ট্রেনগুলোর ভবিষ্যৎ ব্যবহার নিয়েও নতুন পরিকল্পনা করা হচ্ছে। সরকারি ব্যবস্থাপনায় মেরামতের পরিবর্তে বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে সেগুলো সচল করার সম্ভাবনা যাচাই করা হচ্ছে। এ বিষয়ে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
রেলওয়ের আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটসহ বিভাগীয় শহর এবং গুরুত্বপূর্ণ জংশন স্টেশনগুলোকে বাণিজ্যিকভাবে আরও উন্নত করার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে আধুনিক যাত্রীসেবা, উন্নত অপেক্ষাকক্ষ, বাণিজ্যিক সুবিধা এবং স্টেশন ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন করা হবে।
তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে নতুন লোকোমোটিভ ও কোচে যাত্রীদের জন্য ইন্টারনেট সুবিধা চালুর লক্ষ্যে প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি রেলওয়ের অব্যবহৃত জমি ও অবকাঠামো কাজে লাগিয়ে বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে প্রথমে রেলের নিজস্ব বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ করা হবে এবং অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করে আয় ভাগাভাগির ব্যবস্থা করা হবে।
নিরাপত্তা জোরদারে সারাদেশের রেল লেভেল ক্রসিং আধুনিকায়নের কাজ শুরু হয়েছে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী। এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক হয়েছে। এছাড়া যানজট কমাতে গুরুত্বপূর্ণ রেলক্রসিংগুলোতে আন্ডারপাস ও ওভারপাস নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
রেলপথের গেজ ব্যবস্থা সম্পর্কে তিনি বলেন, সরকারের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হলো ধীরে ধীরে পুরো রেল নেটওয়ার্ককে ব্রডগেজে রূপান্তর করা। যেখানে প্রয়োজন সেখানে ডুয়েল গেজ রাখা হবে। এতে পরিচালন ব্যয় কমবে এবং রেল পরিচালনা আরও সহজ ও কার্যকর হবে।
আন্তঃনগর ট্রেনে স্ট্যান্ডিং টিকিটের বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকার এ ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করে না। তবে অতিরিক্ত যাত্রীচাপের কারণে অনেক সময় বাধ্য হয়ে স্ট্যান্ডিং টিকিট দিতে হয়।
তিনি বলেন, একজন যাত্রী এসি চেয়ারে বসে ভ্রমণ করবেন, আর তার মাথার ওপর আরেকজন দাঁড়িয়ে থাকবেন—এটি কোনোভাবেই কাম্য নয়। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় অতিরিক্ত চাহিদার কারণে এই ব্যবস্থা চালু রাখতে হচ্ছে।
প্রতিমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, নতুন লোকোমোটিভ, কোচ ও ট্রেন যুক্ত হলে যাত্রীসেবা আরও সম্প্রসারিত হবে, অতিরিক্ত চাপ কমবে এবং ধীরে ধীরে স্ট্যান্ডিং টিকিটের প্রয়োজনও হ্রাস পাবে। একই সঙ্গে রেলসেবা নিয়ে যাত্রীদের অভিযোগও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।
তিনি বলেন, সরকারের লক্ষ্য শুধু নতুন রেললাইন নির্মাণ নয়; বরং আধুনিক প্রযুক্তি, পর্যাপ্ত লোকোমোটিভ, উন্নত স্টেশন, নিরাপদ অবকাঠামো এবং মানসম্মত যাত্রীসেবা নিশ্চিত করে বাংলাদেশ রেলওয়েকে একটি সময়োপযোগী, আধুনিক ও নির্ভরযোগ্য গণপরিবহন ব্যবস্থায় পরিণত করা।