চীনের অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সহায়তায় বাংলাদেশে একের পর এক বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে, যা দেশের উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করেছে। তবে এর পাশাপাশি বাড়ছে আমদানিনির্ভরতা, বিস্তৃত হচ্ছে বাণিজ্য ঘাটতি এবং ঋণের শর্ত ও ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য নিয়ে নতুন প্রশ্নও উঠছে। ফলে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক এখন শুধু উন্নয়নের নয়, অর্থনৈতিক নির্ভরতা ও সম্ভাব্য ঝুঁকির আলোচনাতেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিশ্লেষক বলেন, চীন বাংলাদেশের পরীক্ষিত অর্থনৈতিক অংশীদার। দেশটির ঋণ সহায়তায় অবকাঠামো খাতে উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন হয়েছে। তবে ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে এবং ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি অনুসরণ করা জরুরি। তার মতে, চীন মূলত নিজেদের কৌশলগত স্বার্থে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) বাস্তবায়নে আগ্রহী, তাই বাংলাদেশকে সতর্ক ও কৌশলী অবস্থান নিতে হবে।
অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণের ১০ শতাংশেরও কম চীনের, যা জাপানের ঋণের কাছাকাছি। অথচ চীনা ঋণ নিয়ে যে সমালোচনা হয়, জাপানের ক্ষেত্রে তা দেখা যায় না। তার মতে, এসব সমালোচনার পেছনে রাজনৈতিক কারণও রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চীন থেকে আমদানি হয়েছে ১৮ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলারের পণ্য, যা দেশের মোট আমদানির প্রায় ২৭ শতাংশ। আগের অর্থবছরে এ পরিমাণ ছিল ১৬ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলার। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম দুই প্রান্তিকেই আমদানি ৯ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে, যা চীনের ওপর নির্ভরতার ধারাবাহিকতা নির্দেশ করে।
চীন থেকে আমদানিকৃত পণ্যের বড় অংশই যন্ত্রপাতি, শিল্প সরঞ্জাম ও কাঁচামাল। বিশেষ করে পোশাকশিল্পের উৎপাদন ব্যাপকভাবে এসব কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীল। ব্যবসায়ীদের মতে, প্রতিযোগিতামূলক মূল্য, শক্তিশালী সরবরাহব্যবস্থা এবং কম লিড-টাইমের কারণে চীনের কার্যকর বিকল্প খুঁজে পাওয়া কঠিন। অনেক ক্ষেত্রে অন্যান্য উৎসের তুলনায় চীনা পণ্য প্রায় ২৮ শতাংশ কম দামে পাওয়া যায়।
বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক ও ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে কাঁচামাল সরবরাহে চীনের প্রায় একচেটিয়া প্রভাব রয়েছে। কম দাম, বৈচিত্র্য ও উন্নত মানের কারণে চীনা পণ্যের চাহিদা বেশি। তবে অতিনির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তার মতে, চীনের বিকল্প অন্য কোনো দেশ নয়; বরং দেশীয় কাঁচামাল উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমেই নির্ভরতা কমানো সম্ভব।