মুন্সিগঞ্জ প্রতিনিধি
মুন্সিগঞ্জের টঙ্গীবাড়ী উপজেলার দিঘীরপাড় ইউনিয়নের দক্ষিণাঞ্চল ও এর সঙ্গে সংযুক্ত বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলের বাসিন্দারা দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়নের বৈষম্যের শিকার বলে অভিযোগ করেছেন। তাদের দাবি, প্রায় আড়াই দশক ধরে দিঘীরপাড়ে একটি সেতু নির্মাণ, নদীভাঙন রোধে স্থায়ী বেড়িবাঁধ এবং গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো পাকা করার দাবি জানিয়ে এলেও এখনো দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি।
ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় প্রতিনিয়ত দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
দিঘীরপাড়ের দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে সংযুক্ত রয়েছে মুন্সিগঞ্জের চরবাংলাবাজার, শরীয়তপুর জেলার শিলই, নওপাড়া, চরআত্রা, কাঁচিকাটা, কুন্ডেরচর, কোরবি ও মনিরাবাজসহ বিভিন্ন চরাঞ্চল। এছাড়া চাঁদপুর ও কুমিল্লা জেলার কিছু চরাঞ্চলের মানুষও এই পথ ব্যবহার করেন। স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রায় ১০টি ইউনিয়নের লক্ষাধিক মানুষের যাতায়াত ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এই যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল।
তাদের মতে, একটি সেতু, স্থায়ী বেড়িবাঁধ ও পাকা সড়ক নির্মিত হলে শুধু যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হবে না, বরং শিক্ষা, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
গত ৭ জুন মুন্সিগঞ্জের জেলা প্রশাসক দিঘীরপাড় ইউনিয়নের কান্দারবাড়ি নদীভাঙন এলাকা পরিদর্শন করে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সঙ্গে কথা বলেন এবং ভাঙনের পরিস্থিতি সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করেন।
এরপর ১১ জুন উন্নয়নের বৈষম্য দূর করা এবং চার দফা দাবি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে চরাঞ্চলের সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে বিশাল মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।
এতে নারী-পুরুষ, শিক্ষার্থী, কৃষক, জেলে, ব্যবসায়ী, যুব সমাজ ও আলেম সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। বক্তারা বলেন, উন্নয়নের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকায় চরাঞ্চলের মানুষ মৌলিক নাগরিক সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন।
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া এক অভিভাবক বলেন, “সেতু ও পাকা রাস্তার অভাবে সন্তানদের ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠানো কঠিন হয়ে পড়েছে। যাতায়াতের দুর্ভোগে অনেক শিক্ষার্থী মাঝপথে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়।”
কৃষক আব্বাস খালাসী বলেন, “উৎপাদিত ফসল বাজারে নিতে নদী পার হতে হয়। এতে অতিরিক্ত খরচ হয়, সময় নষ্ট হয়, অনেক সময় পণ্যও নষ্ট হয়ে যায়। সেতু ও পাকা রাস্তা হলে কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পাবেন।”
যুব প্রতিনিধি আক্তার গাজী বলেন, “প্রতিবছর নদীভাঙনে মানুষ ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে। স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ হলে এই দুর্ভোগ অনেকটাই কমবে। আমরা আর আশ্বাস নয়, বাস্তবায়ন চাই।”
২১ জুন যুব সমাজ ও আলেম সমাজের উদ্যোগে মুন্সিগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে স্মারকলিপি ও গণস্বাক্ষর জমা দেওয়া হয়। এতে সেতু, স্থায়ী বেড়িবাঁধ এবং পাকা সড়ক নির্মাণের দাবি তুলে ধরা হয়। জেলা প্রশাসক বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার আশ্বাস দেন।
পরবর্তীতে ৪ জুলাই মুন্সিগঞ্জ-২ (টঙ্গীবাড়ী-লৌহজং) আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল সালাম আজাদ দিঘীরপাড়ের কান্দারবাড়ি নদীভাঙন এলাকা পরিদর্শন করেন। এ সময় যুব সমাজ ও আলেম সমাজের প্রতিনিধিরা তাঁর হাতে স্মারকলিপি ও গণস্বাক্ষর তুলে দেন।
তিনি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরে বিষয়টি উপস্থাপন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন। একই সময় সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য মমতাজ আলোও নদীভাঙন এলাকা পরিদর্শন করে ক্ষতিগ্রস্তদের খোঁজখবর নেন।
স্থানীয়দের দাবি, যোগাযোগ অবকাঠামোর দুর্বলতার কারণে এ অঞ্চলে শিক্ষার হার আশঙ্কাজনকভাবে কম। শিক্ষার্থীদের নৌপথে দীর্ঘ সময় যাতায়াত করতে হওয়ায় নিয়মিত বিদ্যালয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। জরুরি রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়াও বড় চ্যালেঞ্জ।
অন্যদিকে কৃষিপণ্য বাজারজাত করতে অতিরিক্ত সময় ও পরিবহন ব্যয় হওয়ায় কৃষকরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। প্রতিবছরের নদীভাঙনে বহু পরিবার ঘরবাড়ি ও আবাদি জমি হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে।
এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, দীর্ঘদিনের এই দাবিগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের মাধ্যমে দিঘীরপাড় ও আশপাশের চরাঞ্চলকে উন্নয়নের মূলধারায় যুক্ত করা হবে। তাদের প্রশ্ন একটাই—আশ্বাসের পর আশ্বাস নয়, কবে বাস্তবে নির্মিত হবে দিঘীরপাড়ের সেতু, স্থায়ী বেড়িবাঁধ ও পাকা সড়ক? সেই উত্তর ও কার্যকর পদক্ষেপের অপেক্ষায় রয়েছে লক্ষাধিক মানুষ।