মাহিনুর ইসলাম মাহিন, বড়লেখা(মৌলভীবাজার) প্রতিনিধিঃ
মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলায় আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তফসিল ঘোষণার আগেই জমে উঠেছে রাজনৈতিক মাঠ। উপজেলার ১০টি ইউনিয়নে সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থীদের ব্যাপক তৎপরতায় নির্বাচনী আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র।
সবচেয়ে বেশি সরব বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীরা। দলীয় মনোনয়ন নিশ্চিত করতে অর্ধশতাধিক নেতা মাঠে সক্রিয় থাকায় ইউনিয়নভিত্তিক প্রতিযোগিতাও বেশ তীব্র হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় নির্দেশনার অংশ হিসেবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ইতোমধ্যে ৯টি ইউনিয়নে সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থীর নাম ঘোষণা করে সাংগঠনিক ও গণসংযোগ কার্যক্রমে এগিয়ে রয়েছে। ফলে তফসিল ঘোষণার আগেই বড়লেখার স্থানীয় রাজনীতিতে নির্বাচনী আবহ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
স্থানীয় সূত্র ও রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিএনপি এখনো কোনো ইউনিয়নে দলীয় চেয়ারম্যান প্রার্থী চূড়ান্ত করেনি। তবে সম্ভাব্য প্রার্থীরা দলীয় হাইকমান্ডের নজর কাড়তে এবং স্থানীয় ভোটারদের সমর্থন আদায়ে ব্যাপক গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন।
নিয়মিত মতবিনিময় সভা, উঠান বৈঠক, সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ, ব্যক্তিগত যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং জনসেবামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে নিজেদের গ্রহণযোগ্য প্রার্থী হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন তাঁরা। অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রচারণা জোরদার করেছেন।
অন্যদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সম্ভাব্য সংসদীয় প্রার্থী ঘোষণার পরপরই বড়লেখার ৯টি ইউনিয়নে সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থীর নাম ঘোষণা করে জামায়াতে ইসলামী। ঘোষিত প্রার্থীরা পোস্টার, ফেস্টুন, বিলবোর্ড, লিফলেট বিতরণ, গণসংযোগ, উঠান বৈঠক ও মতবিনিময় সভার পাশাপাশি সাংগঠনিক কার্যক্রমও জোরদার করেছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আগেভাগে প্রার্থী ঘোষণা করায় মাঠ গোছাতে অন্য দলগুলোর তুলনায় কিছুটা এগিয়ে রয়েছে জামায়াত।
বিএনপির সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থীদের মধ্যে বর্ণি ইউনিয়নে আলোচনায় রয়েছেন উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক ও বর্তমান চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীন, ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি লোকমান উদ্দিন বায়েছ, সাধারণ সম্পাদক সাইফুজ্জামান সরওয়ার, সাবেক সহসাধারণ সম্পাদক সাহাব উদ্দিন, ফ্রান্সপ্রবাসী খায়রুল ইসলাম এবং ইতালিপ্রবাসী সাবেক ছাত্রদল নেতা ছাব্বির আহমদ।
দাসেরবাজার ইউনিয়নে ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি রহিম উদ্দিন নজরুল, সাধারণ সম্পাদক রুহুল আমীন বাহার এবং অর্থ সম্পাদক কলিম উদ্দিন সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন।
নিজ বাহাদুরপুর ইউনিয়নে উপজেলা বিএনপির সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি ও সাবেক চেয়ারম্যান আলাল উদ্দিন, ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মিছবাউল হক মিনু এবং সাবেক ছাত্রদল নেতা কাউসার আহমদ নির্বাচনী প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছেন।
উত্তর শাহবাজপুর ইউনিয়নে ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আব্দুল হালিম, সহসভাপতি মো. তাজ উদ্দিন এবং পেশাজীবী প্রতিনিধি, ব্যাংকার ও সাংবাদিক হাসান শামীমের নাম সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছে।
দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়নে ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আব্দুল কুদ্দুস স্বপন, সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান আহমদ, সাবেক আহ্বায়ক আবুল আহমদ এবং সাবেক সাধারণ সম্পাদক আনিছ আহমদ দীর্ঘদিন ধরে মাঠে সক্রিয় রয়েছেন।
বড়লেখা সদর ইউনিয়নে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় রয়েছেন উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক চেয়ারম্যান জাহিদুল ইসলাম মামুন, ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক আব্দুল গনি, বর্তমান সভাপতি শাহজাহান আহমদ চৌধুরী, সামাজিক সংগঠক আব্দুর রহমান শাহীন এবং উপজেলা কৃষক দলের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ আহমদ।
তালিমপুর ইউনিয়নে উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক তাজুল ইসলাম আয়জুল, ইউনিয়ন বিএনপির সহ-যুববিষয়ক সম্পাদক ছালেহ আহমদ এবং আওয়ামী লীগ থেকে বিএনপিতে যোগ দেওয়া সাহাব উদ্দিন প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।
দক্ষিণভাগ উত্তর ইউনিয়নে ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি রফিক উদ্দিন, সাবেক সহসভাপতি ময়নুল হক এবং এনামুল হক নিয়মিত গণসংযোগ করছেন।
সুজানগর ইউনিয়নে উপজেলা বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি ও সাবেক চেয়ারম্যান নছিব আলী, ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আবুল আছ আহমদ এবং সাধারণ সম্পাদক রহিম বক্ত মুসা সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন।
দক্ষিণভাগ দক্ষিণ ইউনিয়নে উপজেলা যুবদলের সদস্য সচিব ইকবাল হোসেন, ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি সাইফুল ইসলাম, যুবদল নেতা ও বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আমিনুল হক এবং সাবেক ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও উপজেলা এনসিপি নেতা মুহিবুর রহমান কামাল নির্বাচনী প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছেন।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর ঘোষিত সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থীরা হলেন—বর্ণি ইউনিয়নে উপজেলা জামায়াতের নায়েবে আমীর ফয়সল আহমদ, নিজ বাহাদুরপুরে আব্দুস সালাম, উত্তর শাহবাজপুরে আকবর আলী, দক্ষিণ শাহবাজপুরে আব্দুল কুদ্দুস, বড়লেখা সদর ইউনিয়নে রবিউল ইসলাম সুহেল,
তালিমপুরে কাজী রুহুল আমিন, দক্ষিণভাগ উত্তর ইউনিয়নে লুৎফুর রহমান, সুজানগরে লিয়াকত হাসান এবং দক্ষিণভাগ দক্ষিণ ইউনিয়নে আব্দুস সামাদ। তবে দাসেরবাজার ইউনিয়নের সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থীর নাম এখনো ঘোষণা করা হয়নি।
এদিকে ২০২১ সালের ইউপি নির্বাচনে নৌকা প্রতীক নিয়ে বিজয়ী উত্তর শাহবাজপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান রফিক উদ্দিন আহমদ, নিজ বাহাদুরপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ময়নুল হক, আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত দাসেরবাজার ইউনিয়নের চেয়ারম্যান স্বপন কুমার চক্রবর্তী এবং
স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত সুজানগর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বদরুল ইসলামও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে স্থানীয়ভাবে আলোচনায় রয়েছেন। এছাড়া বর্তমানে রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের আত্মগোপনে থাকা কয়েকজন সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ও নেতাও নীরবে নির্বাচনী প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
বড়লেখা উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যাপক আব্দুস শহিদ খান বলেন, “স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপিতে সম্ভাব্য প্রার্থীর সংখ্যা বেশি থাকাটা স্বাভাবিক। বিএনপি একটি বৃহৎ গণতান্ত্রিক দল।
দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী যাঁকে চূড়ান্তভাবে সমর্থন দেওয়া হবে, তাঁর পক্ষেই সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। নির্বাচন কমিশনের তফসিল, আইন ও দলীয় নীতিমালা অনুসরণ করেই যথাসময়ে প্রার্থী চূড়ান্ত করা হবে।
দলের দুঃসময়ে যাঁদের ত্যাগ, সাংগঠনিক অবদান, জনসম্পৃক্ততা ও গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে, তাঁদেরই অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। পাশাপাশি পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি ও বিজয়ী হওয়ার সক্ষমতাও বিবেচনায় থাকবে।”
জামায়াতে ইসলামীর বড়লেখা উপজেলা ভারপ্রাপ্ত আমির মাওলানা ইসলাম উদ্দীন বলেন, “কেন্দ্রীয় নির্দেশনার আলোকে ৯টি ইউনিয়নে সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে। আগেভাগে প্রার্থী ঘোষণার লক্ষ্য হলো জনগণের কাছে যাওয়ার জন্য পর্যাপ্ত সময় নিশ্চিত করা।
সাংগঠনিক দক্ষতা, ব্যক্তিগত সততা, জনগ্রহণযোগ্যতা এবং স্থানীয় মানুষের মূল্যায়নের ভিত্তিতেই প্রার্থী নির্ধারণ করা হয়েছে। দাসেরবাজার ইউনিয়নের সম্ভাব্য প্রার্থীর নামও শিগগির ঘোষণা করা হবে। আমরা একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন প্রত্যাশা করি।”