কাওসার আহম্মেদ.
একসময় বর্ষায় দিগন্তজোড়া জলরাশি, মাছে ভরা খাল-বিল আর অতিথি পাখির কোলাহলে মুখর থাকত চলনবিল। উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষি ও মৎস্যসম্পদের অন্যতম ভিত্তি ছিল দেশের বৃহত্তম এই জলাভূমি।
কিন্তু গত কয়েক দশকে পরিকল্পনাহীন অবকাঠামো নির্মাণ, নদী-খালের নাব্যতা হ্রাস, জলপ্রবাহে প্রতিবন্ধকতা এবং ব্যাপক পুকুর খননের কারণে চলনবিলের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে জীববৈচিত্র্য, দেশীয় মাছের উৎপাদন এবং বিলকেন্দ্রিক মানুষের জীবিকায়।
গবেষণা ও বিভিন্ন সরকারি তথ্য অনুযায়ী, একসময় চলনবিলের বিস্তৃতি ছিল এক হাজার বর্গকিলোমিটারেরও বেশি। বর্তমানে বর্ষা মৌসুমে জলাবৃত এলাকা প্রায় ৩৬৮ বর্গকিলোমিটারে নেমে এসেছে। শুষ্ক মৌসুমে তা কমে দাঁড়ায় প্রায় ৮৫ বর্গকিলোমিটারে। বর্তমানে নাটোর, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ জেলার ১০টি উপজেলার ৬২টি ইউনিয়নের প্রায় ১ হাজার ৬০০ গ্রামজুড়ে চলনবিলের বিস্তৃতি রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, শত শত বছর ধরে বড়াল, আত্রাই ও গুমানী নদীর মাধ্যমে পদ্মা ও যমুনার পানি চলনবিলে প্রবেশ করত। এই স্বাভাবিক পানিপ্রবাহই বিলের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখত। তবে সময়ের সঙ্গে নদী ও খালে পলি জমা, বিভিন্ন বাঁধ নির্মাণ এবং সড়ক অবকাঠামো গড়ে ওঠায় সেই স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হয়েছে।
১৯৮০ সালে বাঘাবাড়ি-তাড়াশ বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণের পর চলনবিলের পানিপ্রবাহে বড় পরিবর্তন আসে। পরে হাটিকুমরুল-বনপাড়া মহাসড়ক নির্মাণের সময়ও বিলের ভেতরে পানির চলাচল সীমিত হয়ে পড়ে।
সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৫-৯৬ থেকে ২০০৯-১০ অর্থবছরের মধ্যে চলনবিল এলাকায় প্রায় ১ হাজার ১৮৮ কিলোমিটার পাকা সড়ক, ১১৩টি সেতু, ৮৫৫টি কালভার্ট, ৯০টি গ্রোথ সেন্টার, ২১টি স্লুইসগেট এবং প্রায় ১ হাজার ৫০০ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত হলেও অনেক স্থানে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
এ ছাড়া গত এক যুগে চলনবিলজুড়ে কয়েক হাজার পুকুর খনন করা হয়েছে। পরিবেশবিদদের মতে, এসব পুকুরের একটি অংশ প্রাকৃতিক জলপ্রবাহের পথ সংকুচিত করেছে। ফলে কোথাও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে, আবার কোথাও বর্ষার পানি দ্রুত নেমে যাওয়ায় বিল শুকিয়ে যাচ্ছে।
একসময় চলনবিল ছিল দেশীয় মাছের অন্যতম প্রধান প্রজননক্ষেত্র। বোয়াল, চিতল, গজার, শোল, পাবদা, টেংরা, শিং, মাগুর, কই, টাকি, আইড়, বাইন, পুঁটি, মলাসহ অসংখ্য দেশীয় মাছ সহজেই পাওয়া যেত। বিলের নদী-খালকে ঘিরে প্রায় ১ লাখ ৭৭ হাজার জেলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জীবিকা নির্বাহ করতেন। বর্তমানে মাছের উৎপাদন কমে যাওয়ায় অনেকেই পেশা পরিবর্তনে বাধ্য হয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নদী-খালের নাব্যতা কমে যাওয়া, অবৈধ ‘চায়না দুয়ারি’ ও ‘বাদাই’ জালের ব্যবহার এবং প্রজননক্ষেত্র নষ্ট হওয়ার কারণে দেশীয় মাছের সংখ্যা দ্রুত কমছে। এতে শুধু মৎস্যসম্পদ নয়, পুরো জলজ পরিবেশও ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
বিএডিসির তথ্য অনুযায়ী, চলনবিলের প্রায় ৪১০ কিলোমিটার খাল-নালার মধ্যে ৩৬৮ কিলোমিটার পলি জমে ভরাট হয়ে গেছে। ফলে পানির প্রবাহ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি কৃষি ও মৎস্য উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
সিংড়া চলনবিল পরিবেশ ও প্রকৃতি আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক মো. আবু জাফর সিদ্দিকী বলেন, অপরিকল্পিত উন্নয়ন, জলাভূমি ভরাট এবং নদী-খালের নাব্যতা কমে যাওয়ায় চলনবিলের আয়তন প্রতিবছরই কমছে। একই সঙ্গে অবৈধ জালের ব্যবহার দেশীয় মাছের অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
নাটোর বিএডিসির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি নদী-খালের নাব্যতা হ্রাস, পলি জমা এবং অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ চলনবিলের সংকোচনের প্রধান কারণ। তাঁর মতে, খাল-নালা পুনঃখনন, পলি অপসারণ এবং পরিবেশসম্মত পরিকল্পনার ভিত্তিতে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করা গেলে দেশের এই গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমির প্রাকৃতিক ভারসাম্য অনেকটাই ফিরিয়ে আনা সম্ভব।