মেহেদী হাসান , ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি
‘পড়া পারেনি, তাই একটু শাসন করেছি’—শিক্ষিকার এমন ‘শাসনের’ পর নয় বছরের শিশু ইকরা মনির ডান হাতের কনুইয়ের হাড় ভেঙে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বর্তমানে প্লাস্টার করা হাত নিয়ে ব্যথা ও আতঙ্কে দিন কাটছে দ্বিতীয় শ্রেণির এই শিক্ষার্থীর।
ঘটনাটি ঘটেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার চর মানিকপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। গত বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) সকালে বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে এ ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ করেছে শিশুটির পরিবার।
আহত শিক্ষার্থী ইকরা মনি ওই বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী।
পরিবার ও ইকরা মনির ভাষ্য অনুযায়ী, সেদিন শ্রেণিকক্ষে পড়া চলাকালে রিডিং পড়া নিয়ে সহকারী শিক্ষিকা শামসুন্নাহার বেগম ক্ষিপ্ত হন। একপর্যায়ে তিনি শ্রেণিকক্ষে থাকা বেত দিয়ে ইকরাকে মারধর করেন বলে অভিযোগ। বেতের আঘাতে পিঠ ও হাতে গুরুতর ব্যথা পেয়ে একপর্যায়ে মাটিতে পড়ে যায় শিশুটি। পরে সহপাঠী ও পরিবারের সদস্যরা তাকে উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যান।
হাসপাতালে এক্স-রে করার পর চিকিৎসকরা জানান, শিশুটির ডান হাতের কনুইয়ের হাড় ভেঙে গেছে। পরে চিকিৎসকের পরামর্শে তার পুরো হাতে প্লাস্টার করা হয়।
শারীরিক যন্ত্রণার পাশাপাশি ঘটনার পর থেকে ইকরা ভীত ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছে তার পরিবার।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে চর মানিকপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা শামসুন্নাহার বেগম মুঠোফোনে বলেন, “পড়া পারেনি, তাই একটু শাসনের ব্যবস্থা করেছি। তাতেই হাত ভেঙে গেছে। ওটা ঠিক হয়ে যাবে। এসব নিয়ে সাংবাদিকদের টেনশন না করলেও চলবে। আমি অনিয়ম করলে স্কুল কমিটি দেখবে।”
তার বক্তব্যে শিশুটির হাত ভেঙে যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করলেও ঘটনার জন্য কোনো অনুশোচনা প্রকাশ করতে দেখা যায়নি।
এলাকাবাসী ও কয়েকজন অভিভাবকের অভিযোগ, অভিযুক্ত শিক্ষিকার আচরণ নিয়ে আগেও শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভীতি ছিল। সামান্য ভুল বা পড়া না পারার কারণে শিক্ষার্থীদের মারধরের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তবে স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় অনেক অভিভাবক বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে অভিযোগ করতে সাহস পাননি বলে দাবি করেছেন তারা।
এবার নয় বছরের এক শিক্ষার্থীর হাত ভেঙে যাওয়ার ঘটনায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
এদিকে, অভিযুক্ত শিক্ষিকা শিশুটির পরিবারকে বিষয়টি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ না করতে ‘ম্যানেজ’ করার চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ করেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অভিভাবক। তবে এ অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
সন্তানের হাত ভেঙে যাওয়ার ঘটনায় কান্নায় ভেঙে পড়েছেন ইকরা মনির মা-বাবা। অটোরিকশাচালক বাবা-মায়ের কণ্ঠে ছিল অসহায়ত্ব আর ক্ষোভ।
তারা বলেন, “আমরা গরিব মানুষ। গরিবের কে-বা বিচার করবে এই দেশে! মাস্টার-ম্যাডাম যদি অন্যায় করে থাকে, তাহলে ওপরওয়ালা আল্লাহই এর বিচার করবেন।”
ঘটনার বিষয়ে বাঞ্ছারামপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুল আজিজ বলেন, “এটি খুবই বাজে করেছেন। আমি আগে জানিনি। এখন জানলাম। আমি এক্ষুনি খোঁজ নিচ্ছি। কালই একটা ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে অভিযুক্ত শিক্ষিকার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও ক্ষুব্ধ অভিভাবকরা। একই সঙ্গে বিদ্যালয়ে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করারও দাবি জানান তারা।