বাংলাদেশকে সামরিক শাসন কিংবা কোনো ধরনের অগণতান্ত্রিক ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের দিকে না নেওয়া, জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং সরকারি নিয়োগে দলীয় প্রভাব বন্ধসহ ১১ দফা দাবি জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী।
মঙ্গলবার বিকেলে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে তিনি এসব দাবি তুলে ধরেন।
পোস্টে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, বাংলাদেশকে কোনোভাবেই সামরিক শাসনের দিকে নেওয়া যাবে না। একইভাবে অগণতান্ত্রিক বা কর্তৃত্ববাদী শাসনও গ্রহণযোগ্য নয়। এ ধরনের শাসন দেশের গণতন্ত্র, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও সার্বভৌমত্বকে ঝুঁকির মুখে ফেলবে। জনগণের ভোট, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও আইনের শাসনের ভিত্তিতেই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে হবে।
তার ১১ দফা দাবিগুলো হলো—
১. জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার
হাসিনা ও আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে সংঘটিত জুলাই হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন নাসীরুদ্দীন। তার মতে, বিচার ছাড়া প্রকৃত জাতীয় পুনর্মিলন সম্ভব নয়। তবে বিচার হতে হবে প্রমাণ, আইন ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে; প্রতিহিংসার ভিত্তিতে নয়।
২. চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অভিযান
৫ আগস্টের পর চাঁদাবাজি, দখলদারি, সন্ত্রাস ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে জনগণকে হয়রানি করেছে—এমন ব্যক্তিদের দল-মত নির্বিশেষে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি। তার মতে, রাষ্ট্র কোনো রাজনৈতিক দলের চাঁদাবাজ বা সন্ত্রাসীদের আশ্রয়স্থল হতে পারে না।
৩. বাংলাদেশকেন্দ্রিক রাজনীতি
দেশের রাজনীতিকে কোনো বিদেশি শক্তি, গোষ্ঠী বা অপশক্তির ওপর নির্ভরশীল না করার আহ্বান জানান এনসিপির এই নেতা। তারেক রহমানসহ রাজনৈতিক নেতৃত্বকে জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হবে এবং বিতর্কিত রাজনৈতিক সমঝোতা বা নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে বাংলাদেশের স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে আনার দাবি জানান তিনি।
৪. বিএনপিকে সন্ত্রাস ও পেশিশক্তির রাজনীতি পরিহার
ক্ষমতায় যাওয়া বা ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দখলদারি ও পেশিশক্তির ব্যবহার বন্ধের আহ্বান জানান নাসীরুদ্দীন। বিএনপিকে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি, জবাবদিহি ও জনগণের ম্যান্ডেটের রাজনীতিতে ফিরে আসার আহ্বান জানান তিনি।
৫. গণভোটের রায় বাস্তবায়ন ও রাষ্ট্রীয় সংস্কার
গণভোটে জনগণের দেওয়া রায় বাস্তবায়নে দ্রুত সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবি জানান তিনি। প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে কার্যকর, জবাবদিহিমূলক ও জনগণকেন্দ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দেন।
৬. জ্বালানি সংকটের স্থায়ী সমাধান
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় দ্রুত একটি দক্ষ ও স্বাধীন জাতীয় জ্বালানি কমিটি গঠনের দাবি জানান নাসীরুদ্দীন। গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দুর্নীতি, অপচয় ও অনিয়ম বন্ধ করে জনগণের কাছে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি ন্যায্য ও সহনীয় মূল্যে পৌঁছে দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
৭. সিন্ডিকেট ভেঙে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে সিন্ডিকেট, মজুতদারি ও কৃত্রিম সংকট বন্ধের দাবি জানান তিনি। কৃষক ও উৎপাদকদের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভোক্তাদের জন্য সহনীয় দামে পণ্য কেনার সুযোগ তৈরিতে কার্যকর বাজারব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
৮. দলীয় নিয়োগ বন্ধ, মেধার মূল্যায়ন
সরকারি নিয়োগ ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয় পরিচয়, তদবির ও রাজনৈতিক আনুগত্যের পরিবর্তে যোগ্যতা, মেধা, দক্ষতা ও স্বচ্ছ প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার দাবি জানান নাসীরুদ্দীন। কোনো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক দলের কর্মী পুনর্বাসনের জায়গা না করার আহ্বান জানান তিনি।
৯. দুর্নীতির অর্থ উদ্ধার ও জনগণের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া
রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাট, দুর্নীতি ও অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি। প্রমাণিত অপরাধের ক্ষেত্রে অবৈধ সম্পদ রাষ্ট্রের অনুকূলে ফিরিয়ে এনে তা জনগণের কল্যাণে, বিশেষ করে দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থায় ব্যবহারের আহ্বান জানান।
১০. তরুণদের জন্য স্বচ্ছ কর্মসংস্থান
তরুণদের জন্য মেধাভিত্তিক, স্বচ্ছ ও ঘুষমুক্ত নিয়োগব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি জানান এনসিপির এই নেতা। পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি খাতে দক্ষতা উন্নয়ন, উদ্যোক্তা তৈরি এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
১১. দক্ষতাভিত্তিক অর্থনীতি
শুধু তৈরি পোশাক ও স্বল্পদক্ষ প্রবাসী শ্রমের ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতি থেকে বাংলাদেশকে দক্ষতাভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তরের আহ্বান জানান নাসীরুদ্দীন।
তিনি আইটি, সফটওয়্যার, ইলেকট্রনিক্স, ওষুধ, আধুনিক কৃষি, মেশিনারি, জাহাজ নির্মাণ, প্রতিরক্ষা উৎপাদন, নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ উচ্চমূল্যের শিল্পে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন। বিদেশে শুধু শ্রমিক পাঠানোর পরিবর্তে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করে বিশ্ববাজারে উচ্চমূল্যের সেবা ও পণ্য রপ্তানির ওপর জোর দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
পোস্টের শেষ দিকে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, “সামরিক শাসন নয়, গণতান্ত্রিক শাসন। কর্তৃত্ববাদ নয়, জনগণের ক্ষমতা। চাঁদাবাজি নয়, আইনের শাসন। দলীয় নিয়োগ নয়, মেধার মূল্যায়ন। সিন্ডিকেট নয়, ন্যায্য বাজার।”
তিনি আরও বলেন, “দুর্নীতি নয়, জবাবদিহি। বিদেশের ওপর নির্ভরতা নয়, বাংলাদেশকেন্দ্রিক পররাষ্ট্রনীতি। স্বল্পদক্ষ শ্রম নয়, দক্ষ মানবসম্পদ। প্রতিহিংসা নয়, ন্যায়বিচার এবং সবার ওপরে একটি স্বাধীন, সার্বভৌম, গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ।”