গত তিন বছরে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (ববি) সাত শিক্ষার্থীর অস্বাভাবিক মৃত্যু শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সংশ্লিষ্ট সবার মধ্যে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। এসব ঘটনার মধ্যে দুটি ঘটনায় অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, আর বাকি অধিকাংশ ঘটনায় পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে আত্মহত্যার আলামত পাওয়া গেছে।
বিভিন্ন ঘটনার পেছনে ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও প্রেমঘটিত টানাপড়েনের তথ্য সামনে এলেও সর্বশেষ মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত হয়নি।
বিশ্ববিদ্যালয় ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালের ১৯ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন আনন্দবাজার এলাকার একটি মেস থেকে উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী শাহরিন রিভানার অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরিবারের বরাতে পুলিশ জানায়, তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিষণ্নতায় (ডিপ্রেশন) ভুগছিলেন।
এরপর ২০২৪ সালের ১৭ জানুয়ারি রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী বৃষ্টি রানী সরকারকে কর্ণকাঠি এলাকার একটি মেস থেকে ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। একই বছরের ১৭ মার্চ ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী দেবশ্রী রায় বরগুনায় নিজ বাসায় আত্মহত্যা করেছেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়।
২০২৪ সালের ৯ জুন বিশ্ববিদ্যালয়ের তাপসী রাবেয়া বসরি হলের রিডিং রুমের বারান্দা থেকে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী শেফা নূর ইবাদির ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সহপাঠীদের দাবি, ঘটনার আগে তিনি ব্যক্তিগত সম্পর্কের টানাপড়েনের মধ্যে ছিলেন।
একই বছরের ৬ সেপ্টেম্বর পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী সুপর্ণা দাস নিজ বাড়িতে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। পরদিন চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
২০২৫ সালের ৪ জানুয়ারি বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী শুভ বৈরাগীর মরদেহ গোপালগঞ্জে নিজ বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয়। মৃত্যুর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও মানসিক চাপের কথা উল্লেখ করেছিলেন।
সর্বশেষ, ২০২৬ সালের ২১ জুলাই ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষার্থী এবং খুলনা জেলা ছাত্র কল্যাণ সমিতির সাবেক সভাপতি উচ্ছ্বাস কর্মকারের অর্ধগলিত মরদেহ বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন একটি ছাত্রাবাস থেকে উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে তদন্ত চলছে।
এ বিষয়ে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. মামুন অর রশিদ বলেন, উচ্ছ্বাস কর্মকারের মৃত্যুর ঘটনা তদন্তাধীন রয়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা আরও জোরদার করার বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আলোচনা করছে। প্রয়োজন হলে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ নিয়োগের উদ্যোগও নেওয়া হবে।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. মাহবুবুর রহমান বলেন, শারীরিক অসুস্থতার মতো মানসিক অসুস্থতাও চিকিৎসাযোগ্য। পরিবারের সদস্যদের মানসিক সমস্যায় ভোগা ব্যক্তিদের প্রতি আরও সহানুভূতিশীল হতে হবে এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।
তাঁর মতে, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সময়মতো মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা গেলে এ ধরনের অনেক অকাল মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব।