কাওসার আহম্মেদ
ভোরের আলো ফুটতেই গুমানি নদীর ঘাটে ভিড় জমতে শুরু করে নানা পেশার মানুষের| কেউ স্কুলের পোশাক পরে বইয়ের ব্যাগ কাঁধে, কেউ মাথায় সবজিভর্তি ঝুড়ি, কেউ আবার হাসপাতালে যাওয়ার তাড়া নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন| সবার গন্তব্য আলাদা, কিন্তু অপেক্ষা একটাই—খেয়া নৌকার|
চলনবিলের বুক চিরে বয়ে যাওয়া গুমানি নদী নাটোরের গুরুদাসপুর, সিরাজগঞ্জের তাড়াশ ও পাবনার চাটমোহর উপজেলার মানুষের জীবনকে যেমন জুড়ে রেখেছে, তেমনি আলাদা করেও রেখেছে| নদীর দুই পাড়ে সাতটি গ্রামের প্রায় ৫০ হাজার মানুষের কাছে একটি সেতু শুধু যোগাযোগের অবকাঠামো নয়; এটি বহু বছরের অপূর্ণ ¯^প্ন, প্রতিদিনের দুর্ভোগ থেকে মুক্তির প্রতীক|
কাছিকাটা নিশিবাড়ি ঘাট থেকে বিলব্যাসপুর পর্যন্ত নদীর এই অংশ দিয়ে প্রতিদিন পারাপার করেন তাড়াশ উপজেলার থল নলডাঙ্গা ও হামকুড়া, চাটমোহরের এনায়েতপুর এবং গুরুদাসপুরের বিলব্যাসপুর, বিলকাঠুর, রানীগ্রাম ও ইয়াসিনপুর গ্রামের মানুষ| শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষিকাজ, ব্যবসা—জীবনের প্রায় সব প্রয়োজনেই তাদের ভরসা একটি ছোট খেয়া নৌকা|
স্থানীয়দের উদ্যোগে মাসিক ৯ হাজার টাকা পারিশ্রমিকে মাঝি ময়লাল প্রতিদিন সকাল থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত নৌকা চালান| দিনের পর দিন, বছরের পর বছর নদীর স্রোতের সঙ্গে লড়াই করেই চলছে এই জনপদের মানুষের যাতায়াত|
তবে বর্ষা এলেই বদলে যায় দৃশ্যপট| ফুলে-ফেঁপে ওঠা গুমানি তখন শুধু একটি নদী নয়, হয়ে ওঠে অনিশ্চয়তার নাম| নদীর উত্তাল ঢেউ পেরিয়ে রোগীকে হাসপাতালে নেওয়া, পরীক্ষার্থীদের সময়মতো কেন্দ্রে পৌঁছানো কিংবা কৃষকের উৎপাদিত ফসল বাজারে পৌঁছানো—সবকিছুই হয়ে পড়ে ভাগ্যের ওপর নির্ভরশীল|
স্থানীয় বাসিন্দা মো. আসলাম আলী বলেন, “আমরা শুধু একটা সেতু চাই| এত বছর ধরে নদী পার হতে গিয়ে কত ভোগান্তি যে পোহাতে হয়েছে, তার হিসাব নেই| একটি সেতু হলে সন্তানদের পড়াশোনা থেকে শুরু করে চিকিৎসা ও ব্যবসা—সবকিছুই সহজ হয়ে যাবে|”
দবীর উদ্দিনের কণ্ঠেও একই প্রত্যাশা| তিনি বলেন, “আমাদের কষ্টের কথা অনেকেই শুনেছেন, কিন্তু সমাধান হয়নি| প্রতিটি নির্বাচনেই সেতুর আশ্বাস পাই, কিন্তু বাস্তবে কিছুই দেখি না|”
বিলব্যাসপুর গ্রামের সালাম সরকার নদীর দিকে তাকিয়ে বলেন, “এই নদী আমাদের জীবন দিয়েছে, আবার অনেক সুযোগও কেড়ে নিয়েছে| একটি সেতু হলে তিন উপজেলার মানুষ এক সুতোয় বাঁধা পড়বে| কৃষি, শিক্ষা ও ব্যবসায় নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলবে|”
স্থানীয়দের মতে, গুমানি নদীর ওপর একটি সেতু নির্মিত হলে শুধু যাতায়াত সহজ হবে না, পুরো অঞ্চলের অর্থনীতিতেও গতি আসবে| কৃষিপণ্য দ্রুত বাজারে পৌঁছাবে, শিক্ষার্থীদের সময় বাঁচবে, জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা সহজ হবে|
মশিন্দা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল বারী জানান, বিলব্যাসপুর ও রানীগ্রাম মৌজার মধ্যবর্তী আত্রাই নদীর ওপর রাবারড্যাম নির্মাণ প্রকল্প বর্তমানে একনেকের অনুমোদনের চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে|
উপজেলা সহকারী প্রকৌশলী সাইদুর রহমান বলেন, কাছিকাটা নিশিবাড়ি ঘাট থেকে বিলব্যাসপুর পর্যন্ত গুমানি নদীর ওপর সেতুর পাশাপাশি একটি রাবারড্যাম নির্মাণ করা গেলে শুষ্ক মৌসুমে সেচব্যবস্থার উন্নয়ন হবে| এতে নাটোর, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ জেলার বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষ উপকৃত হবেন| প্রকল্পটি বর্তমানে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে| অনুমোদন মিললে আগামী নভেম্বর- ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শুরু করা সম্ভব হতে পারে|
নাটোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজ বলেন গুমানি নদীর ওপর একটি সেতু নির্মাণ এ অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি| রাবারড্যাম প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে সেতু নির্মাণের পথও সহজ হবে| প্রকল্পের দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে|
গুমানির ঘাটে সন্ধ্যা নামলে শেষবারের মতো নৌকা ভিড়ে| একে একে মানুষ ঘরে ফেরেন| নদীও ধীরে ধীরে নিস্তব্ধ হয়ে আসে| কিন্তু নিস্তব্ধ হয় না অপেক্ষা| নদীর দুই পাড়ে এখনও হাজারো মানুষের চোখে ভাসে একটি সেতুর ছবি—যে সেতু একদিন শুধু দুই তীরকে নয়, বহু বছরের বঞ্চনা আর উন্নয়নের ব্যবধানকেও যুক্ত করবে|