চট্টগ্রাম নগরের বাকলিয়ায় চার বছরের শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া আসামি মনির হোসেন (৩০) আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। শুক্রবার (২২ মে) দুপুরে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের একটি আদালত আসামির এই জবানবন্দি গ্রহণ করেন। পরে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
একইসঙ্গে মামলাটির গুরুত্ব বিবেচনা করে চার্জশিট দ্রুত জমা দেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন আদালত।
এর আগে, বৃহস্পতিবার বিকেল চারটার দিকে ধর্ষণের খবর ছড়িয়ে পড়লে পুরো বাকলিয়া এলাকায় তীব্র উত্তেজনা দেখা দেয়। উত্তেজিত জনতা অভিযুক্ত মনিরকে আটকে রাখা ভবনটি ঘেরাও করে ফেলে। পুলিশ আসামিকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যেতে চাইলে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী বাধা দেয় এবং পুলিশের হাত থেকে আসামিকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চালায়।
একপর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে পুলিশ ও উত্তেজিত জনতার মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ সংঘর্ষ ও পাল্টাপাল্টি ধাওয়া চলে। এ সময় বিক্ষোভকারীরা সড়ক অবরোধ করে, পুলিশের গাড়িতে আগুন দেয় এবং বেশ কিছু যানবাহন ও দোকানপাট ভাঙচুর করে।
বাকলিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ সোলাইমান বলেন, শিশুকে ধর্ষণের ঘটনায় তার বাবা বাদী হয়ে মামলা করেছেন। গ্রেপ্তার আসামি মনিরকে শুক্রবার বিকেলে আদালতে হাজির করা হলে তিনি দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দেন।
বৃহস্পতিবারের ঘটনায় ৩০ পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন জানিয়ে ওসি আরও বলেন, তারা প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন। পুলিশের গাড়ি থেকে ব্যাটারি চুরি ও হামলার অভিযোগে চারজনকে আটক করা হয়েছে। পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় মামলার প্রস্তুতি চলছে। বর্তমানে এলাকার পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, চেয়ারম্যানঘাটা এলাকার চার বছর বয়সী শিশুটিকে ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত মনির হোসেনকে বিকেল চারটার দিকে আটক করে পুলিশ। তাকে থানায় নেওয়ার সময় বিক্ষুব্ধ লোকজন অভিযুক্তকে তাদের হাতে তুলে দেওয়ার দাবি জানান। একপর্যায়ে শত শত মানুষ পুলিশের গাড়ি ঘিরে ফেলেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সদস্যরা পিছু হটে অবস্থান নেন। এ সময় বিক্ষোভকারীরা বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন।
পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। এদিন রাত আটটার দিকে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এ সময় বিক্ষোভকারীদের পক্ষ থেকে পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোড়া হয়। পরে পুলিশ ফাঁকা গুলি ছুড়ে লোকজনকে ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে।
পরে রাত সোয়া ১০টার দিকে এলাকায় বিদ্যুৎ চলে গেলে পুলিশ কৌশলে অভিযুক্তকে একটি ভবন থেকে বের করে নিজেদের হেফাজতে নেয়। এরপরও উত্তেজিত লোকজন সড়কে অবস্থান নিয়ে পুলিশের গাড়িতে আগুন ধরিয়ে বিক্ষোভ করেন। মধ্যরাতের পরও পুলিশ ও বিক্ষুব্ধ লোকজনের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া চলতে থাকে।
পুলিশ ও স্থানীয়রা জানান, বৃহস্পতিবার এলাকায় গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে ধর্ষণের শিকার শিশুটি মারা গেছে। এতে স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। রাতে ঘটনাস্থলে উপস্থিত এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলেন কয়েকজন নারী ও পুরুষ। তারা জানান, শিশুটির মৃত্যুর খবর শুনেই তারা রাস্তায় নেমেছেন।
মামলার বাদী শিশুটির বাবা বলেন, ‘বিচার দীর্ঘসূত্রতায় মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। আমি চাই, আমার মেয়ের মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তি করে আসামিকে শাস্তির আওতায় আনা হোক।’
ভুক্তভোগী শিশুটি বর্তমানে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) চিকিৎসাধীন রয়েছে।
চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীন জানান, শিশুটি বর্তমানে আশঙ্কামুক্ত ও সুস্থ রয়েছে। প্রাথমিকভাবে এটি ‘ধর্ষণের চেষ্টা’ বলে মনে হলেও, চূড়ান্ত নিশ্চিত হওয়ার জন্য শিশুটির শরীর থেকে নমুনা সংগ্রহ করে ডিএনএ টেস্টের জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। ডিএনএ রিপোর্ট পেলেই প্রকৃত বিষয়টি শতভাগ নিশ্চিত হওয়া যাবে।