বিশ্বকাপে দায়িত্ব পালনের উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রে গেলেও দেশটিতে প্রবেশের অনুমতি না পেয়ে শেষ পর্যন্ত নিজ দেশে ফিরে যেতে হয়েছে সোমালি রেফারি ওমর আবদুলকাদির আরতানকে। তবে হতাশার এই অধ্যায়ের মধ্যেও জন্মভূমিতে ফিরে তিনি পেয়েছেন বীরের সম্মান। রাজধানী মোগাদিসুর বিমানবন্দরে তাকে উচ্ছ্বাসের সঙ্গে বরণ করে নেয় শত শত সমর্থক।
হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চলের প্রায় ১ কোটি ৯০ লাখ মানুষের দেশ সোমালিয়ায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্বীকৃতি পাওয়া ক্রীড়াবিদ বা ক্রীড়া কর্মকর্তার সংখ্যা খুবই কম। সেই প্রেক্ষাপটে ওমর আবদুলকাদির আরতান দেশটির ক্রীড়াঙ্গনের অন্যতম গর্বের নাম। আন্তর্জাতিক ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা এবারের বিশ্বকাপের জন্য মোট ৫২ জন ম্যাচ অফিশিয়াল নির্বাচন করেছিল। তাদের মধ্যে আফ্রিকা থেকে সুযোগ পেয়েছিলেন মাত্র সাতজন, যার একজন ছিলেন আরতান।
গত বছর কনফেডারেশন অব আফ্রিকান ফুটবল (সিএএফ) তাকে আফ্রিকার সেরা রেফারির স্বীকৃতি দেয়। ফলে সবকিছু ঠিক থাকলে বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম সোমালি রেফারি হিসেবে ম্যাচ পরিচালনার গৌরব অর্জন করতেন তিনি।
কিন্তু সেই স্বপ্ন ভেঙে যায় গত শনিবার। মিয়ামি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর যুক্তরাষ্ট্রের কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রোটেকশনের কর্মকর্তারা তাকে আলাদা করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে যান। পরে তাকে ইস্তাম্বুলগামী একটি বিমানে তুলে দেওয়া হয়। সেখান থেকে দীর্ঘ যাত্রা শেষে বুধবার ভোরে মোগাদিসুতে ফেরেন তিনি।
এক বিবৃতিতে মার্কিন সীমান্ত কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ‘নিরাপত্তা ও তথ্য যাচাইসংক্রান্ত’ কারণে আরতানকে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি। তবে তারা এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি।
ঘটনাটি আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। শীর্ষ ফুটবল কর্মকর্তা, সাবেক খেলোয়াড় এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এ সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। মার্কিন রাজনীতিবিদ হিলারি ক্লিনটনের মতো প্রভাবশালী নেতারাও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
তবে সোমালিয়ার সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া ছিল ভিন্ন। অনেকেই আরতানকে জাতীয় গর্ব হিসেবে আখ্যা দেন। ২৩ বছর বয়সী সাকদিয়া ওলাদ নামের এক তরুণী বলেন, “আমি সত্যিই খুব খুশি। যেখানে মানুষ তাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে, অবশেষে তিনি সেখানেই ফিরে এসেছেন। তিনি শুধু সোমালিয়ার নন, পুরো আফ্রিকার গর্ব।”
সোমালিয়া ফুটবল ফেডারেশন জানিয়েছে, আরতানের সম্মানে জাতীয় স্টেডিয়ামে একটি বিশেষ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে।
বিমানবন্দরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ফিফা ও সোমালি ফুটবল ফেডারেশনকে সমর্থনের জন্য ধন্যবাদ জানান আরতান। একই সঙ্গে হতাশ না হওয়ার বার্তাও দেন তিনি।
আরতান বলেন, “আমি হতাশ নই। আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, পরবর্তী বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ পর্যায়ে সোমালিয়ার প্রতিনিধিত্ব করব এবং নতুন ইতিহাস গড়ব।”
দেশের তরুণদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “সোমালিয়ার যুবসমাজের উচিত কখনোই নিজেদের স্বপ্নের পেছনে ছোটা বন্ধ না করা।”
উল্লেখ্য, গত কয়েক বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও সোমালিয়ার সম্পর্ক নানা কারণে টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসনের সময় থেকে সোমালিয়াসহ কয়েকটি আফ্রিকান ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশের নাগরিকদের ওপর কঠোর ভ্রমণ ও ভিসা বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। যদিও নিরাপত্তা সহযোগিতা ও সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রমে দুই দেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।
ফিফা আরতানের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশসংক্রান্ত কোনো বিশেষ ছাড়পত্রের আবেদন করেছিল কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে ফিফা ইতোমধ্যে নিশ্চিত করেছে যে এবারের বিশ্বকাপে আর ম্যাচ পরিচালনা করা হবে না তার। ফলে ইতিহাস গড়ার সুযোগ হাতছাড়া হলেও দেশের মানুষের ভালোবাসা ও সম্মান নিয়ে নতুন স্বপ্নের পথে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন সোমালিয়ার এই তারকা রেফারি।