শরীফ ওসমান হাদির শাহাদাতের পর ইনকিলাব মঞ্চের পরবর্তী মুখপাত্র কে হবেন—এ নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা ছড়ালেও এখনই সেই পথে হাঁটতে রাজি নয় মঞ্চের নেতৃত্ব। দেশ-বিদেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্ভাব্য নাম ও ছবি ঘুরে বেড়ালেও ইনকিলাব মঞ্চ স্পষ্ট করে জানিয়েছে, এ মুহূর্তে নেতৃত্ব বদলের আলোচনা নয়, একমাত্র দাবি হাদির হত্যার বিচার।
মঞ্চের নেতারা বলছেন, হাদির শূন্যতা পূরণ করার মতো কেউ এখনো নেই, আর সেই চিন্তায় যাওয়ার সময়ও আসেনি। বরং হত্যাকারীদের বিচারের প্রশ্নে তারা আরও কঠোর ও সোচ্চার অবস্থান নিতে চান। সে কারণে ইনকিলাব মঞ্চের মূল নেতৃত্বে নতুন মুখ আনার বিষয়ে আপাতত কোনো নাম ঘোষণা করা হচ্ছে না।
মঙ্গলবার (২৩ ডিসেম্বর) ইনকিলাব মঞ্চের অন্যতম নেত্রী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনবিষয়ক সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমা বলেন, আপাতত মঞ্চের মুখপাত্র কে হবেন—এমন কোনো আলোচনা তাদের ভাবনায় নেই। তার ভাষায়, এই মুহূর্তে একটাই লক্ষ্য—হাদি হত্যার বিচার নিশ্চিত করা। সেই দাবিতে ধারাবাহিক আন্দোলন অব্যাহত থাকবে এবং বর্তমান নেতৃত্বের মাধ্যমেই সব কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে।
জুমা বলেন, “হাদি ভাই আমাদের প্রেরণার উৎস। তার অসমাপ্ত কাজ শেষ করাই আমাদের মূল দায়িত্ব। আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে যে লড়াই তিনি শুরু করেছিলেন, সেই আদর্শের ধারাই আমরা বহন করবো।” তিনি আরও বলেন, “আমাদের কাছে ইনকিলাব মঞ্চ মানেই হাদি ভাই। আমরা এখনো বিশ্বাস করতে চাই না তিনি নেই। প্রতিটি কর্মসূচিতেই আমরা তার উপস্থিতি অনুভব করি।”
তবে বাস্তবতার কারণে ভবিষ্যতে মঞ্চের নেতৃত্ব কাঠামো চূড়ান্ত করা হবে বলেও জানান তিনি। সে ক্ষেত্রে কোনো সিদ্ধান্ত হলে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জাতির সামনে তা তুলে ধরা হবে।
ইনকিলাব মঞ্চের একই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন সংগঠনটির সদস্য সচিব আবদুল্লাহ আল জাবের। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে তিনি স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “হাদির ঘাতকদের বিচার করতে হবে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে। তার আগে কোনো জাতীয় নির্বাচন হতে পারে না।” তার ভাষায়, বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তারা অন্য কোনো বিষয়ে মনোযোগ দেবেন না।
মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর শাহবাগে আয়োজিত শহীদি শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে জাবের বলেন, “আগামী ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে দ্রুত বিচারিক ট্রাইব্যুনাল গঠন করে আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থার সহায়তায় শরীফ ওসমান হাদি হত্যার বিচার করতে হবে।” একই সঙ্গে তিনি ২৪ ও ২৫ ডিসেম্বর দেয়াললিখন, গ্রাফিতি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে হাদির বাণী দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান।
উল্লেখ্য, জুলাই আন্দোলনের চেতনা ধারণ করে এবং আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের অঙ্গীকার নিয়ে ২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট ইনকিলাব মঞ্চ প্রতিষ্ঠা করেন শরীফ ওসমান হাদি। শুরু থেকেই তিনি ছিলেন সংগঠনটির মুখপাত্র। সদস্য সচিবের দায়িত্বে আছেন আবদুল্লাহ আল জাবের এবং অন্যতম পরিচিত মুখ ডাকসু নেত্রী ফাতিমা তাসনিম জুমা।
জুলাই আন্দোলনের সময় রাজধানীর রামপুরা এলাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক ছিলেন হাদি। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবিতেও ইনকিলাব মঞ্চকে সঙ্গে নিয়ে রাজপথে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন তিনি। সবশেষ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘোষণা দিয়ে প্রচারণা চালান।
গত ১২ ডিসেম্বর জুমার নামাজ শেষে গণসংযোগ করে ফেরার পথে দুর্বৃত্তদের গুলিতে গুরুতর আহত হন হাদি। প্রথমে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে, পরে এভারকেয়ার এবং সর্বশেষ সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর তিনি শহীদ হন।
ইনকিলাব মঞ্চের নেতারা বলছেন, হাদির রক্ত বৃথা যেতে দেওয়া হবে না—এই হত্যার বিচার না হওয়া পর্যন্ত রাজপথ ছাড়বে না তারা।