পদ্মার পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন। প্রয়োজনে মাওলানা ভাসানীর মতো আবারও লংমার্চ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তিনি।
শনিবার (৭ নভেম্বর) রাত সাড়ে ৮টার দিকে রাজশাহীর পবা উপজেলার কাটাখালি পৌরসভায় রাজশাহী-নাটোর মহাসড়কের পাশে আয়োজিত পথসভা ও সংক্ষিপ্ত সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।
আখতার হোসেন বলেন, আগামী ডিসেম্বরে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে। গঙ্গা কিংবা পদ্মা যে নামেই ডাকা হোক, এই নদীর পানির প্রশ্নে বাংলাদেশের মানুষ একবিন্দুও ছাড় দেবে না। কারণ পদ্মার পানি শুধু পানির বিষয় নয়, এটি দেশের পরিবেশ, কৃষি, জীবন-জীবিকা ও অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িত।
তিনি বলেন, ১৯৭৬ সালে মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী রাজশাহী থেকে ফারাক্কা অভিমুখে ঐতিহাসিক লংমার্চ শুরু করেছিলেন। সেই ইতিহাস আজও প্রাসঙ্গিক। ফারাক্কা ব্যারাজ নির্মাণের আগে পদ্মায় যে পরিমাণ পানি প্রবাহিত হতো, পরবর্তী সময়ে শুষ্ক মৌসুমে তা অর্ধেকে নেমে এসেছে বলে দাবি করেন তিনি।
এতে পদ্মার শাখা ও উপনদীগুলোতে পানির প্রবাহ কমে গেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খুলনা এলাকায় সমুদ্রের লবণাক্ত পানি উজানের দিকে প্রবেশ করছে। পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় কৃষি ও পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বাংলাদেশের মানুষের অধিকার ও কৃষিকে ক্ষতিগ্রস্ত করার কোনো পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হতে দেওয়া হবে না।
বর্তমান সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে এনসিপির সদস্য সচিব বলেন, বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থ বিবেচনায় রেখে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তিতে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া যাবে না। পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশকে পানির অধিকার থেকে বঞ্চিত করার কোনো ষড়যন্ত্র হলে কিংবা কৃষি, পরিবেশ ও মানুষের অস্তিত্বের ওপর আঘাত এলে আবারও মাওলানা ভাসানীর মতো লংমার্চ কর্মসূচিতে যেতে এক মুহূর্তও দেরি করা হবে না। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও এ বিষয়ে কথা বলা হবে। তবে পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় করেই ছাড়া হবে।
গত ১৬ বছরের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে আখতার হোসেন বলেন, এ সময়ে দেশের মানুষ গুম, খুন ও আয়নাঘরের মতো বন্দিশালায় নির্যাতনের শিকার হয়েছে। অনেক মানুষ নিখোঁজ হয়েছেন, যাদের আর ফিরে পাওয়া যায়নি।
তিনি বলেন, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্দোলনের সময় বিএনপি, জামায়াতসহ বিরোধী দলগুলোর মধ্যে রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কারের বিষয়ে ঐকমত্য ছিল। তখন সবার বক্তব্য ছিল, রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কার না হলে একজন শাসকের পরিবর্তে আরেকজন শাসক আসবে, কিন্তু জনগণের মুক্তি আসবে না।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, রাজপথে নামা মানুষের লক্ষ্য ছিল শুধু শেখ হাসিনার সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা নয়, বরং বিদ্যমান শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন করে নতুন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। গণভোটে জনগণ তাদের সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটিয়েছে।
আখতার হোসেনের দাবি, গণভোটে ৭০ শতাংশ মানুষ ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার পরও বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের প্রথম দিন থেকেই সেই গণরায় উপেক্ষা করেছে। বর্তমানে গঠিত সংবিধান সংশোধন কমিটির কার্যক্রমও লোকদেখানো বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের বিষয়ে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এ ব্যবস্থার দাবিতে আন্দোলন হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা কে হবেন, তা নিয়ে সরকারি দল, বিরোধী দল ও দ্বিতীয় বৃহত্তম দলের সমন্বয়ে গঠিত ঐকমত্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে। ঐকমত্য না হলে ভোটাভুটির মাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচনের প্রস্তাবও দেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, নির্বাচনের সময় সরকার পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে দেশে বারবার সহিংসতা ও নানা সংকট তৈরি হয়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার নতুন ফর্মুলা আনা হয়েছে। তবে বিএনপি সরকার এ ব্যবস্থা নিয়ে আগের মতোই দুরভিসন্ধিমূলক অবস্থান নিয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
সমাবেশে প্রধান বক্তা ছিলেন এনসিপির সাংগঠনিক সম্পাদক ইমরান ইমন। বিশেষ অতিথি ছিলেন রাজশাহী জেলা এনসিপির আহ্বায়ক এম এ সবুর ও সদস্য সচিব নহিদুল ইসলাম সাজু। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কাটাখালি পৌরসভা এনসিপির আহ্বায়ক মাসউদুল ইসলাম।