জামায়াতে ইসলামীর আয়োজিত ‘জুলাই এখনো শেষ হয়নি’ শীর্ষক প্রদর্শনীতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ থাকলেও স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমানের ভূমিকার উল্লেখ না থাকায় প্রশ্ন উঠেছে।
এর ব্যাখ্যায় জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, প্রদর্শনীতে মূলত কর্তৃত্ববাদী ও ফ্যাসিবাদী শাসনের ধারাবাহিকতা এবং এর বিরুদ্ধে মানুষের আন্দোলনের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। জিয়াউর রহমানকে কর্তৃত্ববাদী শাসক হিসেবে বিবেচনা না করায় তার ভাষণ বা ভূমিকা প্রদর্শনীতে রাখা হয়নি।
শনিবার (৮ আগস্ট) রাজধানীতে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে আয়োজিত প্রদর্শনী পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জামায়াতের আমির এসব কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ইতিহাসে যার যে কল্যাণকর অবদান রয়েছে, তা স্বীকার করে তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা উচিত। প্রদর্শনীতে ইতিহাসকে নির্মোহ ও বাস্তবভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।
জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদর্শনীতে না থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে জামায়াত আমির বলেন, জিয়াউর রহমানকে আমরা স্বৈরাচারী বা কর্তৃত্ববাদী শাসক হিসেবে বিবেচনা করি না। তিনি বলেন, ‘উনি অটোক্রেট শাসক ছিলেন না।’
প্রদর্শনীতে যাদের কর্তৃত্ববাদী ও আগ্রাসী হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে, মূলত তাদেরই তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি মানুষের মুক্তি ও ন্যায্যতার জন্য যারা ভূমিকা রেখেছেন, তাদের অবদানও প্রদর্শনীর বিভিন্ন অংশে তুলে ধরা হয়েছে বলে জানান তিনি।
জামায়াতের এই প্রদর্শনীতে জুলাই আন্দোলনের পটভূমি, বিভিন্ন সময়ে মানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলন এবং আন্দোলনে হতাহত ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কথা তুলে ধরা হয়েছে বলে জানান ডা. শফিকুর রহমান।
তিনি বলেন, গত সাড়ে ১৫ বছর ধরে মানুষের অধিকার হরণের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে আন্দোলন হয়েছে। এসব আন্দোলনে অনেকে নিহত হয়েছেন, অনেকে আহত ও পঙ্গু হয়েছেন। অনেকে কারাবরণ করেছেন এবং বিভিন্ন মামলায় হয়রানির শিকার হয়েছেন।
এসব আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের জুলাইয়ে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে বড় ধরনের আন্দোলন গড়ে ওঠে।
জুলাই আন্দোলনের বিভিন্ন ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীদের ওপর হামলার ঘটনার পর আন্দোলনে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ বাড়তে থাকে। পরদিন ১৬ জুলাই রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদের মৃত্যুর পর আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয়। এরপর দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘাত ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।
৩ আগস্টের পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, ওই সময় সেনাবাহিনীর সাধারণ সদস্যদের একটি অংশ জনগণের ওপর গুলি চালাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। ৩ ও ৪ আগস্ট ব্যাপক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয় এবং ইন্টারনেট বন্ধ করে লাশ গুমের ঘটনাও ঘটানো হয়েছিল।
প্রদর্শনীর উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, এটি কোনো সরকারের সাফল্য তুলে ধরার আয়োজন নয়। বিভিন্ন সময়ে ফ্যাসিবাদী ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে জনগণের সংগ্রাম, নিপীড়নের ইতিহাস এবং শহিদ পরিবারের প্রত্যাশা মানুষের সামনে তুলে ধরাই এই প্রদর্শনীর মূল উদ্দেশ্য।
তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, তা এখনো পূরণ হয়নি। জনগণের অধিকার নিশ্চিত হওয়ার দিনই প্রকৃত অর্থে জুলাইয়ের সমাপ্তি হবে।
দেশের রাজনৈতিক সংস্কার প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে জামায়াতের আমির বলেন, জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন সংস্কার প্রস্তাব তৈরি হলেও গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এখনো মতভেদ রয়েছে।
বিশেষ করে বিচারপতি ও নির্বাচন কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রে দলীয় প্রভাবমুক্ত ব্যবস্থা নিশ্চিত করার প্রয়োজন রয়েছে বলে মত দেন তিনি।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো যেন কোনো রাজনৈতিক দলের প্রভাবাধীন না হয়, সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। বিচার বিভাগ ও নির্বাচন কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারলে জনগণের অধিকার ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার পথ আরও সুগম হবে।