ব্যাংকিং খাতে নজিরবিহীন দুর্নীতি ও আর্থিক বিপর্যয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে এস আলম গ্রুপের নাম। অন্তর্বর্তী সরকারের শুরু করা তদন্তে উঠে এসেছে—মাত্র একটি গ্রুপ, ছয়টি ইসলামী ব্যাংকের কাছ থেকে ঋণের নামে লুট করেছে কয়েক লাখ কোটি টাকা, যার মধ্যে শুধু ইসলামী ব্যাংক থেকেই আত্মসাৎ করা হয়েছে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা।
এর মধ্যে ৭০ হাজার কোটি টাকার উৎস ইতোমধ্যেই শনাক্ত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সোমবার উপদেষ্টা পরিষদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে এমনই বিস্ফোরক তথ্য তুলে ধরেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। তিনি জানান,
“এতোদিন যে দুর্নীতি ঘরে ঘরে চুপিচুপি ছড়িয়েছে, আজ তা রাষ্ট্রের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে অর্থনীতির শ্বাসরোধ করছে।”
এস আলম গ্রুপের পাশাপাশি এই চক্রে জড়িত রয়েছেন ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ীও। তাঁদের মধ্যে অন্যতম নাম সালমান এফ রহমান ও নজরুল ইসলাম মজুমদার। দেশ-বিদেশে তাদের গড়ে তোলা সম্পদের পাহাড় এখন সরকারের নজরদারিতে।
গভর্নর বলেন,
“যেসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রীয় ব্যাংক ব্যবস্থাকে জিম্মি করে অর্থ লোপাট করেছে, তাদের সম্পদ, শেয়ার ও ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে।”
প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানিয়েছেন, জব্দ করা এসব অর্থ থেকে একটি বিশেষ তহবিল গঠিত হচ্ছে, যা দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কল্যাণে ব্যয় করা হবে। পাশাপাশি আত্মসাৎ হওয়া অর্থ সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোতে ফিরিয়ে দিয়ে আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সরকারি তথ্যমতে, দেশে ইতোমধ্যে জব্দ করা সম্পদের পরিমাণ এক লাখ ত্রিশ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এর বাইরে বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদের পরিমাণ প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে বিভিন্ন দেশে ১৬৪ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থ ইতোমধ্যে অ্যাটাচমেন্টের আওতায় এসেছে। দেশেই ফ্রিজ করে রাখা হয়েছে আরও চার হাজার কোটি টাকার অস্থাবর সম্পদ।
সংবাদ সম্মেলনে আরও একটি বিস্ফোরক অভিযোগ উত্থাপন করেন গভর্নর। তিনি জানান, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস ‘নগদ’ ব্যাংকিং আইন লঙ্ঘন করে প্রায় ৬৫০ কোটি টাকার অতিরিক্ত ই-মানি তৈরি করেছে। গভর্নরের ভাষায়, “এক টাকা জমা রেখে এক টাকা ই-মানি তৈরির নিয়ম থাকলেও তারা নিয়মের বাইরে গিয়ে এই অপচেষ্টা করেছে—যা আর্থিক প্রতারণার পর্যায়ে পড়ে।”
তবে আশার কথা হলো, বিশ্বের কয়েকটি দেশ অর্থপাচারকৃত সম্পদ ফেরত পাঠাতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। গভর্নর আশাবাদ জানিয়ে বলেন, “আইনি কাঠামো দৃঢ় করে আমরা এগোতে পারলে দেশের এই হারানো অর্থ পুনরুদ্ধার সম্ভব। সেইসঙ্গে অর্থনৈতিক ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও আস্থা ফিরে পাবে।”
এই মুহূর্তে দেশের ব্যাংকিং খাত যে চরম আস্থাহীনতার মধ্যে রয়েছে, তা স্বীকার করেই গভর্নর বলেন, “এই সংস্কার যদি আমরা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে পারি, তাহলে আর্থিক খাত ঘুরে দাঁড়াবে—আর জনগণ বুঝতে পারবে, রাষ্ট্র এখন আর দুর্নীতির আশ্রয়স্থল নয়, বরং জবাবদিহির জায়গা।”
এই ঘটনা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় এক নতুন যুগের সূচনা ঘটাতে পারে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। প্রশ্ন এখন একটাই—এই লুটপাটের বিচার হবে কেবল আইনি নথিতে, না কি ইতিহাসের কাঠগড়ায়ও?