রবিবার, ১০ মে ২০২৬

পরীক্ষামূলক সংস্করণ

জাতীয়

৯০ হাজার ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার বিরুদ্ধে তদন্তে চলছে: মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক উপদেষ্টা   

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক উপদেষ্টা ফারুক ই আজম বীর প্রতীক বলেছেন, ৯০ হাজার ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার অভিযোগ তদন্তের জন্য ডাটা এন্ট্রির কাজ চলছে। তিনি বলেন, ‘এপর্যন্ত ৯০ হাজার ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে অভিযোগ পেয়েছি। এরমধ্যে ৪০ হাজার ডাটা এন্ট্রি হয়ে গেছে। ৫০ হাজার ডাটা এন্ট্রির কাজ চলমান রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় এখন সেগুলো যাছাই-বাছাই করছে।’ মহান […]

৯০ হাজার ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার বিরুদ্ধে তদন্তে চলছে: মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক উপদেষ্টা   

ছবি: সংগৃহীত

নিউজ ডেস্ক

২৮ মার্চ ২০২৫, ০৯:৪৬

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক উপদেষ্টা ফারুক ই আজম বীর প্রতীক বলেছেন, ৯০ হাজার ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার অভিযোগ তদন্তের জন্য ডাটা এন্ট্রির কাজ চলছে।

তিনি বলেন, ‘এপর্যন্ত ৯০ হাজার ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে অভিযোগ পেয়েছি। এরমধ্যে ৪০ হাজার ডাটা এন্ট্রি হয়ে গেছে। ৫০ হাজার ডাটা এন্ট্রির কাজ চলমান রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় এখন সেগুলো যাছাই-বাছাই করছে।’

মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসস’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক উপদেষ্টা ফারুক ই আজম বীর প্রতীক- ১৯৭১ সালের রণাঙ্গনে অসামান্য অবদানের জন্য বীর প্রতীক হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেয়েছেন। তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সময় ১৫ আগষ্ট দিবাগত মধ্যরাতের পর অর্থাৎ ১৬ আগস্টের ভোর রাতে চট্টগ্রাম বন্দরে পরিচালিত নৌ গেরিলা অপারেশন ‘জ্যাকপটের’ ডেপুটি কমান্ডার। দেশের প্রধান সমুদ্র বন্দর ও নৌ বন্দরগুলো থেকে পাকিস্তানি সেনাদের বিতাড়িত করে মুক্তাঞ্চল করার এই যুদ্ধ অপারেশন জ্যাকপট। ওই সময় অপারেশন জ্যাকপটের খবর দেশ-বিদেশের সংবাদ মাধ্যমে ফলাও করে প্রচার করার কারণে সেদিন রণাঙ্গণের মুক্তিযোদ্ধারা মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য দ্বিগুণ উৎসাহ-উদ্দীপনায় যুদ্ধ চালিয়ে গিয়েছিল। অপারেশন জ্যাকপট ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় নৌ-সেক্টর পরিচালিত সফলতম গেরিলা অপারেশন। এটি ছিল একটি আত্নঘাতি অপারেশন। এই অপারেশনে ক্ষতিগ্রস্ত পাকিস্তানি অস্ত্র ও রসদবাহী জাহাজগুলোর পাশাপাশি পাকিস্তানি বাহিনীকে সাহায্যকারী অনেক বিদেশী জাহাজও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্ব সারাবিশ্বে পরিচিতি পায়।

মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা- বাসস’র সাথে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করেছেন উপদেষ্টা ফারুক ই আজম বীর প্রতীক। কথা বলেছেন, স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রেক্ষাপট, যুদ্ধে যাবার স্বপ্ন, বিজয় অর্জন নিয়ে। শুনেছেন মেজর জিয়ার কন্ঠে স্বাধীনতার ঘোষণা। বলেছেন, সেই স্বপ্ন এবং বর্তমানের বাস্তবতা দেখলে কষ্ট পাই। বর্তমানে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে ফেরিওয়ালাদের রাজনৈতিক বাণিজ্য, মুক্তিযোদ্ধাদের সামাজিক মর্যাদা ক্ষুন্ন, রাজনৈতিক বিবেচনায় ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সৃষ্টি সহ সামগ্রিকভাবে মুক্তিযুদ্ধকে দলীয় রাজনীতির রঙে রঙ্গীন করা হয়েছে। এখনো বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন হয়। দারিদ্র, নারী অধিকার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য সেবার মতো মৌলিক বিষয় নিয়ে সংগ্রাম করতে হয়।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে বাসস প্রতিনিধির সাথে আলাপকালে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক উপদেষ্টা ফারুক ই আজম বলেন, রণাঙ্গনে যুদ্ধ করেছি বিবেকের তাড়নায়। সেদিন ২২ বছরের এই যুবক যুদ্ধে গিয়েছিল পাকিস্তানি শাসকের শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের আগুন জ্বালিয়ে। স্বপ্ন ছিল স্বাধিকারের। স্বপ্ন ছিল রাজনৈতিক স্বাধীনতার, অর্থনৈতিক স্বাধীনতার। বাঙালির সামাজিক মর্যাদার। কোন রাজনৈতিক দলের কর্মী ছিলাম না। মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হিসাবে বেঁচে থাকার সংগ্রামে এসএসসি পাশের পর বাড়ী থেকে বের হয়ে গিয়েছিলাম কাজের সন্ধানে অচিন এলাকা খুলনায়।

মুক্তিযুদ্ধের কথা বলতে গেলে তো সেই সময়ের প্রেক্ষাপট এখন উপস্থাপন করা কোনভাবেই সম্ভব হবে না। সেটা একটা উত্তাল গণ আন্দোলনের মধ্য থেকে গড়ে ওঠা স্বাধীকারের চেতনা। পাকিস্তানীদের বাঙালি বৈষম্যের বিরুদ্ধে গড়ে উঠা পুঞ্জীভুত ক্ষোভ ও আন্দোলনের প্রেক্ষিতে ৭০এর নির্বাচন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুষ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন। তখন মনে করেছিলাম পাকিস্তান রাষ্ট্র শাসনের অধিকার পাবে বাঙালি। কিন্তু নানা তালবাহানায় এই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব না দিয়ে পুর্ব পাকিস্তানের মানুষের মধ্যে শোষণের শঙ্কা জাগিয়ে তুললো পশ্চিম পাকিস্তানিরা।

ফারুক ই আজম বলেন, ১৯৬৬ সালে এসএসসি পাশ করার পর বুঝলাম কলেজে পড়া হবেনা। ওই বছরের আগস্ট মাসে পরিবারের অগোচরে কাউকে কিছু না জানিয়ে মাত্র ৫০ টাকা সম্বল করে খুলনার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমাতে বাড়ি ছাড়লাম। তখন খুলনায় আমাদের বাড়ির কয়েকজন চাকরি ও ব্যবসা করতেন। ধারণা করেছিলাম, তাদের কাছে গেলে চাকরি পাব। সেখানে পৌছে খুলনায় ইস্টার্ণ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট নামের একটা জলপরিবহন কোম্পানিতে সুপারভাইজার এর চাকরি পেলাম। সেখানেই ১৯৭১ সালের মার্চ পর্যন্ত নিয়মিত চাকরি করেছি।

১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ হাজার হাজার জনতার সঙ্গে আমিও খুলনার হাদিস পার্কে গেলাম। আলোচনা হচ্ছিল, ঢাকার রেসকোর্স থেকে শেখ মুজিব স্বাধীনতার ঘোষণা দেবেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা শোনা ছাড়া আর কিছু চাওয়ার নেই আমাদের। যেহেতু ৭ মার্চের ভাষণ তাৎক্ষণিক শুনতে পাইনি, তাই বিভিন্ন আলোচনার ঢালপালা গজাচ্ছিল। কেউ বলেছে, বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে, কেউ বললো করেনি। পরদিন সকালে রেডিও পাকিস্তান ঢাকা কেন্দ্র থেকে সম্প্রচারিত ভাষণটি শুনতে পাই। এর কয়েকদিন পর আজম খান কলেজের পাশে পাকিস্তানীদের নির্মমতা দেখতে পাই। গুলি করে হত্যা করা ৭/৮ জনের লাশ দেখতে পেলাম।

ফারুক ই আজম বলেন, ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ সকাল দশটা থেকে তিন ঘন্টার জন্য কারফিউ শিথিল হলে আমরা তিন বন্ধু কাঞ্চন, মোহাম্মদ হেনে ও আমি মুন্সিপাড়া ইসলাম সাহেবের বাড়ির দিকে গেলাম। সেখানে খান জাহান আলী রোডের একটি গলির মুখে ৭/৮ টি লাশ দেখতে পেলাম। বিকেলে মৌলভী পাড়ার গলিতে ঢুকলাম। সেখানে চামড়ায় বাধানো ট্রানজিস্টারে ক্ষিণ কন্ঠে শুনতে পেলাম স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র চট্টগ্রাম থেকে ‘আমি মেজর জিয়া বলছি, …বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি। বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈন্য, বিডিআর,পুলিশ দখলদার পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছে। সর্বত্র তাদের সহযোগিতায় এগিয়ে আসার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহবান জানাচ্ছি। আমি বিশ্বের সব দেশ ও সরকারকে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি ও সাহায্যে এগিয়ে আসার অনুরোধ জানাচ্ছি।’

ফারুক ই আজম বলেন, প্রায় দুই শতাধিক লোক আমরা জড়ো হয়ে নীরব নিস্তব্ধতায় একজন বাঙালি সেনা মেজরের মুখে বহুকাঙ্খিত স্বাধীনতার ঘোষণা শুনলাম এবং যুদ্ধে যাবার আহ্বান শুনে আমাদের মধ্যে বীরত্বের শিহরণ হয়ে গেল। আমার ওই সময় অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। চট্টগ্রামে আমার জন্মানোর সার্থকতায় গর্ববোধ করলাম। এই চট্টগ্রাম থেকেই স্বাধীনতার ঘোষণা। ওই মুহুূর্তে শপথ নিলাম, যে করেই হোক চট্টগ্রাম যাব এবং মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেব। কারফিউ চলছে। ব্যাচেলর বাসা থেকে স্থানীয় তাহের সাহেবের বাসায় তিন বন্ধু উঠলাম। কারফিউ শিথিল হলে অফিসে যাই। তখন থেকেই চট্টগ্রাম ফেরার সুযোগ খুজঁতে থাকি। একদিন জাহাজে চড়লাম এবং চট্টগ্রাম ফিরে আসলাম।

তিনি বলেন, ৭১ সালের মে মাসের ৫ তারিখে ২৮ জনের একটি দল রামগড় হয়ে ভারতে যাবার জন্য বাড়ি ছাড়লাম এবং ভারতের সাবরুম হয়ে হরিণা ক্যাম্পে পৌছঁলাম। ওখানে স্বাধীনতার ঘোষক মেজর জিয়াকে দেখার খুব ইচ্ছে হলো। শুনলাম তিনি আগরতলা গেছেন। বিকেলে আমাদের নৌ যুদ্ধের জন্য তালিকাভুক্ত করা হয়। সেখানে দেখা হয় ক্যাপ্টেন রফিকের সাথে। ভারতীয় নৌবাহিনীর কমান্ডার জি, মার্টিসের নেতৃত্বে ১ জুন থেকে ভাগিরথি নদীতে জাহাজ বিধ্বংসী মাইন, নোঙ্গরের শিকল কাটা, পানির নিচে বিস্ফোরকের প্রশিক্ষণ আমাদের প্রয়োজনীয় ট্রেনিং করানো হলো।

ফারুক ই আজম বলেন, আগস্ট মাসের এক তারিখে পলাশি রেস্ট হাউস কাম জাদুঘরের সামনে আমাদের সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করানো হয়। প্রশিক্ষণের প্রধান কমান্ডার সামান্তা আমাদের মধ্য থেকে পূর্ব পাকিস্তানের সব নদী ও সমুদ্র বন্দরের জন্য কমান্ডো দল বাছাই করেন। আমি চট্টগ্রামের জন্য বাছাই করা ৬০ জনের দলের অন্তর্ভুক্ত হলাম। দলের অধিনায়ক মনোনীত হলেন আব্দুল ওয়াহেদ চৌধুরী। তিনি ফ্রান্স থেকে পালিয়ে আসা নাবিকদের একজন ছিলেন। তার ডেপুটি কমান্ডার হলেন শাহ আলম নামে চট্টগ্রাম মেডিকেলের একজন ছাত্র। চট্টগ্রামের দলকে ২০ জন করে তিন ভাগে ভাগ করা হলো। বিভক্ত বিশজনের একটি দলে শাহ আলম অধিনায়ক এবং তাঁর ডেপুটির দায়িত্ব পাই আমি। এভাবে মংলা, খুলনা, চাঁদপুর সহ দেশের নদী ও সমুদ্র বন্দরের জন্য নৌ কমান্ডো দল ঠিক করা হয়।

তিনি বলেন, ১১ আগষ্ট তিনটি গ্রুপে ৬০ জনের একটি দল চট্টগ্রামের উদ্দ্যেশে রওনা হলাম। ১৪ আগষ্ট পাকিস্তানের প্রজাতন্ত্র দিবস। ১৫ আগষ্ট সকাল থেকে রেকি করা হলো। অভিযানের কমান্ডার আবদুল হক চৌধুরী ও চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র শাহ আলম এসে বললো রাতেই বন্দরে অভিযান করতে হবে। আল মানা জাহাজে মাইন বাধতে না পারলেও গ্রিক জাহাজ এবলোস-এ মাইন বাধা হলো। কয়েকঘন্টার মধ্যে পরপর ৪ টি মাইন বিস্ফোরিত হলো। ১৫ হাজার টনের গ্রিক জাহাজ ডুবিয়ে দেয়া হলো। আমরা আনন্দে উল্লসিত হয়ে উঠলাম।

ফারুক ই আজম বলেন, ১৯৭০ এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুষ বিজয় লাভের পরও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ক্ষমতা হস্তান্তর না করার প্রতিশোধের আগুন জ্বলে ওঠে বাংলাদেশে। নয় মাসের সেদিন দেশ স্বাধীন হয়েছে লাখো মুক্তিযোদ্ধার শাহাদাত বরণ ও রক্তের বিনিময়ে, মা-বোনদের ইজ্জতের বিনিময়ে দেশ স্বাধীন হয়েছে। কিন্তু দেশ স্বাধীনের পর ৫৪ বছরে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারিনি আমরা। এখনো আমাদের সংগ্রাম করতে হচ্ছে বৈষম্যের বিরুদ্ধে। ২৪ এর জুলাই বিপ্লব ছিল স্বৈরাচারের পতনের মধ্য দিয়ে নতুন করে স্বপেরœ বীজ বপনের। জুলাই-আগস্ট বিপ্লবে রাজপথ কাঁপানো আন্দোলনে হাজার হাজার ছাত্র জনতার অভ্যুত্থানে দেড় সহস্র মানুষ শহীদ হয়েছে। কয়েক হাজার লোক আহত ও পঙ্গুত্বের শিকার হয়েছেন। স্বৈরাচারের পতন ঘটিয়ে ছাত্র জনতার বিজয়ের পতাকা উড্ডীন হয়েছে। বর্তমান অর্ন্তবর্তী সরকার তাদের সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের উত্তরসুরি হিসেবে কাজ করছে।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রনালয় উপদেষ্টা বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের শ্রেণীবিন্যাস এবং ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে উপদেষ্টা বলেন, মুক্তিযুদ্ধকে রাজনীতিকরণ করা হয়েছে। রাজনৈতিক চেতনায় মুক্তিযোদ্ধাদের পরিচয় করানো হয়েছে। স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও সেদিনের অপ্রাপ্ত বয়স্ক শিশুরাও মুক্তিযদ্ধের তালিকায় রাজনৈতিক বিবেচনায় অর্ন্তভুক্ত করা হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও নাতি- নাতনি না হয়েও ভুয়া কাগজ তৈরী করে চাকুরী ও শিক্ষাসহ বিভিন্ন সেক্টরে কোটা সুবিধা নিয়েছে। এসব এখন তদন্তের অধীনে আসছে। স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও আমাদের একটি প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার তালিকা তৈরি হয়নি। রাজনৈতিক সরকারের আমলে রাজনৈতিক বিবেচনায় বিভিন্ন তদবির ও দুর্নীতির মাধ্যমে হাজার হাজার ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা তালিকাভুক্ত হয়েছে। তারা ভাতাসহ বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা ভোগ করছে। দেখা যাচ্ছে, আবেদনে যেই মুক্তিযোদ্ধা যুদ্ধে অংশগ্রহণের ‘তথ্য প্রমাণ ও ডিক্লারেশন’ দিয়েছেন, ‘আমি অমুক সেক্টরে অমুক জায়গায় যুদ্ধ করেছি’ খোঁজ নিয়ে দেখা যাচ্ছে সেই সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার বা অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধারা তাকে চিনেনইনা। কখনো দেখেননি। এরকম শত শত ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে অভিযোগ মন্ত্রণালয়ে জমা পড়েছে। এপর্যন্ত ৯০ হাজার ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার বিরুদ্ধে বিভিন্ন জেলা থেকে অভিযোগ পেয়েছি। এরমধ্যে ৪০ হজার ডাটা এন্ট্রি হয়ে গেছে। ৫০ হাজার ডাটা এন্ট্রির কাজ চলমান রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় এখন সেগুলো যাছাই-বাছাই করছে। ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের স্বেচ্ছায় নাম প্রত্যাহারের আহ্বান জানানো হবে। ইতোমধ্যে কয়েকজন নাম প্রত্যহারের আবেদন করেছেন। যারা নাম প্রত্যাহার করবেন, তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হবেনা। অভিযোগ পাওয়া মুক্তিযোদ্ধাদেরকে সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র জমা দেয়ার চিঠি দেয়া হবে। তাদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেয়া হবে। তাদের কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করা হবে। শুনানী করে যাদের কাগজপত্র ঠিক আছে, তারা গেজেটভুক্ত থাকবে। আর যারা অভিযোগ প্রমাণ করতে পারবেনা তাদের গেজেট বাতিল করে শাস্তিমুলক ব্যবস্থা নেয়া হবে। মুক্তিযোদ্ধা সংসদ গঠনের পর দ্রুত বিষয়টি নিস্পত্তির উদ্দ্যেগ নেয়া হবে। আশা করছি সময় কিছুটা ক্ষেপন হলেও প্রকৃত রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধার তালিকা প্রস্তুতে সফলতা আসবে।

তিনি বলেন, সরকার রণাঙ্গনের প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা ও সহযোগি মুক্তিযোদ্ধা চিহ্নিত করার কাজ করছে। যেসব কৃষক-শ্রমিক, সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ,নৌ কমান্ডো, আনসার, ইপিআর যুদ্ধ করেছে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাদের মর্যাদা কখনো সীমান্ত পাড়ি দেয়া,কিংবা বিদেশে বসে আরাম আয়েশে জনমত সৃষ্টির প্রচারণা চালানো, ফুটবল খেলোয়াড়, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে গান গাওয়া মুক্তিযোদ্ধার মর্যাদা এক হতে পারেনা। তাই মন্ত্রনালয় মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশ গ্রহণ ছাড়া অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধাদের ‘সহযোগি মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে চিহ্নিত করার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েছে। এব্যাপারে উপদেষ্টা পরিষদে আলোচনা প্রজ্ঞাপন জারি করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

যারা রণাঙ্গনে ২৬ শে মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশের বিভিন্নস্থানে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসরদের বিরুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধ করেছেন তারা রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধা। অপরদিকে যারা বিদেশে জনমত তৈরীর প্রচার চালিয়েছেন, স্বাধীন বাংলা ফুটবল টিমের খেলোয়াড়, স্বাধীন বাংলা বেতারের শিল্পী, সাংবাদিক, ডাক্তার, নার্স, চিকিৎসা সহকারী সহ যারা মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় রয়েছেন,তাদের সহযোগি মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে স্বীকৃতির বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।

মুক্তিযুদ্ধের সেদিনের চেতনার সাথে এখনকার চেতনা মেলানো যাবে না। এখন সবাই সুবিধাভোগি এবং চেতনাকে নানাভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা ইমেজ সংকটে পড়েছে। তাদের সম্মান

তিনি বলেন, গেজেট অনুযায়ী শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ৬ হাজার ৭৫৭ জন। এরমধ্যে ভাতা গ্রহণ করছেন ৫ হাজার ৩৫৮ জনের পরিবার। অবশিষ্ট ১৩৯৯ জন ভাতা গ্রহন করছেন না। তারা এ পর্যন্ত আবেদনও করেনি। এই শহীদ পরিবারগুলো কোথায়, কেন তারা ভাতা গ্রহণ করছেননা রাষ্ট্র জানে না। রাষ্ট্রকে তাদের কাছে যাওয়া উচিত। তাদের খুঁজে বের করা উচিৎ। কারা এই শহীদ পরিবার। আমার মনে হয়, মুক্তিযুদ্ধে যারা অংশ নিয়েছেন, তাদের অধিকাংশই গ্রামের কৃষক, শ্রমিক জনগণ। তারা জানেনা কিভাবে সরকারের কাছে আবেদন করতে হয়। শহীদ পরিবারগুলো খুঁজে বের করার জন্য জেলা প্রশাসকদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আমাদের প্রচেষ্টা থাকবে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ পরিবারগুলোকে খুঁজে বের করে রাষ্ট্রের প্রদত্ত সুযোগ সুবিধার আওতায় আনা।

উপদেষ্টা জানান, মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রনালয় কোনরূপ রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ছাড়া নির্মোহভাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত রেখে মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণ ও সম্মানিত করতে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তা বাস্তবায়ন করা গেলে অর্ধ শতাব্দির বঞ্চনার ইতিহাসের পরিসমাপ্তি হবে।

জাতীয়

সবার হাতে এ কে-৪৭ থাকবে, ব্যালট বাক্সে হাত দিলে হাতই থাকবে না : এডিসি জুয়েল

নির্বাচনী নিরাপত্তা নিয়ে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এডিসি জুয়েল। তিনি বলেছেন, নির্বাচন চলাকালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সর্বোচ্চ কঠোর অবস্থানে থাকবে এবং ব্যালট বাক্সে হাত দেওয়ার চেষ্টা করলে কঠিন পরিণতি ভোগ করতে হবে। তার বক্তব্য—“সবার হাতে এ কে-৪৭ থাকবে, ব্যালট বাক্সে হাত দিলে হাতই থাকবে না।” সোমবার (১০ ফেব্রুয়ারি) এক নিরাপত্তা সংক্রান্ত ব্রিফিংয়ে এসব […]

নিউজ ডেস্ক

১০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১৮:৫৯

নির্বাচনী নিরাপত্তা নিয়ে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এডিসি জুয়েল। তিনি বলেছেন, নির্বাচন চলাকালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সর্বোচ্চ কঠোর অবস্থানে থাকবে এবং ব্যালট বাক্সে হাত দেওয়ার চেষ্টা করলে কঠিন পরিণতি ভোগ করতে হবে। তার বক্তব্য—“সবার হাতে এ কে-৪৭ থাকবে, ব্যালট বাক্সে হাত দিলে হাতই থাকবে না।”

সোমবার (১০ ফেব্রুয়ারি) এক নিরাপত্তা সংক্রান্ত ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন এডিসি জুয়েল। তিনি বলেন, অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েছে। কোনো ধরনের সন্ত্রাস, ভোট কারচুপি কিংবা কেন্দ্র দখলের চেষ্টা বরদাস্ত করা হবে না।

এডিসি জুয়েল আরও বলেন, নির্বাচনের দিন প্রতিটি কেন্দ্র থাকবে কড়া নজরদারিতে। পুলিশ, বিজিবি ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালন করবে। যারা ভোটের পরিবেশ নষ্ট করতে চাইবে, তাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তার এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। কেউ কেউ এটিকে কঠোর বার্তা হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ ভাষা ব্যবহারের সমালোচনাও করছেন।

তবে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বক্তব্যের মূল উদ্দেশ্য ছিল নির্বাচন নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে আস্থা তৈরি করা এবং দুষ্কৃতকারীদের সতর্ক করা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নির্বাচনকে ঘিরে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা হতে দেবে না বলেও তারা পুনর্ব্যক্ত করেছে।

জাতীয়

মাদ্রাসা ছাত্ররা ভালোভাবে কোরআন শেখেনি বলেই আমরা ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগ দিতে পারছিনা : শিক্ষামন্ত্রী

দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার নানা সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন শিক্ষা ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি বলেছেন, মাদরাসা থেকে পাস করা অনেক শিক্ষার্থী প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে না পারায় ধর্মীয় শিক্ষক পদে নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। বুধবার সিলেটে এক মতবিনিময় সভায় তিনি জানান, প্রায় ৯ হাজার […]

নিউজ ডেস্ক

১৫ এপ্রিল ২০২৬, ১৮:০৮

দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার নানা সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন শিক্ষা ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি বলেছেন, মাদরাসা থেকে পাস করা অনেক শিক্ষার্থী প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে না পারায় ধর্মীয় শিক্ষক পদে নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

বুধবার সিলেটে এক মতবিনিময় সভায় তিনি জানান, প্রায় ৯ হাজার ধর্মীয় শিক্ষক পদ খালি থাকলেও উপযুক্ত প্রার্থী পাওয়া যাচ্ছে না। তার মতে, অনেক শিক্ষার্থী কোরআনের যথাযথ জ্ঞান অর্জন করতে পারছে না এবং কওমি ধারার শিক্ষার্থীদের স্বীকৃত সমমানের ডিগ্রির অভাবও একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মন্ত্রী আরও বলেন, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার এই সমস্যা দীর্ঘদিনের এবং এটি একদিনে তৈরি হয়নি। তিনি শিক্ষা সংস্কারে সরকারের প্রচেষ্টার কথা তুলে ধরে জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়া-এর সময়কার শিক্ষা উন্নয়নের কথাও উল্লেখ করেন।

নৈতিক শিক্ষার ঘাটতির বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন তিনি। তার মতে, পুঁথিগত শিক্ষার পাশাপাশি নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষার ওপর জোর না দিলে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়।

এই প্রেক্ষাপটে তিনি শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং যোগ্য শিক্ষক তৈরি ও নিয়োগ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।

জাতীয়

আওয়ামী লীগ আমলের নিয়োগ: তদন্তের মুখে পুলিশ বাহিনীর সাড়ে ৯ হাজার নিয়োগ

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পুলিশ বাহিনীতে নিয়োগ পাওয়া সাড়ে নয় হাজারের বেশি সদস্যের নিয়োগপ্রক্রিয়া খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। তাঁদের নিয়োগ যাচাই-বাছাই করে তদন্তের জন্য পুলিশ সদর দপ্তরকে ইতিমধ্যে নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। এই পুলিশ সদস্যদের মধ্যে দেড় হাজারজন উপপরিদর্শক (এসআই) পদে এবং কনস্টেবল পদে আট হাজারের বেশি নিয়োগ পেয়েছিলেন। তাঁরা গোপালগঞ্জসহ বৃহত্তর […]

আওয়ামী লীগ আমলের নিয়োগ: তদন্তের মুখে পুলিশ বাহিনীর সাড়ে ৯ হাজার নিয়োগ

আওয়ামী লীগ আমলের নিয়োগ: তদন্তের মুখে পুলিশ বাহিনীর সাড়ে ৯ হাজার নিয়োগ

নিউজ ডেস্ক

২৭ মার্চ ২০২৬, ০৯:৪৭

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পুলিশ বাহিনীতে নিয়োগ পাওয়া সাড়ে নয় হাজারের বেশি সদস্যের নিয়োগপ্রক্রিয়া খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। তাঁদের নিয়োগ যাচাই-বাছাই করে তদন্তের জন্য পুলিশ সদর দপ্তরকে ইতিমধ্যে নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

এই পুলিশ সদস্যদের মধ্যে দেড় হাজারজন উপপরিদর্শক (এসআই) পদে এবং কনস্টেবল পদে আট হাজারের বেশি নিয়োগ পেয়েছিলেন। তাঁরা গোপালগঞ্জসহ বৃহত্তর ফরিদপুর, কিশোরগঞ্জ, মাদারীপুর ও শরীয়তপুরের বাসিন্দা। অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের অনেকে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মী অথবা দলীয় রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পরিবারের সদস্য।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জেলা কোটা লঙ্ঘন এবং স্থায়ী ঠিকানার তথ্য গোপন করে রাজনৈতিক প্রভাবে অনিয়মের মাধ্যমে এসব উপপরিদর্শক ও কনস্টেবলকে নিয়োগ দেওয়া হয়ে থাকতে পারে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পুলিশ সদর দপ্তর এসব নিয়োগ যাচাই-বাছাই করবে। অসংগতি পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিগত সরকারের (আওয়ামী লীগ সরকার) আমলে পুলিশের নিয়োগে বিভিন্ন পর্যায়ে জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। অনেকে স্থায়ী ঠিকানা পরিবর্তন করে ও অনিয়মের মাধ্যমে নিয়োগ পেয়েছেন। বিষয়গুলো তদন্তের জন্য পুলিশ সদর দপ্তরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তদন্তে যেন কারও প্রতি অন্যায় বা জুলুম করা না হয়, সে বিষয়েও সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের অনিয়ম করার সাহস কেউ না পায়, সে লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখার একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর দ্বিতীয় বৈঠকেই পুলিশের এসব নিয়োগপ্রক্রিয়া যাচাইয়ের নির্দেশ দিয়েছেন। এই তদন্ত করবে মূলত পুলিশ সদর দপ্তর এবং এ বিষয়ে যেকোনো সহায়তা দেবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ঠিকানা পরিবর্তন, কোটা জালিয়াতি এবং ‘ছাত্রলীগ কোটা’ থেকে সরাসরি নিয়োগ পাওয়া এক হাজার ২১৭ জনসহ নানা অনিয়মের মাধ্যমে অন্তত দেড় হাজার উপপরিদর্শক ও আট হাজারের বেশি কনস্টেবলের নিয়োগপ্রক্রিয়া পুনরায় যাচাই-বাছাই করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। পরে এ সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

সূত্র বলেছে, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরে সারা দেশে পুলিশ বাহিনীতে প্রায় ৪৫ হাজার সদস্য নিয়োগ দেওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে উপপরিদর্শক অন্তত ১০ হাজার ও কনস্টেবল পর্যায়ে ৩৫ হাজার।

বিএনপি ও সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোর দীর্ঘদিনের অভিযোগ ছিল, বিগত আওয়ামী লীগ সরকার দলীয় লোকজনকে পুলিশ বাহিনীতে নিয়োগ দিয়েছে। পুলিশকে দলীয়করণের মাধ্যমে রাজনৈতিক কাজে অর্থাৎ বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের ধরপাকড়, গুম, হত্যা, নির্যাতন ও দমন-পীড়নে ব্যবহার করেছে।

পুলিশের সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, কনস্টেবল নিয়োগের ক্ষেত্রে জেলাভিত্তিক কোটা থাকলেও তা লঙ্ঘন করে গোপালগঞ্জসহ বৃহত্তর ফরিদপুর, কিশোরগঞ্জ ও মাদারীপুরের বিপুলসংখ্যক লোক নিয়োগ করা হয়। এসব অঞ্চলে কোটার ৩ গুণেরও বেশি লোক নিয়োগ দেওয়া হয়। বৃহত্তর ফরিদপুর অঞ্চল থেকে ১০ হাজার এবং কিশোরগঞ্জ থেকে ৭ হাজার পুলিশ সদস্য নিয়োগ দেওয়া হয়। শুধু গোপালগঞ্জ জেলা থেকেই নিয়োগ পান ৮ হাজার জন। মাদারীপুর ও শরীয়তপুর জেলা থেকেও বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য নিয়োগ দেওয়া হয়।

এর বাইরে ঢাকা জেলার ধামরাই উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের বাসিন্দা সাজিয়ে এক হাজার লোককে কনস্টেবল পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। এই নিয়োগ হয় ২০১১ সাল থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে। ভুয়া জমির দলিল ও জাল নাগরিক সনদের ভিত্তিতে অন্য জেলার লোকদের ধামরাই উপজেলার বাসিন্দা দেখিয়ে কনস্টেবল পদে নিয়োগের ব্যবস্থা করে পুলিশের ভেতরের আওয়ামী লীগপন্থী একটি চক্র।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কনস্টেবলদের মতো উপপরিদর্শক পদে আট ব্যাচের নিয়োগেও জেলা কোটা মানা হয়নি। গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর ও মাদারীপুরের প্রার্থীদের বেশি নিয়োগ দেওয়া হয়। অন্য জেলার নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছিল আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মী এবং দলীয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িত পরিবারের সদস্যদের।

উপপরিদর্শক নিয়োগ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০১২ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত আটটি (৩৩তম থেকে ৪০তম) ব্যাচে অন্তত ১০ হাজার উপপরিদর্শক নিয়োগ করা হয়। ২০১৮ সালে সরকারি চাকরিতে নিয়োগে কোটা বাতিলের পরিপত্র জারির আগপর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধা, জেলা, নারী, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও প্রতিবন্ধী—এই পাঁচ ক্যাটাগরিতে মোট ৫৬ শতাংশ কোটা ছিল।

৩৬তম থেকে ৪০তম ব্যাচের নিয়োগ পর্যালোচনায় দেখা যায়, জেলা কোটা অনুযায়ী গোপালগঞ্জের শূন্য দশমিক ৮১ শতাংশ প্রার্থী নিয়োগের সুযোগ থাকলেও নিয়োগ পায় ৩ দশমিক ৮৮ শতাংশ, যা সংখ্যায় ২৩২ জন। ফরিদপুরের ক্ষেত্রে ১ দশমিক ৩৩ শতাংশের সুযোগ থাকলেও নিয়োগ দেওয়া হয় ১৮৭ জনকে। শূন্য দশমিক ৮১ শতাংশ কোটার সুযোগ থাকা মাদারীপুর থেকে নিয়োগ পান ১৩৩ জন। এভাবে কোটা লঙ্ঘন করে ৫৫২ জন উপপরিদর্শক নিয়োগ করা হয়। এই ব্যাচগুলোতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া ৬৬৫ জন রয়েছেন। জনশ্রুতি রয়েছে, তাঁরা সরাসরি ছাত্রলীগ-সম্পৃক্ত কোটায় নিয়োগ পেয়েছেন।

অভিযোগ রয়েছে, ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এই উপপরিদর্শকদের নিয়োগ দিয়ে মাঠে নামাতে নানা অনিয়ম করা হয়। দুই বছরের প্রশিক্ষণ কমিয়ে এক বছর করা হয়। লিখিত পরীক্ষা শেষে মৌখিক পরীক্ষা (ভাইভা) নেওয়ার আগেই পুলিশ ভেরিফিকেশন সম্পন্ন করা হয়।

সার্বিক বিষয়ে সদ্য বিদায়ী পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজি) বাহারুল আলম বলেন, সচিবালয়ে এক বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিগত সময়ে অনিয়ম ও জালিয়াতির মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া পুলিশ সদস্যদের নিয়োগপ্রক্রিয়া যাচাই-বাছাই করে দেখার নির্দেশ দিয়েছেন। কোনো ধরনের অসংগতি পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইতিমধ্যে মন্ত্রীর বার্তা পুলিশ সদর দপ্তরে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। তদন্ত কমিটি গঠন করে নিয়োগ যাচাই-বাছাই করবে পুলিশ সদর দপ্তর।

পুলিশ সদর দপ্তরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৫ মার্চ এক অফিস আদেশে জালিয়াতির মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া ট্রেইনি রিক্রুট কনস্টেবলদের (টিআরসি) শনাক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট জেলার পুলিশ সুপারকে প্রধান করে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠনের বিষয়টিও এতে জানানো হয়েছে। অতিরিক্ত ডিআইজি (রিক্রুটমেন্ট অ্যান্ড ক্যারিয়ার প্ল্যানিং-১) মো. আবু হাসানের সই করা ওই অফিস আদেশ দেশের সব জেলার পুলিশ সুপারদের পাঠানো হয়েছে।