দক্ষিণ এশিয়ার সামরিক সমীকরণে নতুন উত্তেজনার ইঙ্গিত দিচ্ছে বাংলাদেশ-পাকিস্তান প্রতিরক্ষা সহযোগিতা। পাকিস্তানের কাছ থেকে অত্যাধুনিক জেএফ-১৭ থান্ডার ব্লক-৩ যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে বাংলাদেশ আগেই নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে দাবি উঠেছে আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষণভিত্তিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে। আর এই আলোচনা এখন শুধু সামরিক চুক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতেও নতুন হিসাব-নিকাশ শুরু হয়ে গেছে।
ডিফেন্স সিকিউরিটি এশিয়ার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি মাসেই ঢাকা ও ইসলামাবাদের মধ্যে এ বিষয়ে আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। পাকিস্তান তাদের অন্যতম আধুনিক ও বহুমুখী যুদ্ধবিমান জেএফ-১৭ থান্ডার ব্লক-৩ বাংলাদেশকে সরবরাহে সম্মত হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো, পাকিস্তান বিমানবাহিনী ইতোমধ্যে বাংলাদেশকে এই যুদ্ধবিমানের ফ্লাইট সিমুলেটর সরবরাহ করেছে। সাধারণত যুদ্ধবিমান হস্তান্তরের অনেক আগেই পাইলট ও প্রযুক্তিগত কর্মীদের প্রশিক্ষণের জন্য সিমুলেটর পাঠানো হয়। অর্থাৎ সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল ‘প্রাথমিক আলোচনা’ নয়, বরং সম্ভাব্য চুক্তির বাস্তব প্রস্তুতির বড় ইঙ্গিত।
সিমুলেটর হচ্ছে এমন এক ভার্চুয়াল প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা, যেখানে বাস্তব বিমানের মতো পরিবেশ তৈরি করা হয়। এতে ঝুঁকি ছাড়াই পাইলটরা যুদ্ধ পরিস্থিতি, টার্গেট লক, আকাশযুদ্ধ, ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ এবং জরুরি অবস্থা মোকাবিলার অনুশীলন করতে পারেন। আধুনিক বিমানবাহিনীতে যুদ্ধবিমান পরিচালনার আগে সিমুলেটর প্রশিক্ষণ এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়।
জেএফ-১৭ থান্ডার ব্লক-৩ হচ্ছে চীন ও পাকিস্তানের যৌথভাবে তৈরি ৪.৫ প্রজন্মের মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান। এতে রয়েছে অত্যাধুনিক AESA রাডার, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, উন্নত এভিওনিক্স ও নেটওয়ার্ক-কেন্দ্রিক যুদ্ধ সক্ষমতা। পাকিস্তান গত বছর অপারেশন সিঁদুরে এই বিমান ব্যবহার করেছিল বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। ঢাকায় আয়োজিত একটি ঘরোয়া সামরিক প্রদর্শনীতেও বিমানটির সক্ষমতা তুলে ধরা হয় এবং দেখানো হয় কিভাবে এটি ভারতের রাফালের মতো যুদ্ধবিমানের মোকাবিলা করতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকেই বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সম্পর্ক নতুন মাত্রা পেতে শুরু করে। কূটনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি সবচেয়ে দ্রুত অগ্রগতি হয়েছে সামরিক সহযোগিতায়। দুই দেশের সেনা ও বিমানবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের পারস্পরিক সফর, যৌথ মহড়া এবং প্রতিরক্ষা সংলাপ সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে।
অপারেশন সিঁদুরের পর বাংলাদেশ ও পাকিস্তান বিমানবাহিনীর মধ্যে অফিসার পর্যায়ে ধারাবাহিক আলোচনা শুরু হয়। এরপরই যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে বাংলাদেশের আগ্রহের বিষয়টি সামনে আসে। কারণ এ ধরনের যুদ্ধবিমান সরবরাহ প্রক্রিয়ায় সাধারণত কয়েক বছর সময় লাগে। তাই বিমান হাতে পাওয়ার আগেই বাংলাদেশের পাইলটদের প্রশিক্ষণ শুরু করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে ভারতীয় কৌশলগত মহলেও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ভারতের সামরিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছে, বাংলাদেশ এত দ্রুত পাকিস্তানি যুদ্ধবিমান পরিচালনায় দক্ষ পাইলট তৈরি করতে চাইছে কেন—এই প্রশ্ন এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাদের আশঙ্কা, আঞ্চলিক সামরিক ভারসাম্যে নতুন সমীকরণ তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে ভারতও পাল্টা প্রস্তুতি শুরু করেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। বাংলাদেশ সীমান্তসংলগ্ন কয়েকটি পুরোনো বিমানঘাঁটি ও পরিত্যক্ত এয়ারস্ট্রিপ পুনরায় সক্রিয় করা হচ্ছে। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে যাতে দ্রুত যুদ্ধবিমান মোতায়েন করা যায়, সেই লক্ষ্যেই এসব ঘাঁটি আধুনিকায়ন করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
সামরিক বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, পাকিস্তানের পাঠানো সিমুলেটরকে শুধুমাত্র ‘প্রযুক্তিগত সহায়তা’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি বাংলাদেশ-পাকিস্তান সামরিক সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের বড় সংকেত। এখন প্রশ্ন একটাই—ঢাকা কি কেবল যুদ্ধবিমান কিনছে, নাকি দক্ষিণ এশিয়ার সামরিক সমীকরণেও বড় ধরনের অবস্থান পরিবর্তনের পথে হাঁটছে?
তুরস্ক, সৌদি ও পাকিস্তানসহ অন্যান্য দেশ নিয়ে ইসলামি সেনাবাহিনী গড়ার উদ্যোগ নিয়েছে ইরান। আপনি কি এই আর্মি গঠনের পক্ষে?