রাবি প্রতিনিধি, এম এ আতিকুর রহমান
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে স্মরণসভার আয়োজন করেছে দারসবাড়ি পাঠচক্র। গত ২৯ আগস্ট ‘সমকালীন ভাবনায় নজরুল; প্রেম, দ্রোহ ও সাম্য’ শীর্ষক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।
‘দারসবাড়ি পাঠচক্র’ বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক নিয়মিত বুদ্ধিবৃত্তিক আয়োজন। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিচালিত এ পাঠচক্রে সমাজ, সংস্কৃতি, সভ্যতা, জ্ঞান ও চিন্তাসচেতন শিক্ষার্থীরা নির্ধারিত বিষয় নিয়ে পাঠ, আলোচনা, পর্যালোচনা ও মতবিনিময়ে অংশ নেন।
আলোচনা সভায় নজরুলের সাহিত্যকর্মে প্রেম, দ্রোহ ও সাম্যের বহুমাত্রিক প্রকাশ, মুসলিম সাহিত্য-রেনেসাঁ থেকে সর্বজনীন মানবতা ও মানবমুক্তির দিকে তাঁর উত্তরণ এবং সমকালীন বাস্তবতায় নজরুল-ভাবনার প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে আলোচনা হয়।
সভায় সঞ্চালকের আলোচনায় কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা, গান ও আত্মজাগরণী ভাবের মধ্য দিয়ে একটি জাতির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় নির্মাণে তাঁর ভূমিকার বিষয়টি উঠে আসে। সঞ্চালক বলেন, নজরুলের সাহিত্যকর্মে বাস্তব সত্য ও আকাঙ্ক্ষিত সুন্দরের সমন্বয় ঘটেছে। এ কারণে তিনি কেবল কবি নন, সত্য, সুন্দর ও সাম্যেরও শক্তিশালী কণ্ঠস্বর।
অনুষ্ঠানে এডিসি ক্লাবের নবগঠিত কমিটির সভাপতি আর-রাফি সিরাজী অন্তর বলেন, নজরুলের সাহিত্য ও সংগীতে মুসলিম ও হিন্দু উভয় ঐতিহ্যের নানা অনুষঙ্গ স্বতঃস্ফূর্তভাবে স্থান পেয়েছে। হামদ-নাতের পাশাপাশি শ্যামাসংগীত ও অন্যান্য ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক উপাদানের সমন্বয় তাঁর অসাম্প্রদায়িক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমন্বয়বাদী সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় বহন করে।
সাহিত্য সংসদের সাবেক সভাপতি মাহাইর ইসলাম বলেন, নজরুলকে বিভাজিত ও খণ্ডিত দৃষ্টিভঙ্গিতে না দেখে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সামষ্টিক দৃষ্টিভঙ্গিতে পাঠ করা প্রয়োজন। অন্ধের হস্তিদর্শনের উপমা দিয়ে তিনি নজরুলের বহুমাত্রিক সত্তাকে কোনো একক পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রাখার আহ্বান জানান।
মাহাইর ইসলাম নজরুলকে একজন ‘সাবঅল্টার্ন’ লেখক হিসেবে পাঠ করার ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর মতে, নজরুলের সাহিত্যভাষায় প্রান্তিক ও নিপীড়িত মানুষের উপস্থিতি এবং জীবন-অভিজ্ঞতার প্রতিফলন ঘটেছে। এ ছাড়া নজরুলের জীবন ও সাহিত্যিক অভিযাত্রার বিভিন্ন পর্ব তুলে ধরে বাঙালি মুসলমানের সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় নির্মাণে তাঁর ভূমিকা এবং বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক সারবত্তার সঙ্গে নজরুলের গভীর সম্পর্কের বিষয়টি আলোচনা করেন।
আলোচনায় বক্তারা বলেন, নজরুলকে কেবল বিদ্রোহের কবি হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখলে তাঁর সাহিত্যকর্মের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন সম্ভব নয়। প্রেম, সাম্য, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বহুত্ব এবং আত্মজাগরণের সামগ্রিক পরিপ্রেক্ষিতে তাঁকে পাঠ করা প্রয়োজন। তাঁর সাহিত্যকর্মের বহুমাত্রিকতা অনুধাবনের মধ্য দিয়েই নজরুলের প্রকৃত প্রাসঙ্গিকতা উপলব্ধি করা সম্ভব।
আলোচনা শেষে কাজী নজরুল ইসলামের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে দোয়া করা হয়।