শেকৃবি প্রতিনিধিঃ
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শেকৃবি) ভেটেরিনারি টিচিং হসপিটালে সরকারি নির্ধারিত চিকিৎসা সেবার নামে চলছে ‘অতিরিক্ত চার্জ’ বাণিজ্য। এই অনিয়মের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ক্লিনিকে নিয়োগপ্রাপ্ত ভেটেরিনারি সার্জন ডা. রুপ কুমার।
তার বিরুদ্ধে উঠেছে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, রেজিস্ট্রি খাতায় গড়মিল, অনুমোদনহীন ওষুধ বিক্রি, এবং রোগীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ।
২২ মে নরসিংদী থেকে আসা সুমাইয়া ইসলাম মাইশা তার তিনটি বিড়ালের অপারেশনের জন্য ৫৬০০ টাকা দেন, অথচ রেজিস্ট্রি খাতায় লেখা হয় মাত্র ৩৩০০ টাকা। মাইশা জানান, “অতিরিক্ত ২৩০০ টাকা আদায়ের বিষয়ে প্রশ্ন করলে দুর্ব্যবহার করা হয়। মহিলা হওয়ার কারণে প্রতিবাদ করতে পারিনি।”
২৫ মে ফার্মগেটের বাসিন্দা আকাশ তার বিড়ালের চোখের চিকিৎসার জন্য ৬০০০ টাকা দেন। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নির্ধারিত ফি মাত্র ১০০০ টাকা। রেজিস্ট্রি খাতায় উল্লেখ করা হয় মাত্র ১১০০ টাকা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মিম কামাল জানান, তার বিড়ালকে তিনটি রোগের ভ্যাকসিন দেওয়ার জন্য ১৫০০ টাকা নেওয়া হয়। তিনি বলেন, “পরদিন বিড়ালটি মারা যায়। ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি গুরুত্ব না দিয়ে বিষয়টি এড়িয়ে যান।”
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, ডা. রুপ কুমার বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন ছাড়া বহিরাগত ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির ইনজেকশন,
অ্যান্টিবায়োটিক, নেক কলারসহ চিকিৎসা সামগ্রী ক্লিনিকের ভেতরেই রোগীদের কাছে বিক্রি করছেন। এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “ওষুধ বিক্রি করিনি, শুধু ব্যবস্থা করে দিয়েছি।”
তবে রোগীরা ভিন্ন তথ্য দিচ্ছেন। মাইশা জানান, “আমাদের কোনো ওষুধ দেওয়া হয়নি। শুধু অপারেশনের সময় টাকা নিয়েছে।”
ক্লিনিকের কর্মচারী মোশাররফ হোসেনের সহায়তায় রোগীর বাড়িতে গিয়ে ইনজেকশন দেওয়ার নাম করে অতিরিক্ত ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ডা. রুপ কুমার তাদের ‘স্যার’ ডাকতে বাধ্য করেন এবং অহংকারপূর্ণ আচরণ করেন। চিকিৎসার ফি নিজের ইচ্ছামতো নির্ধারণ করেন বলেও অভিযোগ তাদের।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, ক্যাচট্রেশন ও স্পেয়িংয়ের মতো সার্জারির জন্যও ৪০০০ থেকে ৫০০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নির্ধারিত ফি মাত্র ১০০০ টাকা। অনেক ক্ষেত্রেই এসব অর্থ রেজিস্ট্রারে লিপিবদ্ধ না করে ব্যক্তিগতভাবে নেওয়া হয়।
এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, “প্রতিদিন গড়ে ১০-১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করছেন তিনি। রেজিস্ট্রি খাতায় বহু চিকিৎসার তথ্যই নেই। কোনো অপারেশনে ১২-১৩ হাজার টাকা নেওয়ার প্রমাণও পাওয়া গেছে।”
এইসব অনিয়ম সম্পর্কে জানতে চাইলে ডা. রুপ কুমার বলেন, “অতিরিক্ত টাকা অপারেশনের যন্ত্রপাতি ও ৭ দিনের ওষুধ বাবদ নেওয়া হয়েছে।”
শেকৃবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবদুল লতিফ বলেন, “আমি এই বিষয়ে এখন জানলাম। তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ভবিষ্যতে প্রতিটি চিকিৎসা সেবায় মানি রিসিট বাধ্যতামূলক করা হবে।”
উল্লেখ্য, এক বছর আগেও ডা. রুপ কুমারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তায় বর্তমানে অনিয়ম আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে বলে মনে করছেন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা।