কাওসার আহমেদ.
ব্রিটিশ শাসন থেকে ভাষা আন্দোলন—ইতিহাসের নানা অধ্যায় পেরিয়ে ১২৩ বছর বয়সে থেমে গেল আব্বাস প্রামাণিকের জীবন। নাটোরের গুরুদাসপুরের এই প্রবীণ ব্যক্তি বার্ধক্যেও চশমা ছাড়াই পড়তেন পবিত্র কোরআন। শিক্ষকতার পাশাপাশি দীর্ঘদিন এলাকার শিশুদের বিনা মূল্যে কোরআন শেখাতেন তিনি।
সোমবার (১২ অক্টোবর) সন্ধ্যা সাতটার দিকে উপজেলার যোগেন্দ্রনগর গ্রামের নিজ বাড়িতে তাঁর মৃত্যু হয়। মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সকাল ১০টায় দুর্গাপুর প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে জানাজা শেষে স্থানীয় কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। জানাজায় গুরুদাসপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আব্দুল হান্নানসহ স্থানীয় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।
আব্বাস প্রামাণিকের ভোটার পরিচয়পত্র অনুযায়ী, তাঁর জন্মসাল ১৯০৩। দীর্ঘ জীবনে তিনি ব্রিটিশ শাসন, পাকিস্তান আমল ও ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময়কাল দেখেছেন। কর্মজীবনে খুকনীপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। তাঁর মাসিক বেতন ছিল মাত্র ৬০ টাকা। বিদ্যালয়ের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি এলাকার ছেলেমেয়েদের বিনা মূল্যে পবিত্র কোরআন শিক্ষা দিতেন।
বয়সের ভার শরীরে ছাপ ফেললেও কোরআন পড়ার অভ্যাস ছাড়েননি আব্বাস প্রামাণিক। ১২৩ বছর বয়সেও চশমা ছাড়াই কোরআন পড়তে পারতেন তিনি। হাতে পরতেন ক্যাসিও ঘড়ি। নিজের কাজ নিজে করার চেষ্টা করতেন; চলাফেরার ক্ষেত্রেও যথাসম্ভব হাঁটাকেই বেছে নিতেন।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবসের অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে নতুন করে আলোচনায় আসেন আব্বাস প্রামাণিক। বয়সের ভারে ন্যুব্জ শরীর নিয়ে অনুষ্ঠানে তাঁর উপস্থিতি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে তাঁকে নিয়ে আলোচনা হয়। তবে অল্প সময়ের ব্যবধানে তাঁর মৃত্যুর খবরে এলাকায় শোকের আবহ তৈরি হয়েছে।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, আব্বাস প্রামাণিকের স্ত্রী অনেক আগেই মারা গেছেন। দুই মেয়ে ও ছয় ছেলে রেখে গেছেন তিনি। নাতি-নাতনিরাও নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী তাঁর দেখাশোনা করতেন। একসময় সচ্ছলতা থাকলেও জীবনের শেষ সময়ে সাধারণ পরিবেশে বসবাস করেছেন তিনি।
বাবাকে হারানোর স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে মেয়ে আলিমা বেগম বলেন, ‘পাঁচ বছর বয়সে মা মারা যান, তখন থেকেই বাবার কাছে বড় হয়েছি। সুযোগ পেলেই পছন্দের খাবার নিয়ে বাবাকে দেখতে যেতাম। তিনি তাঁর সন্তান ও নাতিদের সঙ্গেই সময় কাটাতেন।’
আব্বাস প্রামাণিকের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন গুরুদাসপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাহমিদা আফরোজ। তিনি বলেন, ‘এ অঞ্চলের প্রবীণতম ব্যক্তিদের একজন ছিলেন আব্বাস প্রামাণিক। উপজেলা প্রশাসন সব সময় তাঁর পাশে ছিল। আব্বাস প্রামাণিকের মৃত্যুতে আমরা গভীরভাবে শোকাহত এবং তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি।’