যেখানে প্রতিটি শিশুর দিন শুরু হয় স্কুল, মাদ্রাসা কিংবা মক্তবে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে, সেখানে রহমতউল্লাহ ও আবদুল্লাহ নামে দুই শিশুর সকাল শুরু হতো হাট-বাজারে ঝালমুড়ি ও পান বিক্রির প্রস্তুতি দিয়ে।
বয়সে পরিপক্ক হওয়ার আগেই জীবিকার কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল তাদের। তবে তাদের জীবনে এখন দেখা দিয়েছে আশার আলো। গলাচিপা উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে স্কুলে ভর্তি হয়েছে এই দুই শিশু।
জানা গেছে, পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার উত্তর চরবিশ্বাস ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা রহমতউল্লাহ ও আবদুল্লাহ। তাদের বাবা অলিউল মাতুব্বর দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজ। স্বজনরা অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তার সন্ধান পাননি।
স্বামীর কোনো খোঁজ না পেয়ে অসহায় হয়ে পড়েন তাদের মা শিরিনা বেগম। একপর্যায়ে তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করে অন্যত্র সংসার শুরু করেন। এরপর অবুঝ দুই সন্তানকে রেখে যান বৃদ্ধ দাদা মনির মাতুব্বরের কাছে।
অভাবের সংসারে দুই নাতির ভরণপোষণের দায়িত্বও পড়ে বৃদ্ধ দাদা ওপর। সংসারে নিত্যদিনের অভাব-অনটনের কারণে বাধ্য হয়ে দুই শিশুকে ঝালমুড়ি ও পান বিক্রির কাজে লাগিয়ে দেন তাদের দাদা। ফলে যে বয়সে তাদের হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, সেই বয়সেই জীবিকার তাগিদে হাতে তুলে নিতে হয় ঝালমুড়ি ও পান। বিভিন্ন হাট-বাজার, খেলার মাঠ, নৌযানসহ জনবহুল স্থানে ঘুরে ঘুরে এসব বিক্রি করত দুই ভাই।
সম্প্রতি দুই ভাইয়ের জীবন সংগ্রামের কথা জানতে পারেন গলাচিপা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবুজর মো. ইজাজুল হক। বিষয়টি জানার পর তিনি রহমতউল্লাহ ও আবদুল্লাহকে নিজের কার্যালয়ে ডেকে নেন। সেখানে তাদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের জীবনসংগ্রাম ও পড়াশোনার ইচ্ছার কথা শোনেন।
এরপর দুই শিশুকে বিদ্যালয়ে ভর্তি করানোর উদ্যোগ নেন ইউএনও। তাঁর নির্দেশনায় উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার মাধ্যমে রহমতউল্লাহ ও আবদুল্লাহকে মধ্য চরবিশ্বাস সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয়। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের জন্য স্কুল ড্রেসেরও ব্যবস্থা করা হয়েছে।
মধ্য চরবিশ্বাস সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুল হালিম বলেন, “বুধবার (১৯ আগস্ট) রহমতউল্লাহ ও আব্দুল্লাহকে স্কুলে ভর্তি করেছি। বৃহস্পতিবার তাদের প্রথম ক্লাস ছিল। পড়াশোনার প্রতি তাদের আগ্রহ রয়েছে। তাদের নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়া হবে।”
গলাচিপা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবুজর মো. ইজাজুল হক বলেন, “রহমতউল্লাহ ও আব্দুল্লাহর কথা জানতে পেরে তাদের অফিসে নিয়ে আসি। পরে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার মাধ্যমে চরবিশ্বাস সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করানো হয়েছে। ওদের স্কুলে পড়ার স্বপ্ন পূরণ করতে পেরে ভালো লাগছে।”
এ বিষয়ে গলাচিপা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবুজর মোঃ ইজাজুল হক বলেন, ‘রহমাতউল্লাহ্ ও আব্দুল্লাহ্’র করুণ পরিস্থিতির কথা জানতে পেরে ওদের আমার অফিসে নিয়ে আসি। পরবর্তীতে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার মাধ্যমে ওদের চরবিশ্বাস সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করানো হয়েছে।
ওদের স্কুলে পড়ার স্বপ্ন পূরণ করতে পেরে খুব ভালো লাগছে। ওদের সার্বিক পরিস্থিতির বিষয়ে গলাচিপা উপজেলা প্রশাসন খেয়াল রাখবে।’
দুই শিশুর জীবনে এই উদ্যোগ যেন নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করেছে। ঝালমুড়ি ও পান বিক্রির বদলে এখন তাদের হাতে উঠেছে বই-খাতা। জীবিকার কঠিন পথ পেরিয়ে শিক্ষার আলোয় এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে তাদের সামনে।