সখীপুর (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি:
একসময় গ্রামবাংলার ঐতিহ্যের অন্যতম প্রতীক ছিল মাটির ঘর। গ্রীষ্মে শীতল, শীতে উষ্ণ এবং প্রাকৃতিক পরিবেশবান্ধব এসব ঘর ছিল গ্রামীণ মানুষের নিরাপদ আশ্রয়। সময়ের পরিবর্তনে টিন ও পাকা ভবনের বিস্তারে সেই মাটির ঘর এখন হারিয়ে যেতে বসেছে। তবে ঝুঁকি ও অস্বস্তির কারণে অনেকে এসব ঘরে আর না থাকলেও বাবা-দাদার স্মৃতি হিসেবে এখনো ভেঙে ফেলতে পারেননি।
মাটির ঘরে বসবাস করেই জীবনের সিংহভাগ সময় পার করেছেন আনোয়ারা খাতুন। এখনো তিনি স্বামীর রেখে যাওয়া মাটির ঘরেই বসবাস করছেন। সাজানো-গোছানো সংসারের সবকিছুর মধ্যে মাটির ঘরটিই যেন তাঁর কাছে সবচেয়ে আপন।
আনোয়ারা খাতুন (৭৫) জানান, সুদীর্ঘ ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি এই মাটির ঘরেই বসবাস করছেন। তিনি সখীপুর উপজেলার পাথারপুর গ্রামের মৃত আমির উদ্দিনের স্ত্রী। প্রায় ২০ বছর আগে স্বামী মারা গেলেও এই মাটির ঘরই এখন তাঁর সুখ-দুঃখ আর স্মৃতির আশ্রয়।
মানুষের জীবনের সঙ্গে অতীতের স্মৃতি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে। একসময় গ্রামবাংলার অধিকাংশ মানুষই মাটির ঘরে বসবাস করতেন। পূর্বপুরুষদের উত্তরাধিকার হিসেবে এসব ঘর ছিল গ্রামীণ সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।
কিন্তু আধুনিকতার ছোঁয়া, জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং নিরাপত্তাজনিত কারণে সখীপুরের বিভিন্ন গ্রাম থেকে দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে মাটির ঘর।
সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, মাটির ঘরে বসবাসকারী পরিবারের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। অনেকেই পূর্বপুরুষের স্মৃতি হিসেবে পুরোনো মাটির ঘর রেখে দিলেও বসবাসের জন্য নির্মাণ করছেন টিন বা পাকা ঘর।
বর্তমানে মাটির ঘরে বসবাসকে অনেকেই ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছেন। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় এসব ঘরে সাপ, ইঁদুর ও বিভিন্ন ধরনের পোকামাকড় বাসা বাঁধে। এছাড়া টানা বা ভারী বৃষ্টিতে দেয়ালের মাটির বড় বড় খণ্ড খসে পড়ে, যা যেকোনো সময় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।
এসব ঝুঁকির কারণে অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে টিনের বা পাকা ঘরে চলে গেলেও পূর্বপুরুষের স্মৃতি হিসেবে পুরোনো মাটির ঘর ভেঙে ফেলছেন না।
উপজেলার আড়াইপাড়া গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল মান্নান বলেন, আমি আমার বাবার কাছ থেকে পাওয়া কোঠা ঘরেই থাকতাম। কিন্তু এক রাতে ভারী বৃষ্টির সময় ঘরের দেয়ালের একটি বড় মাটির খণ্ড ভেঙে একেবারে আমার পাশেই এসে পড়ে।
এরপর আর ঝুঁকি নিইনি। ঘরের অন্য পাশে থাকতাম। দ্রুত একটি টিনের ঘর নির্মাণ করে সেখানে বসবাস শুরু করি। তবে বাবা-মায়ের স্মৃতি হিসেবে পুরোনো কোঠা ঘরটি এখনো রেখে দিয়েছি। কিন্তু মাটির খন্ড ভেঙে এখন নাই বললেই চলে।
একই উপজেলার ছিলিমপুর গ্রামের শাহজাহান মিয়া (৭০) বলেন, আমাদেরও একটি কোঠা ঘর ছিল। আমার জীবনের বড় একটি সময় সেই ঘরেই কেটেছে। কোঠা ঘর গরমের সময় খুবই ঠান্ডা থাকত, কোনো আধুনিক ফ্যানের প্রয়োজন হতো না।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঘরে বড় বড় সাপ বের হতে শুরু করে। পরিবারের নিরাপত্তার কথা ভেবে শেষ পর্যন্ত ঘরটি ভেঙে ফেলেছি। এখন শুধু সেই কোঠা ঘরের স্মৃতিই রয়ে গেছে।
একসময় গ্রামের প্রায় সর্বত্রই মাটির ঘর চোখে পড়ত। এসব ঘর ছিল মজবুত, টেকসই ও বসবাসের উপযোগী। মাটি, তুষ ও চুনের মিশ্রণে কাঠের খুঁটির ওপর স্তরে স্তরে লেপে তৈরি করা হতো এসব ঘর। কোথাও কোথাও কাঠের সিঁড়িযুক্ত দুইতলা মাটির ঘরও ছিল, যা স্থানীয়ভাবে ‘কোঠা ঘর’ নামে পরিচিত ছিল।
বিদ্যুৎ না থাকলেও এসব ঘর প্রাকৃতিকভাবেই শীতল থাকত। কিন্তু আধুনিক নির্মাণসামগ্রীর সহজলভ্যতা, জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এখন সেই দৃশ্য খুব কমই চোখে পড়ে।
সখীপুর সরকারি কলেজের ভূগোল বিভাগের প্রভাষক মোছা. নাছিমা আক্তার বলেন, মাটির ঘর আমাদের গ্রামীণ ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একসময় টিন ও দালানকোঠার প্রচলন না থাকায় মানুষ মাটির ঘরেই বসবাস করত।
আধুনিকতার কারণে মাটির ঘরের সংখ্যা কমে গেলেও এখনো গ্রামাঞ্চলের কিছু এলাকায় এ ধরনের ঘর দেখা যায়। এসব ঘরের সঙ্গে মানুষের সুখ-দুঃখ, ঐতিহ্য ও আবেগের অসংখ্য স্মৃতি জড়িত।
গ্রামবাংলার ঐতিহ্যের এই অনন্য নিদর্শন সংরক্ষণে সচেতনতা এবং প্রয়োজনীয় উদ্যোগ না নিলে আগামী প্রজন্ম হয়তো বইয়ের পাতায় কিংবা পুরোনো ছবিতেই মাটির ঘর খুঁজে পাবে। আজও সখীপুরের কয়েকটি গ্রামে টিকে থাকা এসব কোঠা ঘর তাই কেবল একটি বসতঘর নয়, বরং বাংলার গ্রামীণ ইতিহাস, সংস্কৃতি ও পারিবারিক স্মৃতির জীবন্ত সাক্ষী।