মুন্সিগঞ্জ প্রতিনিধি
মুন্সিগঞ্জের টঙ্গীবাড়ী উপজেলার দিঘীরপাড় ইউনিয়নের দক্ষিণাঞ্চল এবং এর সঙ্গে সংযুক্ত বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়নের বৈষম্যের শিকার বলে দাবি করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের অভিযোগ,পঁচিশ বছর পর থেকে এই অঞ্চলের মানুষের অন্যতম প্রধান দাবি—দিঘীরপাড়ে একটি সেতু নির্মাণ, চরাঞ্চল রক্ষায় স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ এবং গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো পাকাকরণ।
কিন্তু বছরের পর বছর কেটে গেলেও এসব দাবি বাস্তবায়ন না হওয়ায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
দিঘীরপাড়ের দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে সংযুক্ত রয়েছে মুন্সিগঞ্জের চরবাংলাবাজার এবং শরীয়তপুর জেলার শিলই, নওপাড়া, চরআত্রা, কাঁচিকাটা, কুন্ডেরচর, কোরবি, মনিরাবাজ, চাঁদপুর জেলার চরাঞ্চলের একাংশ এবং কুমিল্লা জেলার চরাঞ্চলের একাংশ।
স্থানীয়দের মতে, এসব এলাকা মিলিয়ে প্রায় ১০টি ইউনিয়নের লক্ষাধিক মানুষ সরাসরি এই যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। একটি সেতু, স্থায়ী বেড়িবাঁধ ও পাকা রাস্তা নির্মাণ হলে শুধু যাতায়াতের কষ্টই কমবে না, বরং শিক্ষা, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।
৭ জুন ২০২৬ মুন্সিগঞ্জের জেলা প্রশাসক দিঘীরপাড় ইউনিয়নের কান্দারবাড়ি নদীভাঙন এলাকা পরিদর্শন করেন। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সঙ্গে কথা বলেন এবং নদীভাঙনের বাস্তব চিত্র সরেজমিনে দেখেন।
১১ জুন ২০২৬ উন্নয়নের বৈষম্যের অবসান এবং চার দফা দাবির বাস্তবায়নের লক্ষ্যে চরাঞ্চলের সর্বস্তরের মানুষ বিশাল মানববন্ধনের আয়োজন করেন। মানববন্ধনে নারী, পুরুষ, শিক্ষার্থী, কৃষক, জেলে, ব্যবসায়ী, যুব সমাজ ও আলেম সমাজসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। বক্তারা বলেন, উন্নয়নের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে চরাঞ্চলের মানুষ মৌলিক নাগরিক সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন।
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া এক অভিভাবক বলেন, “সেতু ও পাকা রাস্তার অভাবে আমাদের সন্তানদের ভালো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠানো খুবই কঠিন। অনেক শিক্ষার্থী যাতায়াতের কষ্টে পড়াশোনা ছেড়ে দেয়। উন্নয়নের অভাবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মও পিছিয়ে পড়ছে।”
কৃষক আব্বাস খালাসী বলেন, “আমাদের উৎপাদিত ফসল বাজারে নিতে নদী পার হতে হয়। এতে অতিরিক্ত খরচ হয়, সময় নষ্ট হয়, অনেক সময় পণ্য নষ্টও হয়ে যায়। একটি সেতু ও পাকা রাস্তা হলে কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পাবেন এবং এলাকার অর্থনীতি শক্তিশালী হবে।”
যুব সমাজের একজন প্রতিনিধি আক্তার গাজী বলেন, “প্রতিবছর নদীভাঙনে মানুষ ঘরবাড়ি, ফসলি জমি ও সহায়-সম্পদ হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে। স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ হলে ভাঙন রোধ হবে। আমরা আর শুধু আশ্বাস চাই না, দ্রুত বাস্তবায়ন চাই।”
২১ জুন ২০২৬ যুব সমাজ ও আলেম সমাজের নেতৃত্বে মুন্সিগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে স্মারকলিপি ও গণস্বাক্ষর জমা দেওয়া হয়। এতে সেতু নির্মাণ, স্থায়ী বেড়িবাঁধ এবং পাকা রাস্তা নির্মাণের দাবি তুলে ধরা হয়। জেলা প্রশাসক স্মারকলিপি গ্রহণ করে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে বলে আশ্বাস দেন।
৪ জুলাই ২০২৬ মুন্সিগঞ্জ-২ (টঙ্গীবাড়ী-লৌহজং) আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল সালাম আজাদ এমপি দিঘীরপাড় ইউনিয়নের কান্দারবাড়ি নদীভাঙন এলাকা পরিদর্শন করেন। এ সময় যুব সমাজ ও আলেম সমাজ তাঁর হাতে স্মারকলিপি ও গণস্বাক্ষর তুলে দেন। তিনি এলাকাবাসীর দাবিগুলো শুনে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরে বিষয়টি উপস্থাপন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন।
এছাড়া সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য মমতাজ আলো এমপি -ও নদীভাঙন এলাকা পরিদর্শন করে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের খোঁজখবর নেন।
স্থানীয়দের দাবি, এই অঞ্চলে পাকা রাস্তা ও সেতুর অভাবে শিক্ষার হার আশঙ্কাজনকভাবে কম। শিক্ষার্থীদের অনেক দূর নৌপথে যাতায়াত করতে হওয়ায় অনেকেই নিয়মিত বিদ্যালয়ে যেতে পারে না। অসুস্থ রোগীদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে।
কৃষিপণ্য বাজারজাত করতে অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয় ও সময়ের কারণে কৃষকরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। প্রতিবছর নদীভাঙনে ঘরবাড়ি ও আবাদি জমি হারিয়ে বহু পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়ছে। ফলে উন্নয়নের অভাবে এই চরাঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, দীর্ঘদিনের এই ন্যায্য দাবিগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের মাধ্যমে দিঘীরপাড় ও আশপাশের চরাঞ্চলকে উন্নয়নের মূলধারায় যুক্ত করা হবে। এখন তাদের একটাই প্রশ্ন—বারবার আশ্বাস নয়, কবে বাস্তবে নির্মিত হবে দিঘীরপাড়ের সেতু, স্থায়ী বেড়িবাঁধ ও পাকা সড়ক? লক্ষাধিক মানুষ এখন সেই উত্তর ও বাস্তব পদক্ষেপের অপেক্ষায়।