দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও চাঁদাবাজির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে বলে মন্তব্য করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, একদিকে ভোক্তাদের চড়া দামে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে হচ্ছে, অন্যদিকে কৃষকেরা তাঁদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। এর সঙ্গে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির বোঝা যুক্ত হয়ে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে তুলছে।
রোববার (২৫ অক্টোবর) জাতীয় প্রেসক্লাবের কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত ‘জুলাই সনদ স্বাক্ষরের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে আলোচনা সভায়’ প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জনগণকে বিভিন্ন ধরনের কার্ড দেওয়ার উদ্যোগের কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু শুধু কার্ড বিতরণ করলেই মানুষের সমস্যার সমাধান হবে না। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি বন্ধ এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় স্বস্তি ফেরাতে কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রসঙ্গ টেনে জামায়াত আমির বলেন, দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসানের পর দেশের মানুষের মধ্যে একটি বৈষম্যহীন ও ন্যায়বিচারভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রত্যাশা সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু সেই প্রত্যাশা এখনো বাস্তবে রূপ নেয়নি। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় ঘাটতি রয়ে গেছে, বরং বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈষম্য আরও বেড়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
তিনি বলেন, যে পরিবর্তনের স্বপ্ন নিয়ে তরুণেরা জীবন দিয়েছেন, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। জনগণের অধিকার, ন্যায়বিচার ও বৈষম্য দূর করার অঙ্গীকার কেবল বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না।
জুলাই সনদ ও সংবিধান সংস্কার প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সাত মাসেরও বেশি সময় ধরে রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের আলোচনার মাধ্যমে অধিকাংশ বিষয়ে ঐকমত্য তৈরি হয়েছিল। কিছু বিষয়ে মতপার্থক্য থাকলেও সংস্কার বাস্তবায়নের সুযোগ ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে নির্বাচন ও সংস্কারের ধারাবাহিকতা নিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হয়।
তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান ছিল, আগে প্রয়োজনীয় রাষ্ট্রীয় সংস্কার সম্পন্ন করতে হবে, তারপর জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন করতে হবে। কিন্তু একই দিনে দুটি নির্বাচন বা কার্যক্রম আয়োজনের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সংস্কার ও নির্বাচনের বিষয়গুলো একসঙ্গে মিশিয়ে ফেলা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন জামায়াত আমির। তাঁর মতে, প্রয়োজনীয় সংস্কারের বিষয়গুলো এড়িয়ে গিয়ে শুধু সংবিধান সংশোধনের কথা বললে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না। এ বিষয়ে কোনো সমঝোতার প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট কমিটির সঙ্গে বিরোধী দলের আলোচনায় বসার আহ্বান জানান তিনি।
অতীতে সংবিধান সংশোধনের পর আদালতের মাধ্যমে তা বাতিল হওয়ার নজির তুলে ধরে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সংস্কারের উদ্যোগ এমনভাবে গ্রহণ করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে তা আইনি জটিলতায় পড়ে ব্যর্থ না হয়।
সরকারের সমালোচনা করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিজেদের ব্যর্থতা আড়াল করতে বিরোধী দলের বিরুদ্ধে নতুন বয়ান তৈরির চেষ্টা চলছে। জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সরকারের ঘাটতি থাকলে তার দায় বিরোধীদের ওপর চাপানো উচিত নয়। বরং ভুল স্বীকার করে সমস্যা সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়াই সরকারের দায়িত্ব।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, বিএনপি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের স্থান দিচ্ছে। একই সঙ্গে সীমান্ত দিয়ে অস্ত্র ও মাদক প্রবেশ এবং বাইরে থেকে অর্থ এনে অস্থিরতা সৃষ্টির অভিযোগের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, এসব কর্মকাণ্ড প্রতিরোধের দায়িত্ব সরকারের। দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনকে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।
কৃষিপণ্যের দামের বৈষম্য তুলে ধরে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, পঞ্চগড়ে চারটি লাউ এক টাকায় বিক্রির খবর পাওয়া যাচ্ছে। অথচ রাজধানীর বাজারে একই পণ্য কিনতে ভোক্তাদের অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। কৃষক উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না, আবার সাধারণ মানুষও কম দামে পণ্য কিনতে পারছেন না।
কৃষক ও ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যের দামের এই বড় ব্যবধানের কারণ অনুসন্ধান এবং বাজারে চাঁদাবাজি বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
জামায়াত আমির বলেন, দেশের মানুষের জীবনযাত্রায় স্বস্তি ফেরানো, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং জুলাইয়ের গণআকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সরকারকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি।