নাটোরের গুরুদাসপুরে সরকারি অর্থায়নে নির্মিত একটি ভবন ব্যবহারের চার বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই ভেঙে ফেলা হয়েছে। ধানুরা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ওই ভবন নির্মাণে ব্যয় হয়েছিল ২২ লাখ ৩৪ হাজার ৫৫২ টাকা।
ভবনটি ভেঙে পাওয়া মালামাল প্রায় এক লাখ টাকায় বিক্রি করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যালয়টির সাবেক ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি।
তবে ভবন ভাঙা ও মালামাল বিক্রির প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিদ্যালয়ের বর্তমান সভাপতি দাবি করেছেন, এ বিষয়ে তিনি কিছুই জানতেন না। এমনকি বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির সঙ্গে আলোচনা না করেই প্রধান শিক্ষক আলমগীর হোসেন কাজটি করেছেন বলে অভিযোগ তাঁর।
অন্যদিকে উপজেলা পরিচালন ও উন্নয়ন প্রকল্প (ইউজিডিপি) এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভবনটি ভেঙে ফেলার বিষয়ে তাঁদের জানানো হয়নি।
গতকাল শনিবার সরেজমিনে ধানুরা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, পুরোনো ভবনটির জায়গায় নতুন ভবন নির্মাণের প্রস্তুতি চলছে। বিদ্যালয়ের মাঠের এক পাশে নির্মাণসামগ্রী রাখা হয়েছে। সেখানে আগে ইউজিডিপির অর্থায়নে নির্মিত ভবনটি ছিল। এখন ভবনটির কোনো অংশই নেই।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০২০-২১ অর্থবছরে বিদ্যালয়টিতে একটি একতলা বিজ্ঞান ভবন ও দুটি টিনশেড ঘর নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হয়। ইউজিডিপির অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করে এলজিইডি। ২২ লাখ ৩৪ হাজার ৫৫২ টাকা ব্যয়ে নির্মিত ভবনটির কাজ শেষ হয় ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে। ওই মাসের ১৫ তারিখে ভবনটির উদ্বোধন করেন তৎকালীন উপজেলা চেয়ারম্যান মো. আনোয়ার হোসেন।
বিদ্যালয়ের শিক্ষক, স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চলতি বছরের জুনে ভবনটি ভেঙে ফেলা হয়। অথচ তখনো নতুন চারতলা ভবন নির্মাণের অনুমোদন পাওয়া যায়নি। পরে ভবনের জায়গা খালি দেখিয়ে নতুন ভবনের জন্য আবেদন করা হয়।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, পুরোনো ভবন ভাঙার বিষয়ে কোনো দরপত্রের কথা তাঁরা জানেন না। তবে মালামাল বিক্রির সময় মাইকিং করা হয়েছিল বলে তাঁরা শুনেছেন। তাঁদের প্রশ্ন, সরকারি অর্থে নির্মিত ভবন ভাঙার ক্ষেত্রে কোনো কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল কি না এবং মালামালের দাম কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির সাবেক সভাপতি মোতালেব বলেন, ‘বিদ্যালয়ের উন্নয়নের জন্য একটি সংস্থা থেকে বরাদ্দ নিয়ে ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছিল। পরে আবার বিদ্যালয়ের উন্নয়নের জন্য ভবনটি ভেঙে নতুন ভবন নির্মাণের অনুমোদন নেওয়া হয়েছে। পুরোনো ভবনের মালামাল এক লাখ টাকায় বিক্রি করা হয়েছে।’
তবে বর্তমান সভাপতি মো. রনি ইসলাম বলেন, ‘পুরোনো ভবন ভাঙার বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। প্রধান শিক্ষকের কাছে বিদ্যালয়ের হিসাব-নিকাশ ও দায়িত্ব বুঝিয়ে দিতে বলেছি, কিন্তু এখনো তিনি তা বুঝিয়ে দেননি। ভবন ভাঙা বা মালামাল বিক্রির জন্য কোনো দরপত্র করা হয়েছিল কি না, সেটিও আমার জানা নেই। ব্যবস্থাপনা কমিটির সঙ্গে আলোচনা না করেই প্রধান শিক্ষক এসব করেছেন।’
অভিযোগের বিষয়ে প্রধান শিক্ষক আলমগীর হোসেন বলেন, চারতলা নতুন ভবনের অনুমোদন পাওয়ার জন্যই পুরোনো ভবনটি ভেঙে ফেলা হয়েছে। তাঁর দাবি, নিয়ম মেনে মাইকিং করে ভবন ভাঙা ও মালামাল বিক্রি করা হয়েছে। তবে মালামাল বিক্রি করে পাওয়া এক লাখ টাকা কীভাবে হিসাবভুক্ত করা হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
এদিকে নতুন ভবন নির্মাণের প্রক্রিয়ায়ও সময়ের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের আবেদনের পর চলতি মাসের ২৩ তারিখে চারতলা ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হয়। ভবনটির জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১ কোটি ৩৭ লাখ টাকা।
গত বুধবার (২৬ আগস্ট) নাটোর-৪ (গুরুদাসপুর-বড়াইগ্রাম) আসনের সংসদ সদস্য মো. আব্দুল সরকারি দপ্তর জানে না ভবনটি ভাঙার বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস, এলজিইডি এবং উপজেলা শিক্ষা প্রকৌশল দপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাঁদের কাউকেই এ বিষয়ে অবহিত করা হয়নি।
উপজেলা পরিচালন ও উন্নয়ন প্রকল্পের (ইউজিডিপি) কর্মকর্তা প্রদীপ কুমার বলেন, ‘২০২৩ সালে ধানুরা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ২২ লাখ ৩৪ হাজার ৫৫২ টাকা ব্যয়ে ভবন নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে ওই ভবন ভেঙে ফেলার বিষয়ে আমাদের কিছুই জানানো হয়নি। সাংবাদিকদের মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পেরেছি। সরেজমিনে গিয়ে বিষয়টি দেখে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন দেওয়া হবে।’
সরকারি অর্থে নির্মিত ভবনটি নির্মাণের কয়েক বছরের মধ্যেই কেন ভেঙে ফেলা হলো, ভবনটি ভাঙার আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল কি না এবং ভেঙে পাওয়া মালামাল এক লাখ টাকায় বিক্রির মূল্য নির্ধারণের ভিত্তি কী—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। এসব বিষয়ে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।আজিজ নতুন ভবনের প্রথম তলার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।