শেকৃবি প্রতিনিধি
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শেকৃবি) তদন্ত কমিটির নেতিবাচক অভিমত ও বিদ্যমান একাডেমিক বিধিমালার প্রশ্ন উপেক্ষা করে ছাত্রত্ব হারানো দুই ছাত্রদল নেতার পুনর্বহালের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের করা মামলার আসামি এই দুই নেতাকে ছাত্রত্ব ফিরিয়ে দেওয়ায় ছাত্রদলের একাংশের মধ্যেও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দাবি, মানবিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় একাডেমিক কাউন্সিল এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তথ্যপ্রমাণ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক সূত্রে জানা গেছে, পুনর্বহাল হওয়া দুই শিক্ষার্থী হলেন ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের মো. ফরহাদ হোসেন (রেজিস্ট্রেশন: ১৮-০৮৩৩৬) এবং ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের আব্দুল্লাহ আল মারুফ (রেজিস্ট্রেশন: ১৯-০৯৮৬৭)। ফরহাদ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক। মারুফ ছাত্রদলের সক্রিয় কর্মী এবং আসন্ন কমিটিকে ঘিরে নেতৃত্বে তার নামও আলোচনায় রয়েছে।
জানা গেছে, ২০২৫ সালের ১৯ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত ৮৩তম একাডেমিক কাউন্সিলের সিদ্ধান্তে দুই শিক্ষার্থীর ছাত্রত্ব পুনর্বহালের আবেদন যাচাইয়ের জন্য তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। পরে কমিটির প্রতিবেদন ও সুপারিশ এ বছরের ২৮ জুলাই অনুষ্ঠিত ৮৬তম একাডেমিক কাউন্সিলের সভায় উপস্থাপন করা হয়।
ফরহাদের ক্ষেত্রে তদন্ত কমিটি তার উত্তরপত্র পুনঃনিরীক্ষা করে মূল্যায়নে কোনো অসঙ্গতি পায়নি। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী ৭৯তম একাডেমিক কাউন্সিলের ছাত্রত্ব বাতিলের সিদ্ধান্তই যথাযথ ছিল। কমিটির ভাষ্য, অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী তার ছাত্রত্ব ফিরিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। তদন্ত কমিটির নেতিবাচক সুপারিশের পরও একাডেমিক কাউন্সিল তার ছাত্রত্ব পুনর্বহালের সিদ্ধান্ত দেয়।
মারুফের ক্ষেত্রে তদন্ত কমিটি উল্লেখ করে, সংশ্লিষ্ট অনুষদের অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী সাধারণ নিয়মে তারও ছাত্রত্ব ফিরে পাওয়ার সুযোগ নেই। তবে পিতৃহারা হওয়া, রাজনৈতিক নিপীড়নের অভিযোগ, পড়াশোনা শেষ করার প্রবল আগ্রহ এবং দীর্ঘদিন অপেক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সম্পূর্ণ ‘মানবিক কারণে’ তাকে অনধিক পাঁচ বছর বা ১০ সেমিস্টারের জন্য লেভেল-১, সেমিস্টার-১-এ পুনঃভর্তির বিশেষ সুযোগ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়। একই সঙ্গে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, এ সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে অন্য কোনো ক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক সূত্র জানায়, ওই দুই ছাত্রনেতার ছাত্রত্ব পুনর্বহাল সংক্রান্ত একাডেমিক কাউন্সিলের সভার আগে প্রশাসন বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক ছাত্রনেতার মতামত নেয়। সিদ্ধান্ত যাই হোক, তা নিয়ে শান্ত থাকার অনুরোধও সংশ্লিষ্ট ছাত্রনেতাদের জানানো হয়েছিল বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। তবে ছাত্রদলের একাংশ নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তারা মনে করছেন, অভিযুক্তদের রাজনীতি ছাত্রদলের ভাবমূর্তি নষ্ট করবে এবং তাদের অনিয়ন্ত্রিত কর্মকাণ্ড ক্যাম্পাসে উচ্ছৃঙ্খল পরিবেশ তৈরি করতে পারে।
তথ্য অনুযায়ী, ফরহাদ প্রথম বর্ষ প্রথম সেমিস্টার-২০১৮-এ ৭০ শতাংশের বেশি উপস্থিতি নিয়ে চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেও অকৃতকার্য হন। ২০১৯ সালে পুনঃভর্তি হয়ে এজিইসি-১০৯ ও এজিসিএইচ-১০৭ কোর্সে পুনঃপরীক্ষার সুযোগ পান। এজিসিএইচ-১০৭-এ কৃতকার্য হলেও এজিইসি-১০৯-এ পুনরায় অকৃতকার্য হন। সর্বশেষ সুযোগ হিসেবে ২০২০ সালে পুনঃভর্তি হয়ে এজিইসি-১০৯ কোর্সের পুনঃপরীক্ষাতেও অকৃতকার্য হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী তার ছাত্রত্ব বাতিল হয়।
পরে একই বিষয়ে বারবার অকৃতকার্য হওয়াকে ‘পরিকল্পিত বৈষম্য’ দাবি করে তিনি ছাত্রত্ব পুনর্বহালের আবেদন করেন। আবেদনের পর তদন্ত কমিটি তার উত্তরপত্র পুনঃনিরীক্ষা করে মূল্যায়নে কোনো অসঙ্গতি না পাওয়ার কথা জানায়। একই সঙ্গে অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী পূর্ববর্তী একাডেমিক কাউন্সিলের ছাত্রত্ব বাতিলের সিদ্ধান্তই যথাযথ বলে মত দেয়।
অন্যদিকে, মারুফ প্রথম বর্ষ প্রথম সেমিস্টার-২০১৯-এ মাত্র ৪৪ দশমিক ৪৪ শতাংশ উপস্থিতি থাকায় চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ পাননি। পরের বছর পুনঃভর্তি হয়ে ৭৬ দশমিক ৩৯ শতাংশ উপস্থিতি নিয়ে পরীক্ষায় অংশ নিলেও সব কোর্সে অকৃতকার্য হন। এরপর সর্বশেষ সুযোগে ২০২১ সালে পুনঃভর্তির আবেদন না করায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী তার ছাত্রত্ব বাতিল হয়।
২০২৪ সালের ১৩ নভেম্বর পুনঃভর্তির আবেদন করে মারুফ দাবি করেন, ছাত্রদলের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকায় তিনি ক্যাম্পাসে আসা, হলে থাকা এবং ক্লাস ও পরীক্ষায় অংশগ্রহণে বাধার মুখে পড়েছিলেন। পাশাপাশি পিতার মৃত্যুর বিষয়টিও আবেদনে উল্লেখ করেন। এসব কারণ বিবেচনায় নিয়ে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে তাকে বিশেষ সুযোগ দেওয়ার সুপারিশ করে তদন্ত কমিটি।
তবে মারুফের রাজনৈতিক নিপীড়নের অভিযোগ যাচাই করতে গিয়ে ভিন্ন তথ্য উঠে আসে। সহপাঠী, সিনিয়র ও জুনিয়রদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মারুফ ২০১৯ সাল থেকেই নিয়মিত বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে অবস্থান করতেন। এমনকি ছাত্রত্ব হারানোর পরও আওয়ামী লীগ সরকারের সময় হলের সিট দখলে রেখে বসবাস করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
তথ্যউপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২০ সালে তিনি অনুষদভিত্তিক ক্রিকেট প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। ২০২১ সালে নবাব সিরাজ উদ দৌলা হলের প্রীতিভোজ ও জন্মদিনের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। ২০২২ সালে হলের সামনে বন্ধুদের সঙ্গে তোলা ছবিতে তাকে দেখা যায়। ২০২৩ সালে নিজের জন্মদিনের আয়োজন করেন। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষদভিত্তিক ফুটবল প্রতিযোগিতাতেও অংশ নেন। এসব অনুষ্ঠানের একাধিক গ্রুপ ছবিতে তৎকালীন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদেরও দেখা যায়।
তার একাধিক সহপাঠীর দাবি, মারুফ নিয়মিত হলে থাকতেন এবং বিভিন্ন সামাজিক ও ক্রীড়া কার্যক্রমে অংশ নিতেন। ছাত্রলীগের নির্যাতনের শিকার হওয়ার কোনো ঘটনার কথা তারা শোনেননি। তবে তার বাড়িতে রাজনৈতিক সমস্যা ছিল বলে তারা জানান।
একই ব্যাচের কয়েকজন শিক্ষার্থী বলেন, ছাত্রত্ব না থাকলেও মারুফ তাদের সঙ্গেই চলাফেরা করতেন। দীর্ঘদিন একসঙ্গে পড়াশোনা করায় ব্যক্তিগত সম্পর্কের জায়গা থেকেই তিনি বিভিন্ন খেলাধুলা ও সামাজিক আয়োজনে অংশ নিতেন।
উল্লেখ্য, ৬ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনে ঢুকে এক কর্মচারীকে মারধরের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. আরফান আলী বাদী হয়ে শেরেবাংলা নগর থানায় ছয় ছাত্রদল নেতার বিরুদ্ধে মামলা করেন। ওই মামলায় ১ নম্বর আসামি ফরহাদ এবং ৩ নম্বর আসামি মারুফ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা প্রশ্ন তোলেন, তদন্ত কমিটির সুপারিশ ও বিদ্যমান বিধিমালার আলোকে এ ধরনের সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা কতটুকু। তাদের মতে, প্রশাসনিক ভবনে হামলার ঘটনায় অভিযুক্ত দুই শিক্ষার্থীর ছাত্রত্ব পুনর্বহাল ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা তৈরি করতে পারে। পাশাপাশি একই ধরনের একাডেমিক কারণে ছাত্রত্ব হারানো অন্য শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও একই নীতি অনুসরণ করা হয়েছে কি না, সেটিও যাচাই করা উচিত।
বিশ্ববিদ্যালয়ের করা মামলার বাদী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. আরফান আলী জানান, ওই মামলাটি প্রাথমিকভাবে নিষ্পত্তির কথা ভাবছেন অভিযোগকারী ও অভিযুক্তরা। তবে মামলাটি এখনো চলমান।
একাডেমিক কাউন্সিলের সিদ্ধান্তের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য এবং তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. বেলাল হোসেন বলেন, “একাডেমিক কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত এবং তদন্ত কমিটির সিদ্ধান্ত সাংঘর্ষিক। তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে আমরা যৌক্তিক এবং সব দিক বিবেচনা করে অভিমত দিয়েছি। তবে একাডেমিক কাউন্সিল যেহেতু বড় একটি হাউস এবং সেখানে অনেকের মতামত দেওয়ার সুযোগ ছিল, সেক্ষেত্রে সবার মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে তদন্ত কমিটির নেওয়া সিদ্ধান্ত থেকে আমি সরে আসিনি।”
এ বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. আব্দুল লতিফ বলেন, “একাডেমিক কাউন্সিলে তাদের পুনঃভর্তির সিদ্ধান্ত হয়েছে। মানবিক ও রাজনৈতিক কারণ দেখিয়ে তারা আবেদন করেছিল। তাই অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়) তাদেরও সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তদন্ত কমিটির সুপারিশ অনুযায়ীই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।”