ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বসবাসকারী বাঙালি মুসলিমসহ সীমান্তবর্তী এলাকার বহু মানুষকে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)।
মঙ্গলবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সংস্থাটি দাবি করে, ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) বিভিন্ন সময় সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারী ব্যক্তিদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিবি) প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই ছাড়া তাদের প্রবেশের অনুমতি না দেওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে এসব মানুষ দুই দেশের মধ্যবর্তী ‘জিরো লাইন’ এলাকায় আটকা পড়ে যাচ্ছেন।
বিজিবির তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি মাসের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত বিএসএফের অন্তত ২১টি ‘পুশ-ইন’ প্রচেষ্টা প্রতিহত করা হয়েছে। এসব ঘটনায় শিশুসহ দুই শতাধিক ব্যক্তিকে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করা হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ‘ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট’ নীতির আওতায় শত শত সন্দেহভাজন বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীকে আটক এবং কয়েক হাজার মানুষকে ফেরত পাঠানোর দাবি করেছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া বিভাগের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, সীমান্তে পরিবারগুলোকে আটকে রাখা বা জোরপূর্বক বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা মানবাধিকারের পরিপন্থী। তিনি নাগরিকত্ব যাচাইয়ের ক্ষেত্রে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর আহ্বান জানান।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সংস্থাটি কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য সংগ্রহ করেছে, যারা দাবি করেছেন যে রাতের আঁধারে বিভিন্ন দলকে সীমান্তে নিয়ে গিয়ে কাঁটাতারের ফাঁক দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে বিজিবি বাধা দিলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আবার ভারতীয় ভূখণ্ডে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।
পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও সীমান্তে সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনার বর্ণনা দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নারী, শিশু ও গর্ভবতী নারীসহ একাধিক পরিবার দীর্ঘ সময় সীমান্ত এলাকায় আটকা পড়ে ছিল। পরে কয়েক দফা আলোচনা ও পতাকা বৈঠকের পর তাদের ভারতে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ আরও দাবি করেছে, পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে বিপুলসংখ্যক মানুষের নাম বাদ পড়েছে, যা অনেকের মধ্যে আটক ও বহিষ্কারের আশঙ্কা সৃষ্টি করেছে। সংস্থাটির মতে, এ ধরনের পরিস্থিতি নাগরিকত্ব ও মানবাধিকারসংক্রান্ত জটিলতা আরও বাড়াতে পারে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, পশ্চিমবঙ্গে আটক থাকা সন্দেহভাজন বাংলাদেশি অভিবাসীদের মধ্যে অধিকাংশই মুসলিম সম্প্রদায়ের হলেও কিছু হিন্দু ধর্মাবলম্বীও রয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার পরই তাদের আটক করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে স্পষ্ট করেছে যে, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ও নাগরিকত্ব যাচাই ছাড়া সীমান্তে ঠেলে দেওয়া কাউকে গ্রহণ করা হবে না। উভয় দেশের মধ্যে প্রচলিত কূটনৈতিক ও প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই যেকোনো প্রত্যাবর্তন সম্পন্ন হওয়া উচিত বলে সরকারের অবস্থান।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী কোনো ব্যক্তিকে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া আটক বা বহিষ্কার করা যায় না। খাদ্য, পানি, চিকিৎসা ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা ছাড়া সীমান্তে আটকে রাখা মানবাধিকারের গুরুতর লঙ্ঘনের শামিল হতে পারে।
মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, কোনো ব্যক্তির নাগরিকত্ব যা-ই হোক না কেন, তাকে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মাঝখানে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে রাখা মানবিক নয়। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালনার ক্ষেত্রে মানবিক মর্যাদা ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।