দেশের চলমান জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট, দ্রব্যমূল্য, কৃষি, শিক্ষা, দুর্নীতি-চাঁদাবাজি, স্থানীয় সরকার নির্বাচন, আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরার সম্ভাবনা এবং বর্তমান সরকারের ছয় মাসের অর্জন ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে দৈনিক সকালের টক-শো ‘সকালের সমীকরণ’-এ খোলামেলা কথা বলেছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক ও সংসদ সদস্য শহিদুল ইসলাম বাবুল।
প্রায় এক ঘণ্টার আলোচনায় সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরার পাশাপাশি সংকট ও সীমাবদ্ধতার কথাও স্বীকার করেন তিনি। জ্বালানি সংকটের জন্য বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও অতীতের নীতিকে দায়ী করে তিনি বলেন, রাতারাতি এ সংকট সমাধানের কোনো সুযোগ নেই। একই সঙ্গে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিদ্যুৎ সাশ্রয় এবং উৎপাদনমুখী খাতে জ্বালানি সরবরাহকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেন।
কৃষকদের ঋণ মওকুফ, ফ্যামিলি কার্ড, শিক্ষা ব্যবস্থার মানোন্নয়ন, কারিগরি শিক্ষা, রাজনৈতিক সহনশীলতা ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়েও নিজের অবস্থান তুলে ধরেন তিনি।
দৈনিক সকালের পক্ষে সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন সোনিয়া হক।
সম্পূর্ণ আলোচনা দেখতে ছবির ওপরে ক্লিক করুন

সরকার জনগণের ভোটে এসেছে। সরকার ভালো না লাগলে পরবর্তী নির্বাচনে জনগণ তাকে বদলে দিতে পারবে। বিএনপি যদি তার প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে না পারে, জনগণ আগামী নির্বাচনে বিএনপিকে ভোট না দিয়ে অন্য দলকে আনবে।
এই অপশনটা জনগণের হাতে থাকা—এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য।
দৈনিক সকাল: বর্তমান সরকারের ছয় মাস পার হয়েছে। অনেকে বলছেন সরকারের ‘হানিমুন পিরিয়ড’ শেষ। একজন সংসদ সদস্য হিসেবে বিএনপি সরকারকে ১০-এর মধ্যে কত নম্বর দেবেন?
শহিদুল ইসলাম বাবুল: আমি নির্দিষ্টভাবে নম্বর দেওয়ার জায়গায় যেতে চাই না। বরং বিষয় ধরে ধরে মূল্যায়ন করা ভালো। প্রথমেই দৈনিক সকালের ‘সকালের সমীকরণ’ অনুষ্ঠানের সাফল্য কামনা করছি।
সাফল্য ও ব্যর্থতা শুধু সরকারের ক্ষেত্রেই নয়, প্রত্যেক মানুষের জীবনেই থাকে। একজন মানুষ সব ক্ষেত্রে, সব সময় সমানভাবে সফল হতে পারেন না। একইভাবে একটি সরকারও সব জায়গায় শতভাগ সফল হবে—এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়।
একটি সরকার যদি ৬০ মাসের জন্য আসে, সেখানে ছয় মাস খুব বেশি সময় নয়। আপনি এটাকে হানিমুন পিরিয়ড বলতে পারেন। তবে ছয় মাসে পুরো সরকারকে চূড়ান্তভাবে মূল্যায়ন করার মতো যথেষ্ট সময় হয়েছে বলে আমি মনে করি না। তারপরও ইংরেজিতে একটা কথা আছে—‘মর্নিং শোজ দ্য ডে’। সেই বিবেচনায় অবশ্যই আলোচনা ও মূল্যায়ন হতে পারে।
দৈনিক সকাল: তাহলে জ্বালানি সংকট দিয়েই শুরু করি। বর্তমান পরিস্থিতিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
শহিদুল ইসলাম বাবুল: জ্বালানির বিষয়টি বর্তমানে শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়; এটা একটা বৈশ্বিক সংকট। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই সংকটটা আরও তীব্র হয়েছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আরও একটি দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা আছে। আমাদের জ্বালানি, গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতে বিদেশি নির্ভরতা বাড়ানো হয়েছে এবং অভ্যন্তরীণ উৎসগুলোকে ক্রমেই দুর্বল করা হয়েছে। বিশেষ করে আমাদের নিজস্ব গ্যাসক্ষেত্রগুলোতে অনুসন্ধান ও খননের যে প্রয়োজন ছিল, দীর্ঘ সময় সেটা যথেষ্টভাবে করা হয়নি। ফলে আমরা ক্রমেই আমদানিনির্ভর বাস্তবতার দিকে গেছি।
আমি অবশ্যই জ্বালানি বিশেষজ্ঞ নই। দেখে, শুনে ও যতটুকু বুঝেছি সেই জায়গা থেকে কথাগুলো বলছি।
দৈনিক সকাল: কিন্তু বিএনপি যখন আগে ক্ষমতায় ছিল, তখনও তো জ্বালানি খাতে বড় ধরনের সংকট ছিল। তখন আপনারা কী করেছিলেন?
শহিদুল ইসলাম বাবুল: ২০-২১ বছর আগের জ্বালানি বাস্তবতা আর আজকের বাস্তবতা এক নয়। তখনও সংকট ছিল। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য জ্বালানি ব্যবস্থাপনা সব সময়ই জটিল।
বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রেও জ্বালানির ধরন গুরুত্বপূর্ণ। তেল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করলে খরচ অনেক বেড়ে যায়। গ্যাস বা অন্য উৎসের তুলনায় তেলভিত্তিক উৎপাদনের ব্যয় অনেক বেশি।
এখন আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাস ও তেলের দাম বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বেশি দাম দিয়েও জ্বালানি পাওয়া যাচ্ছে না। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি ও স্পট মার্কেটের মধ্যে দামের পার্থক্য আছে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি থাকলে নির্দিষ্ট দামে সরবরাহের নিশ্চয়তা কিছুটা থাকে, কিন্তু স্পট মার্কেটে পরিস্থিতি ভিন্ন।
নতুন সরকার ছয় মাস হলো এসেছে। এই সময়ের মধ্যে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলোচনা চলছে, নতুন উৎস থেকে জ্বালানি আনার চেষ্টা হচ্ছে। এসব প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ।
দৈনিক সকাল: মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালের সমস্যাও কি সংকট বাড়িয়েছে?
শহিদুল ইসলাম বাবুল: অবশ্যই। ভাসমান টার্মিনালে দুর্ঘটনার কারণে একটা সময় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গ্যাস সরবরাহে সমস্যা হয়েছে। পরে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে, কিন্তু পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে সময় লাগে।
আর আমাদের বড় জ্বালানি উৎস মধ্যপ্রাচ্য। সেখানেও সংকট তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে ইউরোপে গ্যাসের চাহিদা বেড়েছে। রাশিয়া থেকে ইউরোপের পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহের পরিস্থিতি বদলেছে। শীতকালে ইউরোপে হিটিংয়ের জন্য প্রচুর গ্যাস প্রয়োজন হয়।
ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে একটা চাপ তৈরি হয়েছে। গ্যাসের সংকটের সঙ্গে বিদ্যুতের সংকটও সরাসরি জড়িত।
দৈনিক সকাল: সরকারের দায়িত্বশীল পর্যায় থেকে বলা হয়েছে, জ্বালানি সংকট কাটাতে প্রায় দুই বছর সময় লাগতে পারে। কিন্তু এর মধ্যে শিল্পকারখানা সমস্যায় পড়ছে, উৎপাদন কমছে, ব্যবসায়ীরা ঋণখেলাপি হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছেন। অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব কীভাবে দেখছেন?
শহিদুল ইসলাম বাবুল: প্রভাব অবশ্যই আছে। বিদ্যুৎ ছাড়া অর্থনীতি চলবে না। কিন্তু কখনো ঘূর্ণিঝড়, ভূমিকম্প বা অন্য কোনো বিপর্যয় হলে সেটা কি সরকার ডেকে আনে?
বিএনপি সরকার গঠনের পর মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এর কারণে গ্যাস-তেলের দাম ও সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে। এই অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করে জ্বালানি কিনতে হচ্ছে।
আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে সংকটের মধ্যে ব্যবস্থাপনাটা কতটা ভালো করা যায়, সেটা দেখা। এমন তো নয় যে পুরো দেশ অন্ধকার হয়ে গেছে। হ্যাঁ, উৎপাদন ও উন্নয়নে বিঘ্ন ঘটছে, গরমে মানুষ কষ্ট পাচ্ছে। আমরা সেটা অস্বীকার করছি না। সরকারও মানুষের কষ্টের বিষয়ে দুঃখ প্রকাশ করেছে।
কিন্তু একই সঙ্গে এটাও দেখতে হবে, সংকটটা কীভাবে তৈরি হয়েছে এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে সর্বোচ্চ কী করা সম্ভব।
দৈনিক সকাল: ব্যবসায়ীরা বলছেন বিদ্যুৎ সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। তাদের কর বা ঋণের ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা দেওয়া যায় কি?
শহিদুল ইসলাম বাবুল: আমি যতটুকু দেখেছি, সরকার কারখানা ও উৎপাদনমুখী খাতে তুলনামূলক বেশি বিদ্যুৎ দেওয়ার চেষ্টা করছে। উৎপাদন চালু রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
সব কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে—এ ধরনের কিছু তথ্য নিয়েও পরে সংশোধন এসেছে। তবে কোথাও কোথাও সমস্যা হচ্ছে, সেটা সত্য।
সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে যাচ্ছে। অভ্যন্তরীণ গ্যাস অনুসন্ধানেও কাজ হচ্ছে। ভোলার গ্যাস কীভাবে জাতীয় ব্যবস্থায় যুক্ত করা যায়, সেটা নিয়ে উদ্যোগ আছে। পৃথিবীর যেখান থেকে গ্যাস পাওয়া সম্ভব, সেখান থেকে কিনতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে বেশি দামেও বুকিং করতে হচ্ছে।
সরকারের হাতে তো আলাদিনের চেরাগ নেই। আমাকে বা আপনাকে সরকারে বসালেও রাতারাতি এ সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হবে না। দীর্ঘদিনের নীতি এবং বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতা—দুটোর প্রভাবই আছে।
দৈনিক সকাল: বাসাবাড়ি ও ব্যক্তি পর্যায়ে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়াতে ভর্তুকি, স্বল্প সুদের ঋণ বা অন্য কোনো প্রণোদনার পরিকল্পনা আছে কি?
শহিদুল ইসলাম বাবুল: সৌরবিদ্যুৎ অবশ্যই কাজে লাগানো সম্ভব। তবে এটাও রাতারাতি হবে না।
সরকারি অফিস-আদালতের ছাদে সৌরশক্তির মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বাসাবাড়ি ও কারখানায় নিজস্ব নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনেও উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে।
এই খাতে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও সরঞ্জামের ওপর কর সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগও আছে। একটি কারখানা যদি তার প্রয়োজনীয় বিদ্যুতের একটা অংশ নিজেই সৌরশক্তি থেকে উৎপাদন করতে পারে, সেটাও জাতীয় গ্রিডের জন্য সাশ্রয়।
যেখানে যে সম্ভাবনা আছে, সেটাকে কাজে লাগানো দরকার।
দৈনিক সকাল: সামনে সেচ ও শুষ্ক মৌসুম। ধান উৎপাদনে বিদ্যুৎ ও ডিজেলের চাহিদা বাড়বে। কৃষি উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে সরকারের প্রস্তুতি কী?
শহিদুল ইসলাম বাবুল: বিষয়টি সরকারের মাথায় আছে। কৃষি উৎপাদনে ডিজেলের বড় প্রয়োজন হয়। প্রয়োজনীয় ডিজেল এনে মজুত রাখা এবং কৃষির জন্য সরবরাহ নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
প্রয়োজনে অন্যান্য খাতে সাশ্রয় করে হলেও কৃষি উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি নিশ্চিত করতে হবে। আমি যতটুকু জানি, সরকার বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে এবং প্রস্তুতি আছে।
তবে শুধু সরবরাহ থাকলেই হয় না। মজুতদারি, চোরাচালান বা কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে কি না, সেদিকেও নজর রাখতে হবে। সব সংকট যে প্রাকৃতিকভাবেই তৈরি হচ্ছে, সেটাও বলা যাবে না। কোনো ধরনের অন্তর্ঘাত বা কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা হচ্ছে কি না, সরকারকে সেটাও দেখতে হবে।
দৈনিক সকাল: বিদ্যুৎ সংকটের জন্য ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকে দায়ী করা হচ্ছে। এগুলোর চলাচল সীমিত হলে চালকদের কর্মসংস্থান ও সাধারণ মানুষের যাতায়াতেও প্রভাব পড়বে। আপনি কী মনে করেন?
শহিদুল ইসলাম বাবুল: ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চার্জ করতে সুনির্দিষ্টভাবে কত বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়, সেই পরিসংখ্যান আমার কাছে নেই। তবে গত পাঁচ-দশ বছরে এগুলোর সংখ্যা বিপুলভাবে বেড়েছে। লাখ লাখ যানবাহন হলে সেগুলো চার্জ করতে নিশ্চয়ই উল্লেখযোগ্য বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়।
আবার এর মাধ্যমে মানুষের কর্মসংস্থানও হয়েছে—এটাও সত্য।
আমি এগুলো বাতিল করার কথা বলছি না। বরং দেখতে হবে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করা যায় কি না। সৌরশক্তি বা অন্য নবায়নযোগ্য উৎস থেকে চার্জ দেওয়ার ব্যবস্থা করা গেলে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমতে পারে।
একই সঙ্গে শিল্পকারখানা, হাসপাতাল ও জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ স্থানে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
দৈনিক সকাল: তাহলে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের বড় জায়গা কোথায়?
শহিদুল ইসলাম বাবুল: আমাদের বিদ্যুৎ চুরি, সিস্টেম লস ও অপচয়ের জায়গাগুলো দেখতে হবে। নাগরিকরা সচেতন হলে এবং গণমাধ্যম এ বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করলে উল্লেখযোগ্য বিদ্যুৎ সাশ্রয় করা সম্ভব বলে আমি বিশ্বাস করি।
বড় অফিস, শপিং মল ও বিভিন্ন জায়গায় প্রচুর এসি চলে। অনেক ভবন এমনভাবে নির্মাণ করা হয়েছে যে এসি ছাড়া থাকা কঠিন। এখন ভবনগুলো তো ভেঙে ফেলা সম্ভব নয়। কিন্তু সাময়িকভাবে বাজারের সময়সীমা নিয়ন্ত্রণ করা যায় কি না, সরকারি অফিসে যেখানে সম্ভব প্রাকৃতিক আলো-বাতাস ব্যবহার করা যায় কি না—এসব ভাবতে হবে।
আপনার ঘরে যে বাতিটি প্রয়োজন নেই, সেটি বন্ধ করলেও সাশ্রয় হয়। বিন্দু বিন্দু করেই তো সিন্ধু হয়।
অটোরিকশার ক্ষেত্রেও বিকল্প চার্জিং ব্যবস্থা করা যায়। আবার এসব যানবাহনের লাইসেন্স, ফিটনেস ও নির্দিষ্ট রুটের বিষয়ও দেখতে হবে। কর্মসংস্থান প্রয়োজন, কিন্তু তার মানে বিশৃঙ্খলা তৈরি করা যাবে না।
দৈনিক সকাল: দীর্ঘদিন পর ভোটের মাধ্যমে একটি নির্বাচিত সরকার এসেছে, কার্যকর সংসদ রয়েছে। ফলে সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশাও অনেক বেশি। সেই প্রত্যাশা পূরণে ছয় মাসে সরকার কতটা সফল?
শহিদুল ইসলাম বাবুল: ভালো-মন্দ দুটোই থাকবে। বাংলাদেশের মতো বিপুল জনগোষ্ঠীর একটি দেশে বেকারত্ব, অভাব-অনটন, অপরাধসহ অনেক সমস্যা রয়েছে। এত ছোট ভূখণ্ডে এত মানুষ—এটাও একটা বড় বাস্তবতা।
মানুষের প্রত্যাশা অবশ্যই অনেক। দীর্ঘদিন মানুষ বিভিন্ন উন্নয়নের গল্প শুনেছে। আমি প্রশ্ন করতে চাই—এত উন্নয়ন যদি হয়ে থাকে, তাহলে আজকের সমস্যাগুলো এত তীব্র কেন?
আমি বলছি না যে কোনো উন্নয়ন হয়নি। মেট্রোরেল হয়েছে, বিভিন্ন অবকাঠামো হয়েছে। কিন্তু সাফল্য খুঁজলে যেমন পাওয়া যাবে, তেমনি ব্যর্থতা বা দুর্বলতাও পাওয়া যাবে। সবকিছুকে একপাক্ষিকভাবে দেখলে হবে না।
দৈনিক সকাল: মানুষ এখন সরাসরি সরকারের কাছে জবাব চাইছে—জিনিসপত্রের দাম কমছে না কেন, বিদ্যুৎ-গ্যাসের সমস্যা কেন। তাদের কী বলবেন?
শহিদুল ইসলাম বাবুল: জনগণের প্রত্যাশা থাকতেই পারে। আমরা সরকারে এসেছি, মানুষের দায়িত্ব নিয়েছি। এটা আমরা অস্বীকার করি না।
মানুষ ক্ষুব্ধ—সেটাও সত্য। আমার নিজের ঘরেও বিদ্যুৎ থাকে না, অনেক সময় গ্যাস থাকে না। আমার এলাকার মানুষও ফোন করে অভিযোগ করেন।
আমি যদি বলি ছয় মাসে সব ঠিক করে ফেলেছি, সেটা মিথ্যা বলা হবে। মানুষ তখন আরও বেশি ক্ষুব্ধ হবে।
প্রধানমন্ত্রীও মানুষের কষ্টের বিষয়ে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু একই সঙ্গে দেখতে হবে এই সংকট কোথা থেকে তৈরি হয়েছে।
দৈনিক সকাল: আপনার মতে সংকটটা কোথা থেকে তৈরি হয়েছে?
শহিদুল ইসলাম বাবুল: বিদ্যুৎ খাতে অতীতে যেসব চুক্তি হয়েছে, তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর যে নির্ভরতা তৈরি হয়েছে এবং বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রের বকেয়া—এসবের চাপ বর্তমান সরকারকে বহন করতে হচ্ছে।
বিদ্যুৎ কিনতে হচ্ছে, পাওয়ার প্ল্যান্টের বকেয়া পরিশোধ করতে হচ্ছে, আবার নতুন করে তেল-গ্যাসও কিনতে হচ্ছে।
অন্যদিকে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে যথেষ্ট কাজ হয়নি। বাপেক্সকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানো যেত।
এখন নিজস্ব উৎসে গ্যাস অনুসন্ধান ও কূপ খনন-পুনঃখননের কাজ শুরু হয়েছে। ভোলার গ্যাসকে সরাসরি পাইপলাইনে যুক্ত করার জন্যও ব্যয়বহুল প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে।
কিন্তু এগুলো রাতারাতি করা যায় না। গ্যাস, বিদ্যুৎ বা তেলের সমস্যার সমাধানে কারও হাতে জাদুমন্ত্র নেই।
দৈনিক সকাল: রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে সরকার কী ভাবছে?
শহিদুল ইসলাম বাবুল: সেখানে কাজ চলছে। এটাও ব্যয়বহুল প্রকল্প। আমি যতটুকু শুনেছি, পর্যায়ক্রমে সেখান থেকে বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার কথা।
শুরুতেই বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে—এমন নয়। ধীরে ধীরে উৎপাদন বাড়বে। জাতীয় গ্রিডে নতুন বিদ্যুৎ যুক্ত হলে সেটা অবশ্যই ইতিবাচক। তবে এটাও সময়সাপেক্ষ।
দৈনিক সকাল: এবার সরাসরি বলুন—ছয় মাসে বিএনপি সরকার জনগণকে কী দিয়েছে?
শহিদুল ইসলাম বাবুল: প্রথম বিষয় হচ্ছে সুশাসন ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা। আমি মনে করি দেশে এখন এমন একটি সংসদ আছে যেখানে সরকারি দল আছে, বিরোধী দল আছে এবং জবাবদিহিতা আছে। কার্যকর সংসদ থাকা গুরুত্বপূর্ণ।
আর সবচেয়ে বড় কথা হলো, সরকার জনগণের ভোটে এসেছে। সরকার ভালো না লাগলে পরবর্তী নির্বাচনে জনগণ তাকে বদলে দিতে পারবে। বিএনপি যদি তার প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে না পারে, জনগণ আগামী নির্বাচনে বিএনপিকে ভোট না দিয়ে অন্য দলকে আনবে।
এই অপশনটা জনগণের হাতে থাকা—এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য।
দৈনিক সকাল: কিন্তু সাধারণ মানুষ দৃশ্যমানভাবে কী পেল?
শহিদুল ইসলাম বাবুল: আমি বলব, সুশাসনের একটি দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে। হয়তো এটা রাস্তা-সেতুর মতো দৃশ্যমান নয়।
আজ আপনি আমাকে যেকোনো প্রশ্ন করতে পারছেন। নির্ভয়ে একজন এমপি, মন্ত্রী বা সরকারকে প্রশ্ন করার পরিবেশ থাকা গুরুত্বপূর্ণ। আমি এলাকায় গেলেও সাধারণ মানুষ, এমনকি বাচ্চারাও আমাকে প্রশ্ন করে। আমি সেটা উপভোগ করি।
আমি চাই একজন এমপিকে প্রশ্ন করা যাবে, একজন মন্ত্রীকে প্রশ্ন করা যাবে, সরকারকে প্রশ্ন করা যাবে। প্রশ্ন করার কারণে কেউ হয়রানির শিকার হবে না—এই পরিবেশটাই গণতন্ত্রের একটা বড় অর্জন।
দৈনিক সকাল: আপনি কৃষক সংগঠনের সঙ্গে কাজ করেন। কৃষকদের জন্য এই সরকার কী করেছে?
শহিদুল ইসলাম বাবুল: বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কৃষির গুরুত্ব এখনো অনেক। কিন্তু প্রান্তিক কৃষক বা কৃষিশ্রমিকের জীবন দেখুন—অনেকে মায়ের চিকিৎসা করাতে পারেন না, সন্তানকে ভালো স্কুলে পড়াতে পারেন না।
কৃষকের কথা মুখে অনেক বলা হয়, কিন্তু তাদের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন কতটা আসে, সেটা দেখতে হবে।
বিএনপির অতীত সরকারগুলোতেও কৃষিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জিয়াউর রহমানের সময় খাল খনন, কৃষি উৎপাদন বাড়ানো, সেচ ও বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল। বেগম খালেদা জিয়ার সময়ও কৃষকদের জন্য ঋণ ও ভূমি-সংক্রান্ত বিভিন্ন সুবিধা দেওয়া হয়েছিল।
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসেও কৃষিঋণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রায় ১৫ লাখ কৃষকের জন্য প্রায় ১২০০ কোটি টাকার কৃষিঋণ মওকুফের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে আমি জানি। গ্রামের একজন প্রান্তিক কৃষকের কাছে ১০ হাজার টাকার ঋণ মওকুফও অনেক বড় ব্যাপার।
দৈনিক সকাল: নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি কার্ডসহ বিভিন্ন কর্মসূচির কথা ছিল। সেগুলোর অগ্রগতি কী?
শহিদুল ইসলাম বাবুল: ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষি কার্ড নিয়ে কাজ চলছে। গ্রামে গেলে নারীরা আমাকে জিজ্ঞেস করেন—কবে ফ্যামিলি কার্ড পাবেন। অর্থাৎ মানুষের মধ্যে এ নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
মসজিদ-মন্দির, ইমাম-মুয়াজ্জিন ও পুরোহিতদের জন্য ভাতার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ শুরু হয়েছে।
স্কুলের শিশুদের জন্য মিড-ডে মিল, ইউনিফর্ম এবং অন্যান্য সুবিধা কীভাবে দেওয়া যায়, তা নিয়েও পরিকল্পনা রয়েছে।
এসবের সবকিছু ছয় মাসেই শতভাগ বাস্তবায়িত হয়ে যাবে—এমন নয়। কিন্তু প্রক্রিয়াগুলো শুরু হয়েছে।
দৈনিক সকাল: শিক্ষা খাতে সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনা কী বলে মনে করেন?
শহিদুল ইসলাম বাবুল: শিক্ষা একটা জাতির মেরুদণ্ড। আমাদের বিশ্লেষণ হচ্ছে, পৃথিবীর যেসব জাতি উন্নতি করেছে, তাদের বাজেটে শিক্ষাকে বড় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এবার শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। শিক্ষায় বিনিয়োগের ফল আগামী বছরই পাওয়া যাবে না। এর ফল ২০ বা ২৫ বছর পরও আসতে পারে। কিন্তু এখন বিনিয়োগ না করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
শুধু অর্থনৈতিক সংকট কাটালেই হবে না। অর্থনীতি একসময় পুনরুদ্ধার করা যায়, বিদ্যুতের সংকটও একসময় কাটানো যায়। কিন্তু একটা প্রজন্মের শিক্ষা যদি ধ্বংস হয়ে যায়, তরুণরা যদি মাদকাসক্ত হয়ে যায়, তখন সেই ক্ষতি ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত কঠিন।
দৈনিক সকাল: এবারের এসএসসি-এইচএসসির ফলাফল নিয়েও অভিযোগ আছে। পাসের হার কমেছে। আপনি এটাকে কীভাবে দেখছেন?
শহিদুল ইসলাম বাবুল: পড়াশোনা না করে অটোপাস দেওয়ার সংস্কৃতি তৈরি করা ঠিক নয়। শিক্ষার মান নিশ্চিত করতে হবে।
আপনি যখন স্কুলে পড়েছেন, তখনকার শিক্ষার মান আর এখনকার শিক্ষার মানের মধ্যে পার্থক্য আছে কি না—সেটা দেখুন।
আমাদের প্রকৃত মানের শিক্ষা দিতে হবে। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে, পেশাদারত্ব তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষকদের আর্থিক নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদার বিষয়টিও দেখতে হবে।
শুধু পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করলাম—এই মানসিকতা থেকে বের হতে হবে। শিক্ষার্থীদের বুঝতে হবে, পড়াশোনা করতে হবে, পরীক্ষা দিতে হবে এবং যোগ্যতার প্রমাণ দিতে হবে।
দৈনিক সকাল: তাহলে কি সবার উচ্চশিক্ষার প্রয়োজন নেই?
শহিদুল ইসলাম বাবুল: আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়, সবার জন্য একই ধরনের উচ্চশিক্ষা প্রয়োজন নেই। যারা উচ্চশিক্ষায় যাবে, তাদের একটা ন্যূনতম মান থাকা দরকার। রাষ্ট্র যখন একজন শিক্ষার্থীর পেছনে বিনিয়োগ করে, তখন রাষ্ট্রেরও একটা আউটকাম পাওয়ার প্রত্যাশা থাকে।
কারিগরি শিক্ষাকে আরও গুরুত্ব দিতে হবে। বাস্তবমুখী শিক্ষা দরকার।
পৃথিবীর অনেক দেশে দক্ষ জনবলের প্রয়োজন আছে। কিন্তু আমরা সেই ধরনের দক্ষ মানুষ তৈরি করতে পারছি না। বিদেশি ভাষার প্রাথমিক জ্ঞান, কার্পেন্ট্রি বা বিভিন্ন কারিগরি দক্ষতা শেখানো গেলে তরুণদের আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে সুযোগ বাড়বে।
এতে কর্মসংস্থান যেমন হবে, তেমনি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেরও নতুন পথ খুলবে।
দৈনিক সকাল: কেউ কেউ এখনো বলছেন দেশ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। আপনি কী বলবেন?
শহিদুল ইসলাম বাবুল: সরকার মানেই রাজপথ কাঁপিয়ে চলতে হবে, বিরোধী দলকে মেরে-কেটে শেষ করে দিতে হবে—আমি এই ধারণায় বিশ্বাস করি না।
গত ছয় মাসে কোনো রাজনৈতিক দলের অফিসে বিএনপি তালা দিয়েছে কি না, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে রাষ্ট্রীয়ভাবে দমন করা হয়েছে কি না—সেটাও দেখতে হবে।
একটা গণতান্ত্রিক দেশে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি থাকবে। মতের পার্থক্য থাকবে। কিন্তু তাদের রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে হবে।
দৈনিক সকাল: কিন্তু আওয়ামী লীগ তো বড় রাজনৈতিক দল ছিল। তাদের কার্যক্রম বন্ধ হয়েছে। এর দায় বিএনপি এড়াতে পারে?
শহিদুল ইসলাম বাবুল: আওয়ামী লীগের কার্যক্রম বিএনপি সরকার বন্ধ করেনি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রশাসনিকভাবে যে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, তখনও বিএনপি প্রশাসনিক আদেশে রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার বিরোধিতা করেছে।
আমাদের অবস্থান হচ্ছে—প্রশাসনিক আদেশে কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ হওয়া উচিত নয়। সেটা আওয়ামী লীগ হোক বা জামায়াত হোক।
এখন বিষয়টি আইন ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্যে গেছে। বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করবে। বিএনপি সেখানে হস্তক্ষেপ করবে না।
আমি ব্যক্তিগতভাবে চাই, আইনগত প্রক্রিয়া মোকাবিলা করে আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে ফিরে আসুক। আমরা আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবেই দেখতে চাই। তাদের মোকাবিলা করে বিএনপি অতীতেও ক্ষমতায় গেছে।
দৈনিক সকাল: অর্থাৎ আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখতে আপনাদের আপত্তি নেই?
শহিদুল ইসলাম বাবুল: কোনো আপত্তি নেই। আওয়ামী লীগকে মোকাবিলা করে আমরা অতীতেও নির্বাচন করেছি।
রাজনীতিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে। কে জিতবে সেটা জনগণ নির্ধারণ করবে।
আর আপনি আজ আমাকে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করতে পারছেন—এটাই তো প্রশ্ন করার স্বাধীনতা। আমি এটাকেই গণতন্ত্রের একটা অর্জন হিসেবে দেখি।
দৈনিক সকাল: সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। জামায়াত সক্রিয়, এনসিপিও নতুন দল হিসেবে মাঠে রয়েছে। আওয়ামী লীগের লোকজনও স্বতন্ত্রভাবে অংশ নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। নির্বাচনকে সরকার কীভাবে দেখছে?
শহিদুল ইসলাম বাবুল: নির্বাচন আয়োজন করে নির্বাচন কমিশন। সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানের পরিবেশ তৈরি করে।
বিএনপির কথা যদি বলেন, আমরা উদার ও উন্মুক্ত গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি। স্থানীয় সরকার নির্বাচন, বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন একসময় বাংলাদেশের মানুষের কাছে উৎসব ছিল।
নির্বাচনকে আতঙ্কে পরিণত করা উচিত নয়। স্থানীয় নির্বাচন স্থানীয় মানুষের নির্বাচন হিসেবেই হওয়া উচিত।
দৈনিক সকাল: স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক না থাকার সিদ্ধান্তকে কীভাবে দেখছেন?
শহিদুল ইসলাম বাবুল: আমি এই সিদ্ধান্তকে ইতিবাচকভাবে দেখি। ধানের শীষ, নৌকা বা দাঁড়িপাল্লার মতো দলীয় প্রতীক স্থানীয় সরকার নির্বাচনে না থাকলে প্রতিযোগিতাটা আরও স্থানীয় হতে পারে।
রাজনৈতিক দল কাউকে সমর্থন দিতে পারে—এমন আলোচনা আছে। তবে ব্যক্তিগতভাবে আমি চাই আরও উন্মুক্ত নির্বাচন হোক।
প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন, কাউকে জিতিয়ে আনা হবে না। প্রার্থীদের নিজেদের যোগ্যতায় জিতে আসতে হবে।
দৈনিক সকাল: বিএনপির তৃণমূল এখন কতটা সংগঠিত?
শহিদুল ইসলাম বাবুল: সংগঠিত না থাকলে নির্বাচনে জেতা যাবে না। আমার নিজের নির্বাচনী এলাকাতেই ২৫টি ইউনিয়ন রয়েছে। অনেকেই প্রার্থী হতে চান, আমার কাছে আসেন।
আমি সবাইকে বলেছি—দলের সমর্থন পেলেই যে জিতে যাবেন, এমন ভাবার সুযোগ নেই।
আমি চাই উন্মুক্ত মাঠ থাকুক। যে মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারবে, সে নির্বাচনে জিতে আসবে।
এমনকি বিএনপি কাউকে মনোনয়ন বা সমর্থন দিলেও তাকে জিতিয়ে আনার দায়িত্ব সরকার, এমপি বা দলের নয়। তাকে নিজের কাজ, যোগ্যতা ও মানুষের সমর্থনের মাধ্যমে জিততে হবে।
একজন বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীও যদি না জেতে, তাতেও সমস্যা নেই। নির্বাচনের প্রতি সম্মান থাকতে হবে এবং মানুষের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটতে দিতে হবে।
দৈনিক সকাল: বিএনপি দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্সের’ কথা বলছে। কিন্তু বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধেও চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে।
শহিদুল ইসলাম বাবুল: দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির প্রশ্নটা গুরুত্বপূর্ণ।
এখন পর্যন্ত বিএনপির কোনো এমপি বা বড় নেতার বিরুদ্ধে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচারের মতো অভিযোগের খবর আমরা শুনিনি। আমি আশা করি ভবিষ্যতেও শুনব না।
প্রধানমন্ত্রী প্রথম দিন থেকেই আমাদের এ বিষয়ে সতর্ক করেছেন।
তবে আমি এটাও বলব, দুর্নীতি পৃথিবীর অনেক দেশেই আছে। কম-বেশি আছে। দুর্নীতি আছে বলেই দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন হয়।
রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি কমাতে হবে। একই সঙ্গে ব্যক্তি পর্যায়ের ছোট ছোট দুর্নীতিও রয়েছে। এগুলো একদিনে বন্ধ করা সম্ভব নয়। ছয় মাসের সরকার দিয়ে তো নয়ই, অনেক ক্ষেত্রে একটি মেয়াদের সরকার দিয়েও পুরোপুরি নির্মূল করা কঠিন।
আমাদের দেশে দুর্নীতি একটা সামাজিক ব্যাধির মতো দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে।
দৈনিক সকাল: চাঁদাবাজির অভিযোগটা তাহলে অস্বীকার করছেন না?
শহিদুল ইসলাম বাবুল: না, আমি বলছি না যে কোথাও চাঁদাবাজি হয় না। যার যখন প্রভাব থাকে, কোথাও কোথাও এ ধরনের ঘটনা ঘটে।
কিন্তু চাঁদাবাজিকে একটা শিল্পে পরিণত করা আর বিচ্ছিন্নভাবে কোথাও ঘটনা ঘটা এক বিষয় নয়।
আমি এটাকে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সমস্যাও মনে করি। কোথায় কী হচ্ছে, সবকিছু আমার বা আপনার পক্ষে জানা সম্ভব নয়। আমার নিজের এলাকাতেও কোনো কোনো অভিযোগ কখনো কানে আসে।
ছয় মাসে পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়। তবে আমি বিশ্বাস করি পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে এবং আরও উন্নতি করতে হবে।
দৈনিক সকাল: আওয়ামী লীগ বা শেখ হাসিনার ফিরে আসার আলোচনা নিয়ে সরকার নাকি চিন্তিত—এ ধরনের কথাও শোনা যাচ্ছে। আপনারা কি আসলেই চিন্তিত?
শহিদুল ইসলাম বাবুল: আমরা ১৭ বছর ধরে রাজনৈতিক লড়াই করেছি। রাজপথে লড়েছি। এখন কে কবে আসবেন, সেই চিন্তায় যদি আমাদের ঘুম নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে রাজনীতি করে লাভ কী?
আমাদের রাজনৈতিক জীবনই আন্দোলন, প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের মধ্য দিয়ে গেছে। কাজেই এ ধরনের ভয় দেখিয়ে লাভ নেই।
দৈনিক সকাল: তাহলে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ আপনি কীভাবে দেখছেন?
শহিদুল ইসলাম বাবুল: কেউ রাতারাতি বিএনপি হয়ে যায় না, আবার কেউ রাতারাতি আওয়ামী লীগও হয়ে যায় না। আওয়ামী লীগের একটি বড় সমর্থকগোষ্ঠী বাংলাদেশে আছে—এটা বাস্তবতা।
তাদের সবাইকে তো দেশ থেকে বের করে দেওয়া যাবে না। আবার আওয়ামী লীগ সমর্থন করলেই প্রত্যেক ব্যক্তি অপরাধী—এটাও ঠিক নয়।
কেউ একসময় নৌকায় ভোট দিয়েছেন, তার মানে তিনি ভয়ংকর অপরাধ করেছেন—এমন চিন্তা করা যায় না।
যারা অপরাধ করেছেন, তারা আইনের মুখোমুখি হবেন। কিন্তু একজন সাধারণ ভোটার, সমর্থক, ছোট নেতা এবং অপরাধে জড়িত একজন নেতাকে একইভাবে দেখা যাবে না। মানুষের মধ্যে পার্থক্য আছে।
যারা সমাজে স্বাভাবিকভাবে বসবাস করছেন, ভোট দেওয়ার অধিকার আছে, আইন তাদের বাধা না দিলে স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রেও তাদের নাগরিক অধিকার বিবেচনায় নিতে হবে।
দৈনিক সকাল: তাহলে কি আপনি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ‘পুনর্বাসনের’ পক্ষে?
শহিদুল ইসলাম বাবুল: আমি অপরাধীদের পুনর্বাসনের কথা বলছি না। যারা অপরাধ করেছেন, তাদের আইনের মুখোমুখি হতে হবে।
আমি সাধারণ সমর্থক ও নাগরিকদের কথা বলছি। আওয়ামী লীগের সব মানুষ অপরাধী—এটা বলা যাবে না।
আইনগতভাবে আওয়ামী লীগ যদি আবার রাজনীতিতে ফিরে আসে, তারা উন্মুক্তভাবে রাজনীতি করবে—সেটাতেও আমার আপত্তি নেই।
রাজনীতি করতে হলে জনগণের কাছে যেতে হবে, নিজেদের অতীত কর্মকাণ্ডের ব্যাখ্যা দিতে হবে এবং জনগণের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে হবে।
দৈনিক সকাল: তৃণমূল বিএনপির একটি অভিযোগ আছে—আওয়ামী লীগের পদধারী অনেককে জায়গা দিতে গিয়ে দীর্ঘদিন নির্যাতিত বিএনপির কর্মীদের সঙ্গে কেন্দ্র অমানবিক আচরণ করছে। অভিযোগটি কি সত্য?
শহিদুল ইসলাম বাবুল: নির্বাচনের প্রেক্ষাপট একটু ভিন্ন। আপনি যখন নির্বাচন করতে যাবেন, তখন মানুষকে আলাদা করে বলতে পারবেন না—‘তুমি আওয়ামী লীগ, তুমি আমাকে ভোট দিতে পারবে না।’
আপনাকে সবার কাছেই ভোট চাইতে হবে।
কেউ আমাকে ভোট দিলে তার প্রতিও আমার একটা দায়বদ্ধতা তৈরি হয়। আর আমি যখন সংসদ সদস্য হয়েছি, তখন শুধু বিএনপির মানুষের নয়—আমার এলাকার সব মানুষের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষার দায়িত্ব আমার।
কেউ আবেগ থেকে বলতে পারেন, যারা আমাদের ওপর নির্যাতন করেছে তাদের সবাইকে প্রতিশোধের মুখোমুখি করতে হবে। দীর্ঘদিন নির্যাতিত একজন কর্মীর মধ্যে সেই আবেগ থাকা অস্বাভাবিক নয়।
কিন্তু বেগম খালেদা জিয়াও প্রতিহিংসার রাজনীতি না করার কথা বলেছেন। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া যাবে না।
আমাদের পথ হতে হবে আইনের পথ। অপরাধী হলে বিচার হবে, কিন্তু রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে সাধারণ মানুষের ওপর প্রতিহিংসা করা যাবে না।
দৈনিক সকাল: সবশেষে, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আপনার বার্তা কী?
শহিদুল ইসলাম বাবুল: আমাদের রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে। সরকার ও বিরোধী দল থাকবে। একে অপরের সমালোচনা হবে। জনগণ সরকারকে প্রশ্ন করবে।
কিন্তু প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আইন হাতে তুলে নেওয়া যাবে না। যে অপরাধ করেছে, তার বিচার আইন অনুযায়ী হবে।
সরকারেরও ভুল থাকতে পারে, ব্যর্থতা থাকতে পারে। আবার অর্জনও থাকবে। জনগণ সেই বিচার করবে এবং নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের সিদ্ধান্ত জানাবে।
গণতন্ত্রের সৌন্দর্যই হচ্ছে—সরকার চিরস্থায়ী নয়। জনগণ চাইলে সরকার পরিবর্তন করতে পারে।
দেশটা আমাদের সবার। তাই দলমত নির্বিশেষে সবাইকে নিয়ে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে হবে।