বুধবার, ১৩ মে ২০২৬

পরীক্ষামূলক সংস্করণ

ইসলাম ও জীবন

স্বাধীনতাযুদ্ধে বাঙালি আলেমদের অমূল্য অবদান

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ ছিল বাঙালি জাতির ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় সংগ্রাম। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে মুক্তির লড়াইয়ে কেবল সাধারণ মানুষ নয়, দেশের আলেম সমাজও ছিল অগ্রভাগে। তাদের অংশগ্রহণ ছিল একাধিক দিক দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সাহসী। ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বর্বরতার পর মুক্তিযুদ্ধে তাদের অবদান ছিল সঙ্গতি ও সংগ্রামের নিদর্শন। স্বাধীনতা অর্জনে আলেমরা যেভাবে নেতৃত্ব […]

নিউজ ডেস্ক

১৬ ডিসেম্বর ২০২৪, ১৮:৩৭

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ ছিল বাঙালি জাতির ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় সংগ্রাম। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে মুক্তির লড়াইয়ে কেবল সাধারণ মানুষ নয়, দেশের আলেম সমাজও ছিল অগ্রভাগে। তাদের অংশগ্রহণ ছিল একাধিক দিক দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সাহসী। ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বর্বরতার পর মুক্তিযুদ্ধে তাদের অবদান ছিল সঙ্গতি ও সংগ্রামের নিদর্শন।

স্বাধীনতা অর্জনে আলেমরা যেভাবে নেতৃত্ব দিয়েছেন ও নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন, তা আজও আমাদের প্রেরণা যোগায়। আজ আমরা তাদের সম্পর্কে জানবো ইনশাআল্লাহ ।

১. মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী
মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সঙ্গী ছিলেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। ৭ সেপ্টেম্বর ১৯৭১ সালে তিনি সর্বদলীয় উপদেষ্টা পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হন এবং মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে জনমত গঠনে অসামান্য ভূমিকা পালন করেন।

২. হাফেজ প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ
মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়া তাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন একজন হাফেজে কুরআন। তিনি যুদ্ধকালীন সরকারের নেতৃত্ব দেন এবং দেশ মুক্তির লক্ষ্যে এক অগ্রণী নেতা হিসেবে কাজ করেন।

৩. শহীদ আলেম বুদ্ধিজীবী মাওলানা অলিউর রহমান
বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী একজন আলেম ছিলেন মাওলানা অলিউর রহমান। তিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে পুস্তিকা রচনা করতেন। ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ তার অকাল শহীদ হন আলবদর বাহিনীর হাতে।

৪. স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের আলেমরা
মাওলানা উবায়দুল্লাহ বিন সাঈদ ও মাওলানা আবদুল্লাহ বিন সাঈদ জালালাবাদী দুই ভাই স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে কুরআনভিত্তিক অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন এবং জনগণকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সচেতন করেন।

৫. যোদ্ধা সংগ্রাহক মুফতি আব্দুস সোবহান
চট্টগ্রামের মুফতি আব্দুস সোবহান মুক্তিযুদ্ধের সময় নিজ বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিয়ে তাদের প্রশিক্ষণ ও উৎসাহ প্রদান করেন। তিনি নিজে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেন এবং তরুণদের সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করেন।

৬. গেরিলা যোদ্ধা মাওলানা আবদুর রহমান
কুমিল্লার মাওলানা আবদুর রহমান ছিলেন একজন গেরিলা যোদ্ধা। তিনি যুদ্ধের শুরুতে প্রশিক্ষণ নিয়ে একাধিক গেরিলা অভিযানে অংশ নেন ও দেশ স্বাধীন করার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেন।

৭. লিফলেট বিতরণকারী মাওলানা আবু ইসহাক
রাঙামাটির মাওলানা আবু ইসহাক পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লিফলেট বিতরণ করতেন এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনগণকে জাগ্রত করতেন। রাজাকার বাহিনী তাকে খুঁজতে শুরু করলে তিনি গভীর জঙ্গলে আত্মগোপন করেন।

৮. মুক্তিযোদ্ধা পরিষদের অংশগ্রহণকারী মাওলানা আবদুস সোবহান
মাওলানা আবদুস সোবহান মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে মুক্তিযোদ্ধা পরিষদ গঠন করেন এবং তার নেতৃত্বে শতাধিক যোদ্ধা সংগ্রহ করা হয়।

৯. মাওলানা দলিলুর রহমানের স্বাধীনতা সংগ্রাম
মাওলানা দলিলুর রহমান রাঙ্গুনিয়ায় প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের প্রথম থেকেই আলেম সমাজকে সংগঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

১০. মুক্তিযুদ্ধের সাহসী সেনা কর্মকর্তা মাওলানা নূরুল আফসার
মাওলানা নূরুল আফসার ফেনী ও নাজিরহাট অঞ্চলের একাধিক মুক্তিযুদ্ধের অভিযানে অংশগ্রহণ করেন এবং পরে সেনাবাহিনীতে যোগদান করে সার্জেন্ট পদে দায়িত্ব পালন করেন।

১১. মসজিদে মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দানকারী মাওলানা মতিউল ইসলাম
নারায়ণগঞ্জের মিলনপাড়া মসজিদের ইমাম মাওলানা মতিউল ইসলাম যুদ্ধকালীন সময়ে মসজিদে মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিয়ে তাদের সুরক্ষা প্রদান করেন।

১২. সংবাদ সংগ্রহকারী মাওলানা মির্জা মোহাম্মদ নূরুল হক
কুড়িগ্রামের মাওলানা মির্জা মোহাম্মদ নূরুল হক পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সংবাদ সংগ্রহ করতেন এবং যুদ্ধকালীন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করতেন।

১৩. তিস্তা ব্রিজ দখলকারী মাওলানা আমজাদ হোসেন
মাওলানা আমজাদ হোসেন মুক্তিযুদ্ধের সময় তিস্তা ব্রিজ অপারেশনে অংশ নিয়ে দীর্ঘ ১৩ দিন যুদ্ধ করে ব্রিজটি দখল করেন।

১৪. প্রকাশ্যে জীবন উৎসর্গকারী মাওলানা আবুল হাসান
মাওলানা আবুল হাসান যশোর রেলস্টেশন মাদরাসার শিক্ষক ছিলেন এবং পাকিস্তানি বাহিনী তার মাদরাসায় হামলা চালিয়ে তাকে শহীদ করে। তার আত্মত্যাগ দেশের স্বাধীনতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

এইসব আলেমরা শুধুমাত্র ধর্মীয় নেতাই ছিলেন না, বরং তারা মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করে দেশকে স্বাধীন করতে তাদের জীবন উৎসর্গ করেন। তারা দেশে এবং বিদেশে স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতিটি পদক্ষেপে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। তাদের অবদান আজও বাংলাদেশের ইতিহাসে এক স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে আলেম সমাজের এই সাহসিকতা ও ত্যাগকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা উচিত, কেননা তারা প্রমাণ করেছেন, ধর্ম, জাতি, ও স্বাধীনতার সংগ্রামে কখনো কোনো বিভেদ হতে পারে না, বরং একসঙ্গে এগিয়ে চলা ছাড়া মুক্তি সম্ভব নয়।

ইসলাম ও জীবন

সৌদিতে চাঁদ দেখা গেছে, কাল থেকে রোজা শুরু

সৌদি আরবে ১৪৪৭ হিজরি সনের পবিত্র রমজান মাসের চাঁদ দেখা গেছে। আজ মঙ্গলবার সন্ধ্যায় দেশটির সরকার পবিত্র রমজান মাস শুরুর ঘোষণা দিয়েছে। তারা বলেছে, চাঁদের দেখা মেলায় কাল বুধবার প্রথম রোজা হবে। ‘হারামাইন’ নামে ওয়েবসাইট থেকে বলা হয়েছে, “সৌদি আরবে আনুষ্ঠানিকভাবে অর্ধচন্দ্রের দেখা মিলেছে। ফলে আজ রাত থেকে ১৪৪৭ হিজরির পবিত্র রমজান মাস শুরু।” “তারা […]

সৌদিতে চাঁদ দেখা গেছে, কাল থেকে রোজা শুরু

ছবি সংগৃহীত

নিউজ ডেস্ক

১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০২:৩৮

সৌদি আরবে ১৪৪৭ হিজরি সনের পবিত্র রমজান মাসের চাঁদ দেখা গেছে। আজ মঙ্গলবার সন্ধ্যায় দেশটির সরকার পবিত্র রমজান মাস শুরুর ঘোষণা দিয়েছে। তারা বলেছে, চাঁদের দেখা মেলায় কাল বুধবার প্রথম রোজা হবে।

‘হারামাইন’ নামে ওয়েবসাইট থেকে বলা হয়েছে, “সৌদি আরবে আনুষ্ঠানিকভাবে অর্ধচন্দ্রের দেখা মিলেছে। ফলে আজ রাত থেকে ১৪৪৭ হিজরির পবিত্র রমজান মাস শুরু।”

“তারা আরও বলেছে, মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের সিয়াম, কিয়াম এবং ইবাদত কবুল করুক। এবং তিনি যেন আমাদের এই বরকতময় মাসের মূল্যবান মুহূর্তগুলোকে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের কাজে ব্যয় করার তাওফিক দান করেন। আমীন।”

ইসলাম ও জীবন

এবার শায়খ আহমাদুল্লাহর ভিসা বাতিল করলো অস্ট্রেলিয়া

জনপ্রিয় ধর্মীয় বক্তা মাওলানা ড. মিজানুর রহমান আজহারির পর এবার বাংলাদেশের বিশিষ্ট ইসলামি ব্যক্তিত্ব শায়খ আহমাদুল্লাহর ভিসা আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করেছে অস্ট্রেলিয়া সরকার। স্থানীয় সময় রোববার (৫ এপ্রিল) দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। হিটলারের প্রশংসা, ইহুদিবিদ্বেষী ও উগ্রবাদী প্রচারণার অভিযোগে আজহারিকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করার পরেই অস্ট্রেলিয়া সরকার শায়খ আহমদুল্লাহর বিরুদ্ধে এই কঠোর ব্যবস্থা […]

এবার শায়খ আহমাদুল্লাহর ভিসা বাতিল করলো অস্ট্রেলিয়া

এবার শায়খ আহমাদুল্লাহর ভিসা বাতিল করলো অস্ট্রেলিয়া

নিউজ ডেস্ক

০৬ এপ্রিল ২০২৬, ১০:০৯

জনপ্রিয় ধর্মীয় বক্তা মাওলানা ড. মিজানুর রহমান আজহারির পর এবার বাংলাদেশের বিশিষ্ট ইসলামি ব্যক্তিত্ব শায়খ আহমাদুল্লাহর ভিসা আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করেছে অস্ট্রেলিয়া সরকার। স্থানীয় সময় রোববার (৫ এপ্রিল) দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

হিটলারের প্রশংসা, ইহুদিবিদ্বেষী ও উগ্রবাদী প্রচারণার অভিযোগে আজহারিকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করার পরেই অস্ট্রেলিয়া সরকার শায়খ আহমদুল্লাহর বিরুদ্ধে এই কঠোর ব্যবস্থা নিলো।

খবরে জানা গেছে, সিডনি বিমানবন্দর দিয়ে শায়খ আহমাদুল্লাহ অস্ট্রেলিয়া ত্যাগের প্রস্তুতি নেওয়ার সময় তার ভিসা বাতিলের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসে।

অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসন বিষয়ক সহকারী মন্ত্রী ম্যাট থিসলেথওয়েট এই সিদ্ধান্তের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, ইহুদিবিদ্বেষী বা ইসলামোফোবিক বক্তব্যকারীদের প্রতি অস্টেলিয়া সরকারের কোনো সহনশীলতা নেই।

এ ছাড়া ডেইলি টেলিগ্রাফ শায়খ আহমদুল্লাহর ভিসা বাতিলের খবর নিয়ে প্রতিবেদনে প্রকাশ করেছে। তাতে বলা হয়েছে, শায়খ আহমদুল্লাহ অতীতে ইহুদিদের ঘৃণ্য বলে উল্লেখ করেছিলেন এবং বিশ্বব্যাপী অস্থিরতার জন্য ইহুদিদের দায়ী করেন।

(আইপিডিসি)-এর ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত ‘লিগ্যাসি অব ফেইথ’ কর্মসূচিতে অংশ নিতে শায়খ আহমদুল্লাহ সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়া সফরে যান। সফরের অংশ হিসেবে তিনি প্রথমে মেলবোর্নে পৌঁছে প্রবাসী বাংলাদেশিদের উদ্দেশে একটি ভিডিও বার্তা দেন।

মিজানুর রহমান আজহারির ভিসা বাতিল করলো অস্ট্রেলিয়া মিজানুর রহমান আজহারির ভিসা বাতিল করলো অস্ট্রেলিয়া
তার ৩ এপ্রিল মেলবোর্নের আল-তাকওয়া কলেজ, ৪ এপ্রিল সিডনির ডায়মন্ড ভেন্যুতে প্রধান কনভেনশন, ৬ এপ্রিল ক্যানবেরার ন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টার, ১০ এপ্রিল অ্যাডিলেডের উডভিল টাউন হল এবং ১১ এপ্রিল পার্থে ধারাবাহিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করার কথা ছিল।

তবে এসব অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করার আগেই আজহারির মতো তাকেও অস্ট্রেলিয়া ছাড়তে হলো।

ইসলাম ও জীবন

ঐতিহাসিক বদর দিবস আজ, ইসলামের প্রথম বিজয়

রমজানের নীরব আকাশের নিচে ইতিহাসের কিছু দিন এমন আছে, যেগুলো কেবল ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ নয়, বরং একটি জাতির আত্মপরিচয়ের দীপ্ত অধ্যায়। মুসলিম ইতিহাসে তেমনই এক দিন বদর দিবস। মরুপ্রান্তরের এক অনাড়ম্বর ভূমিতে সংঘটিত সেই ঘটনাটি কেবল একটি যুদ্ধের কাহিনি নয়, এটি ঈমানের দৃঢ়তা, নৈতিক সাহস এবং আল্লাহর উপর অবিচল আস্থার এক অনন্য দলিল। হিজরি দ্বিতীয় […]

নিউজ ডেস্ক

০৭ মার্চ ২০২৬, ১৩:২২

রমজানের নীরব আকাশের নিচে ইতিহাসের কিছু দিন এমন আছে, যেগুলো কেবল ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ নয়, বরং একটি জাতির আত্মপরিচয়ের দীপ্ত অধ্যায়।

মুসলিম ইতিহাসে তেমনই এক দিন বদর দিবস। মরুপ্রান্তরের এক অনাড়ম্বর ভূমিতে সংঘটিত সেই ঘটনাটি কেবল একটি যুদ্ধের কাহিনি নয়, এটি ঈমানের দৃঢ়তা, নৈতিক সাহস এবং আল্লাহর উপর অবিচল আস্থার এক অনন্য দলিল।

হিজরি দ্বিতীয় সনের ১৭ রমজান। আরবের উত্তপ্ত বালুকাময় ভূমিতে মদিনা থেকে অগ্রসর হচ্ছিলেন নবী করিম সা. এবং তার অল্পসংখ্যক সাহাবি। তাদের সংখ্যা মাত্র তিন শতাধিক ইতিহাসে যাদের পরিচয় বদরী সাহাবি নামে অমর হয়ে আছে।

অপরদিকে মক্কার কুরাইশরা এসেছিল প্রায় এক হাজার যোদ্ধার সুসজ্জিত বাহিনী নিয়ে। অস্ত্র, অশ্বারোহী শক্তি এবং সামরিক প্রস্তুতিতে তারা ছিল বহুগুণ শক্তিশালী। কিন্তু সেই অসম বাস্তবতার মাঝেও মুসলমানদের হৃদয়ে ছিল এক অদৃশ্য শক্তি ঈমানের দীপ্তি এবং আল্লাহর প্রতি পূর্ণ নির্ভরতা।

মদিনা থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ঐতিহাসিক প্রান্তর এ এসে মুখোমুখি দাঁড়ায় দুই শক্তি একদিকে অহংকার ও ক্ষমতার প্রাচুর্য, অন্যদিকে সত্য ও বিশ্বাসের অটল প্রত্যয়। ইসলামের ইতিহাসে এই দিনটিকে বলা হয়েছে ইয়াওমুল ফুরকান সত্য ও মিথ্যার পার্থক্যের দিন।

যুদ্ধের প্রাক্কালে নবী মুহাম্মদ সা. গভীর আকুতিতে আল্লাহর দরবারে দোয়া করেছিলেন। ইতিহাসের বর্ণনায় আছে, তিনি দু’হাত উঁচু করে প্রার্থনা করেছিলেন যদি এই ক্ষুদ্র দলটি আজ পরাজিত হয়, তবে পৃথিবীতে আল্লাহর ইবাদতকারী আর কেউ অবশিষ্ট থাকবে না। সেই মুহূর্তে তার দোয়ার আবেগ, সাহাবিদের অটল আস্থা এবং মরুর নিস্তব্ধতার ভেতর এক আধ্যাত্মিক আবহ সৃষ্টি হয়েছিল, যা মুসলিম চেতনার ইতিহাসে এক অনন্য দৃশ্য হয়ে আছে।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা সেই দিনটির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, “আল্লাহ তো বদরের যুদ্ধে তোমাদের সাহায্য করেছিলেন, অথচ তোমরা ছিলে দুর্বল।”

এই আয়াত শুধু একটি বিজয়ের স্মৃতি নয়, এটি মুসলিম সভ্যতার এক গভীর দার্শনিক সত্যকে তুলে ধরে মানবিক শক্তির সীমাবদ্ধতার ওপরে আছে ঈমানের শক্তি এবং আল্লাহর সাহায্য। ইসলামী ঐতিহ্যে বলা হয়, সেই যুদ্ধে ফেরেশতাদের সহায়তা নেমে এসেছিল, যা বদরের বিজয়কে কেবল সামরিক সাফল্য নয়, বরং আধ্যাত্মিক জয়ের প্রতীক করে তুলেছে।

বদরের বিজয় মুসলিম সমাজের জন্য ছিল এক ঐতিহাসিক মোড়। মক্কায় দীর্ঘ নির্যাতন ও বঞ্চনার ইতিহাস পেরিয়ে মদিনায় নবগঠিত মুসলিম সমাজ তখনো ছিল নাজুক অবস্থায়। কিন্তু এই বিজয় তাদের আত্মবিশ্বাসকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেয়। আরবের রাজনৈতিক বাস্তবতায় মুসলমানদের উপস্থিতি তখন আর উপেক্ষা করার মতো ছিল না। বদরের মরুপ্রান্তরেই যেন ইতিহাস প্রথমবারের মতো ঘোষণা করেছিল একটি নতুন সভ্যতার সূচনা হয়েছে।

তবে বদরের প্রকৃত মাহাত্ম্য কেবল বিজয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। যুদ্ধশেষে নবী করিম সা. বন্দিদের প্রতি যে মানবিক আচরণ প্রদর্শন করেছিলেন, তা ইতিহাসে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।

অনেক বন্দিকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল শিক্ষাদানের বিনিময়ে যা প্রমাণ করে, ইসলামের নৈতিকতা যুদ্ধের উত্তেজনাকেও অতিক্রম করে মানবতার মর্যাদাকে অগ্রাধিকার দেয়।

আজও রমজানের দিনগুলো যখন ফিরে আসে, মুসলিম হৃদয়ে বদর দিবস নতুন করে জেগে ওঠে। এটি কেবল অতীতের একটি যুদ্ধকে স্মরণ করা নয়, বরং একটি আদর্শকে পুনরুজ্জীবিত করা যেখানে সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর সাহস, ন্যায়ের জন্য আত্মত্যাগ এবং আল্লাহর প্রতি অবিচল আস্থা একত্রে ইতিহাস রচনা করে।

বদরের মরুপ্রান্তরে যে আলোকরেখা উদিত হয়েছিল, তা পরবর্তীকালে সমগ্র আরব উপদ্বীপ পেরিয়ে বিশ্বসভ্যতার দিগন্তে ছড়িয়ে পড়ে। সেই আলো আজও মুসলিম উম্মাহকে স্মরণ করিয়ে দেয় সংখ্যা নয়, সম্পদ নয়, বরং ঈমান, আদর্শ এবং নৈতিক দৃঢ়তাই ইতিহাসের গতিপথ পরিবর্তনের প্রকৃত শক্তি।

বদর তাই কেবল অতীতের একটি ঘটনা নয়, এটি মুসলিম চেতনার এক চিরন্তন প্রতীক যেখানে মরুর নীরবতার মধ্যেই প্রথমবারের মতো উচ্চারিত হয়েছিল এক নতুন ইতিহাসের সূচনা।

লেখক: শিক্ষার্থী আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়,কায়রো, মিশর