তেহরান-ইরাক সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হচ্ছে: শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তি, বাণিজ্য ও ভূরাজনীতিতে একসাথে আগাতে চায় দুই প্রতিবেশী দেশ
তেহরানে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় তেহরান ডায়ালগ ফোরামে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও ইরাকের উপ-প্রধানমন্ত্রী ফুয়াদ হুসেইনের মধ্যে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক, প্রযুক্তি বিনিময় ও আঞ্চলিক সহযোগিতা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। বৈঠকে উভয় দেশ অর্থনীতি, জ্বালানি ও নিরাপত্তাকে কেন্দ্র করে একটি দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্ব গড়ার প্রতিশ্রুতি দেয়।
সভায় প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান বলেন, “আমাদের কারও অনুমতির প্রয়োজন নেই। ইরান এগিয়ে যাবে নিজের সক্ষমতায়।” তিনি শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তি, বিশেষ করে চিকিৎসা ও কৃষি খাতে, মুসলিম প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে শেয়ার করার আগ্রহ প্রকাশ করেন। তেহরানের এ অবস্থান ইরানের ‘প্রতিরোধ অর্থনীতি’ নীতিরই সম্প্রসারিত প্রকাশ, যা মার্কিন নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে স্বনির্ভরতার দিকে এগিয়ে যাওয়ার কৌশল হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে।
বৈঠকে ইরাকি উপ-প্রধানমন্ত্রী ফুয়াদ হুসেইন বলেন, “ইরান ও ইরাকের মধ্যে বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক ক্রমেই প্রসারিত হচ্ছে।” তিনি জানান, দুটি দেশ বর্তমানে বার্ষিক বাণিজ্য ২৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্যে কাজ করছে, যার জন্য অবকাঠামোগত সংযোগ, যৌথ শিল্প অঞ্চল এবং জ্বালানি সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তেহরান-ইরাক সম্পর্ককে ঘিরে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ প্রকল্পগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে শালামচে–বসরা রেলপথ। সম্প্রতি চূড়ান্ত হওয়া এই প্রকল্প মধ্যপ্রাচ্যের দুই প্রতিবেশীর মধ্যে পণ্য ও যাত্রী চলাচল বাড়াবে, যা ইরানের চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI) এবং নিজের পূর্ব-পশ্চিম করিডর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, ইরান বর্তমানে ইরাকের সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহকারী দেশ। ইরাকের ১৪,০০০ মেগাওয়াট দৈনিক বিদ্যুৎ চাহিদার মধ্যে প্রায় ৪৫ শতাংশই আসে ইরান থেকে। কিন্তু এই শক্তিশালী সহযোগিতার মধ্যেও একটি বড় প্রতিবন্ধক হয়ে আছে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও রাজনৈতিক চাপ। ২০২4 সালের মার্চে যুক্তরাষ্ট্র ইরাককে দেওয়া ইরান থেকে বিদ্যুৎ আমদানির নিষেধাজ্ঞা অব্যাহতি বাতিল করে। যদিও পরে অল্প সময়ের জন্য নতুনভাবে অনুমতি দেওয়া হয়, কিন্তু এই ধরনের অস্থির নীতির ফলে দুই দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সহযোগিতা বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
ইরান ও ইরাকের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদারিত্ব শুধু দ্বিপাক্ষিক স্তরে সীমাবদ্ধ নয়; এটি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন প্রভাবের বাইরে একটি বিকল্প আঞ্চলিক জোটের সম্ভাবনাও জাগিয়ে তুলছে। ইরাকের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ শিয়া আল-সুদানির ঘন ঘন তেহরান সফর এবং শীর্ষ পর্যায়ের প্রতিনিধি দলের গমনাগমন এরই ইঙ্গিত দেয়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এ সম্পর্ক শুধু বাণিজ্যিক নয়, এটি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন শক্তি ভারসাম্য গড়ে তোলার প্রচেষ্টার অংশ। ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের চাপ উপেক্ষা করে তেহরান ও বাগদাদ নিজেদের কৌশলগত স্বার্থ রক্ষায় ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে যেতে চায়।
এই প্রেক্ষাপটে, মাসুদ পেজেশকিয়ানের নেতৃত্বে নতুন ইরান সরকার যে বহুপাক্ষিক কূটনীতি ও প্রতিবেশী সহযোগিতা বাড়ানোর সংকল্প দেখাচ্ছে, তা শুধু ইরান-ইরাক নয়, বরং গোটা অঞ্চলের ভূরাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের বার্তা দিচ্ছে। শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তির অংশীদারিত্ব, যৌথ অর্থনৈতিক অঞ্চল, অবকাঠামোগত সংযোগ এবং মার্কিন একচেটিয়া নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে একযোগে অবস্থান—সব মিলিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক এখন শুধু ঐতিহাসিক নয়, কৌশলগত দিক থেকেও এক নতুন স্তরে উত্তরণ ঘটাতে চলেছে।
তুরস্ক, সৌদি ও পাকিস্তানসহ অন্যান্য দেশ নিয়ে ইসলামি সেনাবাহিনী গড়ার উদ্যোগ নিয়েছে ইরান। আপনি কি এই আর্মি গঠনের পক্ষে?