রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) বর্তমান কমিটি দায়িত্ব নেওয়ার পর ১০ মাসে ৪২টি কর্মসূচিতে তহবিল থেকে ১ কোটি ২৯ লাখ ১৪ হাজার ৬৮৯ টাকা ব্যয় করেছে। এর মধ্যে তিনটি কর্মসূচি এখনো চলমান থাকলেও বাকি ৩৯টি ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। তবে এসব কর্মসূচির বিপরীতে ৬১ লাখ ৫০ হাজার ৪৬৮ টাকার বিল বা ভাউচার এখনো জমা দেননি সংশ্লিষ্ট সম্পাদকরা।
নিয়ম অনুযায়ী, কোনো কর্মসূচি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যয়ের ভাউচার জমা দিয়ে হিসাব সমন্বয় করার কথা। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে ভাউচার জমা না দেওয়ায় বিষয়টি নিয়ে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি কোষাধ্যক্ষ কার্যালয়ের নথি বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
জিএসের ১৮ লাখ টাকার হিসাব জমা হয়নি
রাকসুর সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করেছেন জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার। তিনি সাত ধাপে মোট ২৩ লাখ ৮৮ হাজার টাকা নিয়েছেন। এর মধ্যে ১৮ লাখ ৩৯ হাজার টাকার ব্যয়ের ভাউচার এখনো জমা পড়েনি।
এ বিষয়ে জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার বলেন, ভর্তি পরীক্ষার বুথ স্থাপনের জন্য প্রাথমিকভাবে ৩ লাখ ২ হাজার টাকা বাজেট ধরা হয়েছিল। পরে ব্যয়ের সঙ্গে ভ্যাট যুক্ত হওয়ার বিষয়টি জানা না থাকায় হিসাব সমন্বয়ে কিছুটা জটিলতা তৈরি হয়েছে। ছাত্র সংসদ সদস্যদের জন্য নেওয়া ১৩ লাখ ৭৭ হাজার টাকার মধ্যে বিজ্ঞান সম্পাদকের হিসাব না পাওয়ায় ওই বিল জমা দেওয়া হয়নি। তবে অন্য হিসাবগুলো জমা দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
১৩ লাখ টাকা নিয়ে ভিপির হিসাব জমা ৯৯ হাজারের
ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ ছয় ধাপে মোট ১৩ লাখ ৪০ হাজার ৩২৪ টাকা নিয়েছেন। এর মধ্যে ১২ লাখ ৪০ হাজার ৪০০ টাকার হিসাব এখনো জমা দেননি তিনি।
নথি অনুযায়ী, গত ১৩ এপ্রিল দাপ্তরিক খরচ বাবদ দেড় লাখ টাকা নেওয়ার পর এর হিসাব সমন্বয় না করেই ১৯ জুলাই আবার ২ লাখ টাকা নিয়েছেন ভিপি।
মোস্তাকুর রহমান জাহিদ বলেন, সব বিল জমা দেওয়া হয়নি—বিষয়টি এমন নয়। দ্রুত হিসাব জমা দেওয়া ভালো, তবে মেয়াদের মধ্যে জমা দিলেও হবে। তাদের মেয়াদ শেষ হতে এখনো ৬০ দিন বাকি রয়েছে।
দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যয় ক্রীড়া সম্পাদকের
জিএসের পর রাকসুর তহবিল থেকে সবচেয়ে বেশি অর্থ নিয়েছেন ক্রীড়া সম্পাদক মোছা. নার্গিস খাতুন। তিনি সাত ধাপে ১৫ লাখ ৭১ হাজার ৬২৬ টাকা নিয়েছেন। এর মধ্যে ১৩ লাখ ৯৭ হাজার ১২৬ টাকার ভাউচার এখনো জমা পড়েনি।
নার্গিস খাতুন জানান, গত মাসে শুরু হওয়া ‘রাকসু গেমস’-এর ছয়টি কর্মসূচি এখনো চলমান থাকায় এসব ব্যয়ের বিল জমা দেওয়া হয়নি।
অন্য সম্পাদকদের ব্যয়ের চিত্র
বিতর্ক ও সাহিত্য সম্পাদক ইমরান লস্কর ছয় ধাপে ৮ লাখ ৪২ হাজার ৭৬৫ টাকা নিয়েছেন। এর মধ্যে দুটি ভাউচার জমা দিয়েছেন তিনি। তার দাবি, বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে সমন্বয় করে বাজেট বাস্তবায়ন করতে হওয়ায় দুটি কর্মসূচির বিল এখনো জমা দেওয়া সম্ভব হয়নি। দ্রুত তা জমা দেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।
সংস্কৃতি সম্পাদক জাহিদ হোসেন জোহা তিন ধাপে ৭ লাখ ৯৫ হাজার টাকা নিয়েছেন। এর মধ্যে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান উদ্যাপন বাবদ নেওয়া ৪ লাখ ৬৫ হাজার টাকার ভাউচার নিয়ে নথিতে হিসাব নেই। তবে ভাউচার জমা দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছেন তিনি।
তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক বি এম নাজমুল সাকিব তিন ধাপে ৩ লাখ ৯৬ হাজার টাকা নিয়েছেন। তিনি জানান, সর্বশেষ বাজেটের হিসাব এখনো দেওয়া হয়নি এবং দ্রুত বিল জমা দেবেন।
মিডিয়া ও প্রকাশনা সম্পাদক মো. মুজাহিদ ইসলাম তিন ধাপে ১ লাখ ৫৪ হাজার ৪৪৮ টাকা নিয়েছেন। এর মধ্যে প্রকাশনার জন্য নেওয়া ১ লাখ টাকার ভাউচার জমা পড়েনি।
মহিলাবিষয়ক সম্পাদক সায়িদা হাফসা দুই ধাপে ১ লাখ ৮৮ হাজার ২৭৬ টাকা নিয়েছেন। এর মধ্যে ১ লাখ ৩৫ হাজার ৫০০ টাকার হিসাব জমা হয়নি। তিনি দ্রুত তা জমা দেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক তোফায়েল আহমেদ তোফা দুই ধাপে ৮৭ হাজার ৫০০ টাকা নিয়েছেন। এর মধ্যে ৩৭ হাজার ৫০০ টাকার হিসাব জমা পড়েনি।
পরিবেশ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল মাসুদ কোনো খাত উল্লেখ না করে ৮২ হাজার টাকা নিয়েছেন। এ অর্থেরও কোনো হিসাব তিনি জমা দেননি। এ ছাড়া এজিএস এস এম সালমান সাব্বির গত ৫ মার্চ দাপ্তরিক খরচ বাবদ ৬০ হাজার টাকা নিলেও এর হিসাব এখনো জমা দেননি।
‘হিসাব সমন্বয় ছাড়া পরবর্তী টাকা উত্তোলন অনিয়ম’
রাকসুর সাবেক নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক মোস্তফা কামাল আকন্দ বলেন, সরকারি অর্থ অগ্রিম নেওয়া হলে নির্ধারিত সময়ে হিসাব সমন্বয়ের নিয়ম রয়েছে। একটি বিল সমন্বয় করার পরই পরবর্তী ধাপে অর্থ উত্তোলনের সুযোগ থাকার কথা।
তিনি বলেন, আগের বিলের হিসাব সমন্বয় না করেই কোনো সম্পাদক পরবর্তী বিলের অর্থ উত্তোলন করলে সেটিকে আর্থিক অনিয়ম হিসেবে বিবেচনা করা যায়। প্রতিটি সম্পাদকীয় পদের জন্য নির্ধারিত বরাদ্দ থাকা উচিত এবং সব ব্যয়ের হিসাব রাকসুর সভায় উপস্থাপন করতে হবে।
তার মতে, শিক্ষার্থীদের ভুল হতে পারে, তবে এসব বিষয় তদারকি ও অনিয়ম ঠেকানোর দায়িত্ব কোষাধ্যক্ষের।
কোষাধ্যক্ষের স্বীকারোক্তি, নিয়ম মেনে ভাউচার জমার আহ্বান
অনেক বিল এখনো জমা না পড়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন রাকসুর কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক সেতাউর রহমান। তিনি বলেন, কোনো কর্মসূচি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ভাউচার জমা দেওয়া উচিত। সংশ্লিষ্টদের নিয়ম মেনে দ্রুত ভাউচার জমা দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে।
রাকসুর সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম বলেন, প্রতিটি সভায় হিসাবের স্বচ্ছতা বজায় রাখার বিষয়টি মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রতিনিধিরা হিসাব জমা দেওয়ার জন্য সময় চেয়েছেন। তবে রাকসুকে অবশ্যই নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।