আবু তাহের, জাককানইবি
আন্তর্জাতিক নাট্যোৎসব শুধু বিনোদনের আয়োজন নয়, এটি সময়, সমাজ ও ইতিহাসকে নতুন করে দেখার একটি জানালা। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্প্রতি ১২ থেকে ১৮ জুলাই অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক নাট্যোৎসবে ভারত থেকে আগত কাঁকিনাড়া শিল্পাঙ্গন নাট্যসংস্থার পরিবেশিত
‘পঞ্চমীর চাঁদ’ নাটকটি দর্শকদের সামনে সেই জানালাই উন্মুক্ত করেছে। সাদাত হাসান মান্টোর কালজয়ী ছোটগল্প ‘খোল দো’ অবলম্বনে রচিত ও নির্দেশিত এ নাটকটি দেশভাগের নির্মম ইতিহাসকে নতুন ভাষায় মঞ্চে উপস্থাপন করেছে। নাটকটির রচনা ও নির্দেশনায় ছিলেন তুষার রায় ও দীপক নায়েক।
সাদাত হাসান মান্টো তাঁর লেখনীতে দেশভাগের অমানবিকতা, উদ্বাস্তু মানুষের অসহায়ত্ব, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এবং নারীর ওপর নৃশংস নির্যাতনের চিত্র বারবার তুলে ধরেছেন। ‘পঞ্চমীর চাঁদ’ সেই ইতিহাসেরই এক মর্মস্পর্শী পুনর্পাঠ। নাটকটির কেন্দ্রীয় চরিত্র সিরাজউদ্দিন ও তার মেয়ে সাকিনা, যাদের ব্যক্তিগত বেদনা আসলে দেশভাগে ক্ষতবিক্ষত লক্ষ মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে।
নাটকের শুরুতেই দর্শক দেখতে পান একটি ছোট্ট সংসার। অভাব থাকলেও সেখানে ছিল ভালোবাসার প্রাচুর্য। সিরাজউদ্দিনের স্ত্রী আসমা বিবি নিহত হয়েছেন দুর্বৃত্তদের হাতে। তার স্মৃতি, মেয়ের হাসি, বাড়ির নিমগাছ আর ছোট্ট ভিটেমাটিই ছিল সিরাজউদ্দিনের বেঁচে থাকার অবলম্বন। কিন্তু দেশভাগের বিভীষিকা সেই আশ্রয়ও কেড়ে নেয়। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার আগুনে পুড়ে যায় মানুষের পরিচয়, সম্পর্ক এবং বিশ্বাস।
ভারত-পাকিস্তান বিভক্তির প্রাক্কালে ধর্মের ভিত্তিতে দেশ বেছে নেওয়ার যে নিষ্ঠুর বাস্তবতা তৈরি হয়েছিল, তারই প্রেক্ষাপটে সিরাজউদ্দিন ও সাকিনা ট্রেনে চড়ে পাকিস্তানের উদ্দেশে যাত্রা করে। কিন্তু বিশৃঙ্খলার মধ্যেই হারিয়ে যায় সাকিনা। বাবার কাছে থেকে যায় শুধু একটি ওড়না, একটি স্মৃতি, একটি প্রতীক।
এরপর শুরু হয় দুই সমান্তরাল যাত্রা। একদিকে বাবা সিরাজউদ্দিন ক্যাম্পে ক্যাম্পে ঘুরে মেয়েকে খুঁজে ফেরেন; অন্যদিকে সাকিনা খুঁজতে থাকে তার ‘আব্বু’কে। কিন্তু সে যে পৃথিবীতে এসে পড়ে, সেখানে মানুষের মুখে আর ভরসা নেই। নির্যাতন, প্রতারণা ও অবিশ্বাস তাকে গ্রাস করে। অবশেষে সে হয়ে ওঠে যুদ্ধ ও দেশভাগের সবচেয়ে নির্মম বাস্তবতার শিকার, নারীর প্রতি সহিংসতার এক নীরব সাক্ষ্য।
নাটকের সবচেয়ে শক্তিশালী মুহূর্তটি আসে শেষ দৃশ্যে। হাসপাতালে জীবিত অবস্থায় সাকিনাকে খুঁজে পান সিরাজউদ্দিন। কিন্তু শারীরিকভাবে বেঁচে থাকলেও মানসিকভাবে সে যেন বহু আগেই হারিয়ে গেছে। ‘খোল দো’এই দুটি শব্দ তার কাছে আর কোনো সাধারণ নির্দেশ নয়; এটি হয়ে উঠেছে ভয়, নির্যাতন ও হারিয়ে যাওয়া বিশ্বাসের প্রতিধ্বনি। যখন সে নিজের বাবাকেও চিনতে পারে না, তখন সিরাজউদ্দিনের আর্তনাদ- “আমি শুধু পুরুষ না রে, আমি তোর বাপ” দর্শকদের হৃদয় বিদীর্ণ করে।
‘পঞ্চমীর চাঁদ’ কেবল একটি নাটক নয়; এটি ইতিহাসের মুখোমুখি দাঁড়ানোর সাহস। এটি মনে করিয়ে দেয়, দেশভাগ শুধু ভূখণ্ডের বিভাজন ছিল না, এটি ছিল মানুষের স্বপ্ন, সম্পর্ক ও মানবিকতারও বিভাজন। সাত দশক পরও সেই ক্ষত রয়ে গেছে আমাদের সম্মিলিত স্মৃতিতে।
বর্তমান বিশ্বে যখন ধর্ম, জাতি ও পরিচয়ের প্রশ্নে নতুন নতুন সংঘাত তৈরি হচ্ছে, তখন ‘পঞ্চমীর চাঁদ’ আমাদের একটি জরুরি প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়; মানুষ কি সত্যিই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়? নাটকটির সবচেয়ে বড় সাফল্য এখানেই যে, এটি দর্শককে শুধু কাঁদায় না, ভাবতেও বাধ্য করে।
দেশভাগের বেদনা, নারীর প্রতি সহিংসতা এবং মানবতার চিরন্তন আবেদন, সবকিছুর সম্মিলনে ‘পঞ্চমীর চাঁদ’ হয়ে উঠেছে এক অনন্য মঞ্চনির্মাণ। আন্তর্জাতিক নাট্যোৎসবের মঞ্চে এর উপস্থাপনা প্রমাণ করেছে, ভালো নাটক কখনও সীমান্ত মানে না; বরং মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে যায়, ইতিহাসের গভীরতম ক্ষতকে স্পর্শ করে।