পটুয়াখালী-৩ (দশমিনা–গলাচিপা) আসনে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়–পরাজয়ের চূড়ান্ত নিয়ামক হয়ে উঠেছে স্থানীয় আওয়ামী লীগের ভোট। দলীয়ভাবে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকলেও তাদের ভোটার ও সমর্থকদের অবস্থানই নির্ধারণ করবে কে হচ্ছেন পরবর্তী সংসদ সদস্য—এমনটাই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
এই বাস্তবতায় আওয়ামী ভোটারদের কাছে টানতে মাঠে জোর প্রচারণা চালাচ্ছেন বিএনপি সমর্থিত গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি ও ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নূর এবং বিএনপি থেকে পদত্যাগ করা কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি হাসান মামুন। দুই প্রার্থীই প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের নিরাপত্তা ও পাশে থাকার আশ্বাস দিচ্ছেন।
এদিকে আওয়ামী লীগ সমর্থক ভোটাররাও নুরুল হক নূর ও হাসান মামুন—এই দুই প্রার্থীর পক্ষে বিভক্ত হয়ে বিভিন্ন মিছিল, পথসভা ও সমাবেশে অংশ নিচ্ছেন। ফলে নির্বাচনী মাঠে বাড়ছে উত্তাপ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, স্বাধীনতার পর অনুষ্ঠিত প্রায় সব সুষ্ঠু নির্বাচনে পটুয়াখালী-৩ আসনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীরাই জয়লাভ করেছেন। এ কারণেই এই আসনটি দীর্ঘদিন ধরে ‘আওয়ামী লীগের দুর্গ’ হিসেবে পরিচিত।
সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের গোলাম মাওলা রনি ১ লাখ ২০ হাজার ১০ ভোট পেয়ে জয়লাভ করেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির শাহজাহান খান পেয়েছিলেন ৬১ হাজার ৪২৩ ভোট। এছাড়া ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০১৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের আ খ ম জাহাঙ্গীর হোসাইন এবং ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে এস এম শাহজাদা বিজয়ী হন।
অভিজ্ঞ মহলের ধারণা, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী না থাকায় দলটির ভোটার ও সমর্থকরা যে প্রার্থীকে ভোট দেবেন, তার জয়ের সম্ভাবনাই বেশি।
আওয়ামী ভোটারদের মন জয় করতে দুই প্রধান প্রার্থীই ব্যাপক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। চায়ের দোকান, পাড়া-মহল্লা, হাট-বাজারসহ পুরো দশমিনা ও গলাচিপা এলাকায় চলছে আলোচনা-সমালোচনা ও চুলচেরা বিশ্লেষণ। এই প্রথম সংসদ সদস্য পদে নির্বাচন করছেন নুরুল হক নূর ও হাসান মামুন।
নৌকা ও ধানের শীষবিহীন এই নির্বাচনে ট্রাক প্রতীক নিয়ে নুরুল হক নূর এবং ঘোড়া প্রতীক নিয়ে হাসান মামুনের প্রচার-প্রচারণায় পুরো আসনে সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনা। ভোটারদের ভাষ্য, বরিশাল বিভাগের সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হতে যাচ্ছে পটুয়াখালী-৩ আসনে।
নুরুল হক নূর ও হাসান মামুন দুজনেই বিভিন্ন পথসভায় দাবি করছেন, পটুয়াখালী-৩ আসনের দিকে তাকিয়ে আছে পুরো দেশ। জয়ের ব্যাপারে দুজনই আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
এ ছাড়া এই আসনে নির্বাচনী মাঠে শক্ত অবস্থানে রয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর সাবেক জেলা আমীর ও বরিশাল বিভাগীয় অঞ্চল টিম সদস্য অধ্যাপক মু. শাহ আলম (দাঁড়িপাল্লা) এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মনোনীত প্রার্থী ও কেন্দ্রীয় যুব আন্দোলনের প্রচার ও প্রচারণা সম্পাদক আবু বকর সিদ্দিক (হাতপাখা)। তাঁরাও জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী এবং আওমীলীগের ভোট তাঁদের পক্ষে যাবে বলে মনে করছেন।
সব মিলিয়ে পটুয়াখালী-৩ আসনে এবার হাড্ডাহাড্ডি ও বহুমুখী লড়াই হবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
এই আসনে মোট পাঁচজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। অন্যজন হলেন, স্বতন্ত্র প্রার্থী অ্যাডভোকেট ফজলুল হক (জাহাজ)।
পটুয়াখালী-৩ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৭৫ হাজার ৮৭১ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৮৯ হাজার ২০ জন, নারী ভোটার ১ লাখ ৮৬ হাজার ৮৪৮ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ৩ জন। মোট ভোটকেন্দ্র ১২৪টি, যার মধ্যে ৮০টি কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে প্রশাসন। গলাচিপায় ৬১টি এবং দশমিনায় ১৯টি কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ।
দশমিনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম জানান, সব ভোটকেন্দ্র কঠোর নিরাপত্তার আওতায় থাকবে এবং ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
গলাচিপা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান জানান, ঝুঁকিপূর্ণ ও চরাঞ্চলের কেন্দ্রগুলোতে কয়েক স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে, যাতে ভোটাররা নির্বিঘ্নে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন।