১১টি ভাটার মধ্যে দুটির লাইসেন্স আছে, বাকি ৯টির নেই; ২০২৪ সালে ২৮ লাখ টাকা জরিমানা, তবু চলছে ইট পোড়ানো
আইন আছে, অভিযানও হয়। অভিযানে জরিমানার মুখেও পড়তে হয় ইটভাটার মালিকদের। কিন্তু তাতেও বন্ধ হচ্ছে না ইট পোড়ানো। নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলায় পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়াই চলছে ১১টি ইটভাটা। এর মধ্যে দুটির লাইসেন্স থাকলেও বাকি ৯টির লাইসেন্সও নেই।
আবাসিক ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার পাশে এসব ভাটার ধোঁয়ায় দূষিত হচ্ছে পরিবেশ। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষিজমি, বাড়ছে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি। অন্যদিকে ইট ও মাটি পরিবহনে ব্যবহৃত ভারী যানবাহনের চাপে ভাঙছে পাকা সড়ক। বারবার অভিযান ও জরিমানার পরও ভাটাগুলোর কার্যক্রম বন্ধ না হওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।
সরেজমিনে জানা গেছে, গুরুদাসপুর উপজেলায় মোট ১১টি ইটভাটা রয়েছে। এর মধ্যে দুটি ভাটার লাইসেন্স থাকলেও পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেই। ওই দুটি ভাটার ছাড়পত্রের ব্যবস্থা করতে জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কার্যালয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া নেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে বাকি ৯টি ইটভাটার লাইসেন্স ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র—কোনোটিই নেই।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ইটভাটার চিমনি থেকে নির্গত ধোঁয়া আশপাশের বসতবাড়ি ও জনপদে ছড়িয়ে পড়ছে। এতে বায়ুদূষণের পাশাপাশি শ্বাসকষ্টসহ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্ক ব্যক্তিরা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। ভাটার কাছাকাছি থাকা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার মানুষও দূষণের প্রভাব থেকে রেহাই পাচ্ছেন না। ধোঁয়ার কারণে আশপাশের ফসলি জমিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
পরিবেশদূষণের পাশাপাশি কৃষিজমির মাটি ব্যবহার নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, তিন ফসলি জমির উপরিভাগের উর্বর মাটি কেটে ইট তৈরির কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। কোথাও কোথাও জ্বালানি হিসেবে পোড়ানো হচ্ছে কাঠ। এ ছাড়া ইট ও মাটি বহনকারী ট্রাক্টর-ট্রলির অবাধ চলাচলে উপজেলার বিভিন্ন পাকা সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩-এর সংশোধিত বিধান অনুযায়ী, নির্ধারিত নিষিদ্ধ এলাকায় ইটভাটা স্থাপন করা যায় না। একই সঙ্গে ইটভাটায় জ্বালানি হিসেবে কাঠ ব্যবহার এবং কৃষিজমি, পুকুর, নদী, খাল ও জলাভূমি থেকে মাটি সংগ্রহ করে ইট তৈরির কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।
উপজেলা কৃষি কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর পুকুর খননের কারণে গুরুদাসপুরে ১২০ হেক্টর তিন ফসলি জমির পরিমাণ কমেছে। এসব জমিতে ধান, পাট, গম, সরিষাসহ বিভিন্ন ফসল ও সবজির আবাদ হতো। জমির পরিমাণ কমে যাওয়ায় ধানের উৎপাদন প্রায় ১০০ টন হ্রাস পেয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ইটভাটার জন্য কৃষিজমির উপরিভাগের মাটি ব্যবহারের অভিযোগ কৃষি উৎপাদন নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে প্রশাসনের অভিযানেও কার্যক্রম বন্ধে স্থায়ী ফল আসেনি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। সর্বশেষ ২০২৪ সালের শেষ দিকে সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় পরিচালিত এক অভিযানে উপজেলার অনুমোদনহীন ৯টি ইটভাটাকে মোট ২৮ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। তবে জরিমানার পরও ভাটাগুলোর উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। স্থানীয়দের অভিযোগ, অভিযান শেষ হওয়ার কিছুদিন পরই আবার শুরু হয় ইট পোড়ানো। ফলে জরিমানা করেও অবৈধ ভাটার কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, উপজেলার ১১টি ইটভাটার মধ্যে পাঁচটি রয়েছে পৌর এলাকার আবাসিক অঞ্চলে। এগুলো হলো চাঁচকৈড়ের মোশাররফ হোসেনের মেসার্স এমবিপি ব্রিকস, আব্দুস সালাম সবুজের মেসার্স একেবি ব্রিকস, জহুরুল সোনারের মেসার্স এমডিআর ব্রিকস, জাহাঙ্গীর সোনারের মেসার্স এমডিএস ব্রিকস এবং আমজাদ-মফিজের মেসার্স এএমবি ব্রিকস।
এ ছাড়া সাহাপুরে রয়েছে আজাহার প্রামাণিকের মেসার্স এইচবিবি ব্রিকস, আজাহার বালুর মেসার্স এইচআরবি ব্রিকস, কাদের হাজীর মেসার্স এইচকেবি ব্রিকস ও মজনু সরদারের মেসার্স এমএসবি ব্রিকস। হাজীর হাটে জাহিদুল ইসলামের মেসার্স এমডিপি ব্রিকস এবং চন্দ্রপুরে রেজাউল হাসান রানার মেসার্স আরআরবি ব্রিকস অবস্থিত।
স্থানীয় বাসিন্দা মাসুদ রানা, জবতুল্লাহ মণ্ডল, জাহের প্রামাণিক, সুজাউদ্দৌলা সুজন, কৃষক রফিকুল ইসলাম ও শফিকুল ইসলাম বলেন, প্রতিবছর ইটভাটাগুলোতে অভিযান চালিয়ে জরিমানা করা হলেও পরিস্থিতির পরিবর্তন হয় না। কিছুদিন পর আবারও শুরু হয় ইট উৎপাদন। তাঁদের অভিযোগ, জরিমানা দিয়েই ভাটামালিকেরা ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। অবৈধ ভাটাগুলোর কার্যক্রম স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে তাঁরা কঠোর আইনি পদক্ষেপের দাবি জানান।
উপজেলা ইটভাটা মালিক সমিতির সভাপতি মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘১১টি ইটভাটার মধ্যে দুটির লাইসেন্স রয়েছে। তবে কোনো ভাটারই পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেই।’ এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলে মুঠোফোনে বক্তব্য না দিয়ে সরাসরি সাক্ষাতে কথা বলবেন বলে জানান তিনি।
অন্যদিকে লাইসেন্স থাকা মেসার্স আরআরবি ব্রিকসের মালিক রেজাউল হাসান রানা ও মেসার্স এমডিপি ব্রিকসের মালিক জাহিদুল ইসলাম বলেন, তাঁরা সরকারি নিয়ম মেনে ইটভাটা পরিচালনা করছেন। তাঁদের লাইসেন্স রয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্রের জন্য জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তাঁরা। তাঁদের দাবি, বাকি ৯টি ইটভাটার কোনো অনুমোদন নেই।
এ বিষয়ে গুরুদাসপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাহমিদা আফরোজ বলেন, ‘ইটভাটা পরিচালনার জন্য নির্দিষ্ট আইন রয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র বা লাইসেন্সবিহীন ইটভাটার বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’