মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রধান শিক্ষক নেই, অথচ পরিচালনা করতে হচ্ছে বিদ্যালয়ের সার্বিক কার্যক্রম। মুন্সীগঞ্জের সরকারি প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর একটি বড় অংশে এমন পরিস্থিতি বিরাজ করছে। জেলার ছয় উপজেলায় ২২৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে।
এসব বিদ্যালয়ের অধিকাংশে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের মাধ্যমে চলছে প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রম। এতে পাঠদান তদারকি, শিক্ষকদের মধ্যে সমন্বয় এবং শিক্ষার মান নিশ্চিত করা নিয়ে জটিলতা তৈরি হচ্ছে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, মুন্সীগঞ্জের ছয় উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ৬১০টি। এর মধ্যে প্রধান শিক্ষক কর্মরত আছেন ৩৮৪টিতে। বাকি ২২৬টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ খালি। অর্থাৎ জেলার প্রায় ৩৭ শতাংশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এ গুরুত্বপূর্ণ পদে কেউ নেই।
উপজেলাভিত্তিক হিসাব বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মুন্সীগঞ্জ সদরের ১১৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৫১টিতে প্রধান শিক্ষক নেই। টঙ্গিবাড়ীর ৯২টি বিদ্যালয়ের মধ্যে শূন্য পদ রয়েছে ২৯টি। সিরাজদিখানের ১২৮টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৪০টি, লৌহজংয়ের ৭৬টির মধ্যে ৩১টি, শ্রীনগরের ১১২টির মধ্যে ৪০টি এবং গজারিয়ার ৮৭টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৩৫টিতে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে।
শুধু প্রশাসনিক কার্যক্রম নয়, প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকার প্রভাব পড়ছে বিদ্যালয়ের পাঠদান ব্যবস্থাপনা নিয়েও। জেলার ৬১০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বর্তমানে পড়াশোনা করছে ১ লাখ ৪৭ হাজার ৫৭৮ জন শিক্ষার্থী। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যমতে, জেলায় শিক্ষার হার ৯২ শতাংশ। এমন পরিস্থিতিতে বিদ্যালয়গুলোতে নেতৃত্ব ও তদারকির ঘাটতি প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
সদর উপজেলার চরবেহেরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক জানান, তাঁদের সন্তানরা ঠিকমতো ক্লাস পাচ্ছে না। একজন শিক্ষককে একই সময়ে একাধিক শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পড়াতে হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় পাঠ গ্রহণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ছে।
শিক্ষাবিদদের মতে, একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা, শিক্ষকদের দায়িত্বের সমন্বয় এবং শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের মান পর্যবেক্ষণের জন্য প্রধান শিক্ষকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন এ পদ শূন্য থাকলে সহকারী শিক্ষকদের ওপর বাড়তি দায়িত্বের চাপ পড়ে।
এতে নিয়মিত পাঠদান ও শিক্ষার্থীদের শিখনপ্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই শূন্য পদগুলো পূরণের পাশাপাশি বিদ্যালয়গুলোতে পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রধান শিক্ষক নিয়োগের বিষয়ে একাধিকবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। তবে উচ্চ আদালতে মামলা ও রিট-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে নিয়োগপ্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান মোল্লা জানান, আগামী সপ্তাহের মধ্যে বিদ্যালয়গুলোতে প্রধান শিক্ষক নিয়োগের কার্যক্রম সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। শূন্য পদগুলোর ৮০ শতাংশে জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষকদের পদোন্নতির মাধ্যমে এবং অবশিষ্ট ২০ শতাংশ পদে সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হবে।
দীর্ঘদিনের এই শূন্যতা কাটিয়ে দ্রুত প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া গেলে বিদ্যালয়গুলোর প্রশাসনিক কার্যক্রমে গতি আসবে এবং পাঠদান তদারকি আরও কার্যকর হবে বলে সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা।