জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে রাজি না হওয়ায় এবং পরে সাঈদীর পক্ষে সাক্ষ্য দেওয়ায় ‘গুম’ ও ‘নির্যাতনের শিকার’ হওয়ার অভিযোগ করেছেন সুখরঞ্জন বালী।
চৌদ্দ বছর আগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর পক্ষে সাফাই সাক্ষ্য দিতে এসে ট্রাইব্যুনাল এলাকা থেকে নিখোঁজ সুখরঞ্জন বালীকে ‘গুমের ঘটনায়’ জড়িত থাকার অভিযোগে সাবেক এক সহকারী পুলিশ সুপারকে (এএসপি) গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম জানান, ফজলুর রহমান নামের ওই সাবেক পুলিশ কর্মকর্তাকে বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকায় তার বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।
২০১২ সালের ৫ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাঈদীর পক্ষে সাক্ষ্য দিতে এসে ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণ থেকে নিখোঁজ হন পিরোজপুরের বাসিন্দা সুখরঞ্জন বালী। পরে তাকে সীমান্ত এলাকায় পাওয়া যায় বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে সে সময় জানানো হয়।
তবে তার পরিবার ও কয়েকটি মানবাধিকার সংগঠন অভিযোগ করে আসছিল, ট্রাইব্যুনাল এলাকা থেকেই তাকে তুলে নেওয়া হয়েছিল। ঘটনাটি সে সময় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
চব্বিশের অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৫ সালের ২১ অগাস্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর কার্যালয়ে একটি অভিযোগ দায়ের করেন সুখরঞ্জন বালী।
যুদ্ধাপরাধে দণ্ডিত জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে রাজি না হওয়ায় এবং পরে সাঈদীর পক্ষে সাক্ষ্য দেওয়ায় ‘গুম’ ও ‘নির্যাতনের শিকার’ হওয়ার অভিযোগ করেন তিনি।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাসহ ৩২ জনের নামে সেখানে অভিযোগ করেন সুখরঞ্জন। ‘অজ্ঞাতনামা’ হিসেবে বিবাদী করা হয় আরো ১০ থেকে ১৫ জনকে।
তালিকায় অন্যদের মধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক নাসিম, সাবেক আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ, সাবেক আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলাম, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক বিচারক বিচারপতি এ টি এম ফজলে কবির, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মামলার সাবেক তদন্তকারী কর্মকর্তা হেলাল উদ্দিন এবং পিরোজপুর-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এ কে এম আউয়ালের নাম রয়েছে।
সুখরঞ্জন বালীর অভিযোগে বলা হয়, ২০১০ সালের জুলাই-অগাস্ট মাসের দিকে তৎকালীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত কর্মকর্তা হেলাল উদ্দিন পিরোজপুরের পাড়েরহাটের রাজলক্ষী স্কুলে ডেকে তার কাছে একাত্তরে তার ভাই বিশাবালীর হত্যার বিষয়ে জানতে চান।
তিনি জানান পাকিস্তানি হানাদর বাহিনী তার ভাইকে হত্যা করেছে। তখন হেলাল উদ্দিন তাকে ভাইয়ের হত্যাকারী হিসেবে অন্যদের সঙ্গে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর নামও বলতে বলেন এবং তার বিরুদ্ধে ট্রাইবুনালে গিয়ে ‘মিথ্যা’ সাক্ষ্য দিতে বলেন। কিন্তু তিনি রাজি না হলে তাকে ‘মারধর’ করেন।
এর বেশ কিছুদিন পর সাঈদীর ছেলে মাসুদ সাঈদী তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং বিশাবালী হত্যার ঘটনা জানতে চান।
“এরপর মাসুদ সাঈদী আমার ভাইয়ের হত্যার প্রকৃত ঘটনা ট্রাইব্যুনালে এসে বলার জন্য অনুরোধ করেন এবং আমি সাঈদী হুজুরের পক্ষে সাক্ষ্য দিতে রাজি হই।”
তিনি অভিযোগ করেন, এরপর ২০১২ সালের ৫ নভেম্বর তিনি সাঈদীর পক্ষে সাক্ষ্য দিতে ট্রাইব্যুনালে গেলে ফটক থেকে পুলিশ তাকে চোখ ও হাত বেঁধে ‘অজানা’ স্থানে নিয়ে যায়। সেখানে একটি জানালাবিহীন অন্ধকার ঘরে প্রায় দুই মাস তাকে বন্দি রাখা হয় এবং ‘প্রচণ্ড শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন’ চালানো হয়।
এরপর আরেকটি জায়গায় নিয়ে তাকে আরও দুই মাস নির্যাতন করা হয় বলে তার অভিযোগ।
সুখরঞ্জন বলেন, এরপর একদিন চোখ বেঁধে একটি গাড়িতে তোলা হয় এবং কয়েক ঘণ্টার যাত্রার পর গাড়ি থামলে তিনি শৌচাগারে যাওয়ার কথা বলেন। তখন চোখ খুলে দিলে তিনি বুঝতে পারেন, তাকে সীমান্ত এলাকায় নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, বিজিবির সহায়তায় তাকে উত্তর ২৪ পরগণাগার স্বরূপনগর থানার অন্তর্গত বৈকারী পাঠানো হয়। সেখানে বিএসএফ তাকে মারধর করে। পরে তাকে বশিরহাট নিয়ে যায়। বশিরহাট সাবজেলে ২২ দিন রাখার পর সেখান থেকে পাঠানো হয় দমদম কেন্দ্রীয় কারাগারে।
“পরে জানতে পারি বিষয়টি মাসুদ সাঈদী জানতে পারেন এবং আমার ছেলেকে ভারত পাঠিয়ে দেন। কারাগারে থাকার সময় বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা আমার সঙ্গে কারাগারে সাক্ষাৎ করে এবং আমার নির্যাতনের বিবরণ নথিভুক্ত করে। দেশে ফিরে এলেও পিরোজপুরে নিরাপত্তার কারণে যেতে পারি না; আত্মগোপনে নিজ জেলার বাইরে অবস্থান করি।”