দেশ বর্তমানে ভয়াবহ সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। তিনি অভিযোগ করেছেন, বিএনপি সরকার জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন তো দূরের কথা, গত ১০ বছর ধরে রাজনীতি করা ৩১ দফার প্রতিশ্রুতিও ভুলে গেছে দলটি।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) বিকেলে রাজধানীর শাহবাগে চার দফা দাবিতে আয়োজিত গণবিক্ষোভ সমাবেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি তুলে ধরে আসিফ মাহমুদ বলেন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি, ভুতুড়ে বিল এবং গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে সাধারণ মানুষের জীবন বিপর্যস্ত। সরকার এলপিজির দাম ১ হাজার ৮০০ টাকা নির্ধারণ করলেও বাজারে তা ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। পরিস্থিতির কারণে অনেক মানুষ ঢাকা ছেড়ে গ্রামে ফিরে যাচ্ছেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বিএনপি সরকারের সমালোচনা করে এনসিপির এই নেতা বলেন, নির্বাচনের আগে সরকার বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি ও ইশতেহার দিয়েছিল। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর জুলাই সনদ তো বাস্তবায়ন করেইনি, এমনকি দীর্ঘদিন ধরে প্রচার করা ৩১ দফার কথাও ভুলে গেছে। এতে শুধু জনগণ নয়, দলের আন্দোলন-সংগ্রামে অংশ নেওয়া নেতাকর্মীরাও প্রতারিত হয়েছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
আসিফ মাহমুদ আরও বলেন, আন্দোলন ও নির্বাচনে ভূমিকা রাখা ত্যাগী নেতাকর্মীদের পেছনে ফেলে সুবিধাভোগীদের প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। তাঁর অভিযোগ, বিদেশে পড়াশোনা করা এবং অতীতে ফ্যাসিবাদী সরকারের সময়ে সুযোগ-সুবিধা নেওয়া ব্যক্তিরা এখন বিভিন্ন সরকারি কাজ ও টেন্ডারে প্রভাব বিস্তার করছেন।
তিনি বলেন, বিএনপির ত্যাগী নেতাকর্মীরা একসময় এই পরিস্থিতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে আবারও এনসিপির সঙ্গে রাজপথে একত্রিত হবেন।
ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচন প্রসঙ্গে আসিফ মাহমুদ বলেন, ভোটগ্রহণের দিন বিভিন্ন কেন্দ্রে প্রিসাইডিং কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যালটে আগাম সিল দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। অথচ নির্বাচনের পর বিজয়ী ও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের একে অপরকে মিষ্টিমুখ করানোর দৃশ্য দেখা গেছে। তাঁর মতে, দেশের গণতন্ত্রের সংকট ও দুরবস্থার চিত্র এতে স্পষ্ট হয়েছে।
এনসিপির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশে গণতন্ত্র, সুশাসন ও শক্তিশালী পররাষ্ট্রনীতি প্রতিষ্ঠায় একটি আপসহীন রাজনৈতিক শক্তি প্রয়োজন। আগামী দিনে দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম আরও জোরদার করে পাঁচ বছরের মধ্যে ক্ষমতায় যাওয়ার উপযুক্ত হয়ে উঠতে হবে।
ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগের সমালোচনা করে আসিফ মাহমুদ বলেন, জাতীয় নির্বাচনে মনোনয়ন না পাওয়া কিংবা জনগণের ভোটে প্রত্যাখ্যাত ব্যক্তিদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এখন তাঁদের কেউ কেউ স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, সিটি করপোরেশনের অর্থ ও লোগো ব্যবহার করে প্রশাসকেরা পুরো ঢাকা শহরে পোস্টার-ব্যানার লাগিয়েছেন। অথচ তাঁদের দায়িত্ব নগরীর পরিচ্ছন্নতা ও নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা। এসব প্রশাসককে আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া উচিত নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ফুটপাত উচ্ছেদের নামে চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলে আসিফ মাহমুদ বলেন, সকালে অভিযান চালিয়ে হকারদের উচ্ছেদ করা হচ্ছে, আবার বিকেলে টাকা নিয়ে তাঁদের ফুটপাতে বসার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। আগে ৫০০ টাকা দিতে হলেও এখন দুই হাজার টাকা দাবি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
ঢাকায় নতুন করে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস ও মাফিয়াতন্ত্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিএনপি সরকার রাজধানীতে নতুন একটি চাঁদাবাজির ব্যবস্থা গড়ে তুলছে। পুরোনো প্রভাবশালীদের পরিবর্তে নতুন একটি গোষ্ঠীকে সামনে আনা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
আসিফ মাহমুদ বলেন, আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এনসিপি এসব মাফিয়াতন্ত্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে। দলের নেতাকর্মী ও কাউন্সিলর প্রার্থীদের নিয়ে শক্তিশালী সাংগঠনিক অবস্থান গড়ে তুলে ঢাকাকে সাধারণ মানুষের বসবাসের উপযোগী নগরীতে পরিণত করার চেষ্টা করা হবে।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে তিনি বলেন, আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে সরকারের জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। জনগণ সিদ্ধান্ত নেবে, তারা গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি, চাঁদাবাজি ও ফুটপাত দখলের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের ভোট দেবেন, নাকি নিজেদের প্রকৃত প্রতিনিধিদের নির্বাচিত করবেন।