সাগরকন্যা কুয়াকাটায় বর্ণিল আয়োজনে চলছে দুই দিনব্যাপী পর্যটন কার্নিভাল। বীচ ম্যারাথন, ঐতিহ্যবাহী পিঠা উৎসব, ঘুড়ি ও ক্রীড়া প্রতিযোগিতা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মুখর হয়ে উঠেছে সৈকত।
তবে উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি হোটেলকক্ষে সংকট, অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, খাবারের বাড়তি দাম এবং আয়োজনের অব্যবস্থাপনা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন পর্যটকদের কেউ কেউ। প্রত্যাশিত পর্যটক সমাগম না হওয়ায় হতাশা জানিয়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও।
বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের উদ্যোগে আয়োজিত এ কার্নিভালের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত এমপি। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি এমপি, স্থানীয় সংসদ সদস্য এবিএম মোশাররফ হোসেন, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য সুলতানা
জেসমিন জুঁই এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. নুরুন্নাহার চৌধুরী, জেলা বিএনপি’র সভাপতি স্নেহাশু সরকার কুট্টি, সাধারণ সম্পাদক এ্যাড. মো. মজিবর রহমান টোটন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের সহ-সভাপতি মনজুরুল আলম রিয়াদ, সহ-সভাপতি এইচ এম আবু জাফর, সহ-সাধারণ সম্পাদক মো: সাইদুর রহমান সাইদ সহ আয়োজন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) ভোরে কার্নিভালের অন্যতম আকর্ষণ ছয় কিলোমিটারের বীচ ম্যারাথন অনুষ্ঠিত হয়। সৈকতের জিরো পয়েন্ট থেকে শুরু হয়ে শেষ হয় গঙ্গামতি সৈকতে। এতে প্রায় ৮০০ থেকে ৯০০ পর্যটক অংশ নেন। সমুদ্রের অপরূপ সৌন্দর্য, সূর্যোদয় ও সকালের স্নিগ্ধ পরিবেশে ম্যারাথনে অংশ নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন প্রতিযোগীরা। তবে আয়োজনের বিভিন্ন অব্যবস্থাপনা নিয়ে অসন্তোষও দেখা যায়।
ম্যারাথন শেষে গঙ্গামতি সৈকতে আয়োজন করা হয় ঐতিহ্যবাহী পিঠা উৎসব। বাহারি স্বাদের পিঠা ও তার ঘ্রাণে উৎসবস্থলে ছড়িয়ে পড়ে গ্রামবাংলার চিরচেনা আবহ। পর্যটক ও দর্শনার্থীরা পিঠা উৎসবসহ বিভিন্ন আয়োজন উপভোগ করেন।
এর আগে শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) দিনভর অনুষ্ঠিত হয় ঘুড়ি উৎসব, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা ও বীচ ফুটবল প্রতিযোগিতা। রাতে সাংস্কৃতিক মঞ্চ মাতান চিত্রনায়িকা পূর্ণিমা ও বারিশা হক। পাশাপাশি চিশতি বাউল ও প্রীতম হাসানের সংগীত পরিবেশনা এবং সাদ্দাম মালের কমেডি শো দর্শকদের বাড়তি আনন্দ দেয়।
শনিবার দিনভর বীচ ভলিবল ও সেলিব্রিটি ক্রিকেট প্রতিযোগিতার পাশাপাশি সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন রয়েছে। আগামীকাল রোববার (২৫ অক্টোবর) ভোরে সৈকত পরিচ্ছন্নতা অভিযানের মধ্য দিয়ে দুই দিনব্যাপী এ কার্নিভালের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটবে।
পর্যটক সমাগম নিয়ে হতাশ ব্যবসায়ীরা
কার্নিভাল ঘিরে কুয়াকাটায় বিপুলসংখ্যক পর্যটকের সমাগম হবে বলে প্রত্যাশা করেছিলেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। তবে বাস্তবে সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি বলে জানিয়েছেন তাঁরা। তাঁদের মতে, নানা আয়োজন থাকলেও পর্যটকদের উপস্থিতি প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছায়নি।
অন্যদিকে পর্যটকদের ভিড়কে কেন্দ্র করে আবাসিক হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টে কক্ষসংকট এবং অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ সামনে এসেছে। কিছু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পণ্যের বাড়তি দাম ও রেস্তোরাঁয় খাবারের বিল বেশি রাখার অভিযোগও করেছেন পর্যটকদের অনেকে।
কুয়াকাটায় তিন শতাধিক আবাসিক হোটেল, মোটেল ও রিসোর্ট থাকলেও আগাম বুকিংয়ের কারণে বুকিং ছাড়া আসা পর্যটকদের অনেকে কক্ষ পেতে ভোগান্তিতে পড়েছেন। এমনকি পরিবার-পরিজন নিয়ে আসা কিছু পর্যটককে সৈকতে সময় কাটাতে দেখা গেছে। পর্যটনকেন্দ্রে এমন পরিস্থিতিতে আবাসন ব্যবস্থাপনা ও সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
তবে এর মধ্যে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়ে আলোচনায় এসেছেন স্থানীয় যুবক রুমি শরিফ। ‘হোটেল জোয়ার ভাটা’ নামে তাঁর প্রতিষ্ঠানে মাত্র ১২০ টাকায় গরুর মাংস ও ভাত বিক্রি করা হচ্ছে। তুলনামূলক কম দামে খাবার সরবরাহের এ উদ্যোগ পর্যটকদের মধ্যে সাড়া ফেলেছে।
হোটেল মালিকদের দাবি, নির্ধারিত ভাড়ায় চলছে সেবা
কুয়াকাটা আবাসিক হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এম এ মোতালেব শরীফ জানান, অধিকাংশ আবাসিক হোটেল, মোটেল ও রিসোর্ট ইতোমধ্যে বুকিং হয়ে গেছে। ধারণক্ষমতার তুলনায় পর্যটকের সংখ্যা বেশি হলে কিছুটা কক্ষসংকট দেখা দিতে পারে। তবে অ্যাসোসিয়েশনভুক্ত হোটেলগুলোতে নির্ধারিত ভাড়া নেওয়া হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
কোনো হোটেল বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কাছে জানানোর পরামর্শ দেন তিনি।
নিরাপত্তায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি
কার্নিভাল ঘিরে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ট্যুরিস্ট পুলিশ, জেলা পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। সড়ক ও মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখা এবং পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে নেওয়া হয়েছে বিশেষ নজরদারির ব্যবস্থা।
কুয়াকাটা ট্যুরিস্ট পুলিশের ইনচার্জ পরিদর্শক নাজমুল ইসলাম জানান, কার্নিভালে আগত পর্যটকদের নিরাপত্তায় বিশেষ নিরাপত্তাবলয় তৈরি করা হয়েছে। জেলা পুলিশ, গোয়েন্দা সদস্য ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বাহিনী সাদা পোশাকেও নজরদারি চালাবে। পাশাপাশি যান চলাচলে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ট্রাফিক পুলিশ ও পৌর কর্তৃপক্ষ কাজ করছে।
কুয়াকাটা পৌর প্রশাসক ও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. ইয়াসিন সাদেক বলেন, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পৌর প্রশাসন সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রয়েছে। আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও বীচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির সদস্যসচিব মো. আরিফুজ্জামান জানান, কার্নিভালের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। পর্যটকদের নিরাপত্তা ও সেবার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত নজরদারির ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সৈকতে ফায়ার সার্ভিস, মেডিকেল টিম ও তথ্যসেবা কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। পর্যটকদের সঙ্গে কোনো ধরনের অশোভন আচরণ বরদাস্ত করা হবে না বলেও জানান তিনি।
সব মিলিয়ে বীচ ম্যারাথন, পিঠা উৎসব, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা ও বিভিন্ন ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় কুয়াকাটা সৈকতে তৈরি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ। তবে পর্যটন কার্নিভালের সাফল্য শুধু বর্ণিল আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; পর্যটকদের প্রত্যাশিত সেবা নিশ্চিত করা, হোটেল-রেস্তোরাঁয় ন্যায্য মূল্য বজায় রাখা, আবাসনসংকট মোকাবিলা এবং সার্বিক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। উৎসবের আনন্দকে টেকসই পর্যটন সম্ভাবনাকে আন্তর্জাতিক পর্যটনে রূপ দিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর তদারকি ও সমন্বিত উদ্যোগেরগের দাবি জানিয়েছেন আগত পর্যটকরা।