সাকিব মাহমুদ, ইবি প্রতিনিধি
শৈশবে মাদ্রাসার দেয়ালিকায় কৌতুক লেখার মধ্য দিয়ে লেখালেখির জগতে প্রবেশ করেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) আরবি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান। চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময় তাঁর প্রথম লেখা প্রকাশিত হয়। এরপর আরও ১০ থেকে ১৫টি কবিতা লিখলেও সেগুলো সংরক্ষণ করা হয়নি। একপর্যায়ে সাহিত্যচর্চা অভিজ্ঞ লেখকদের কাজ এমন ধারণা, আর্থিক টানাপোড়েন ও পড়াশোনার চাপে লেখালেখি থেকে দূরে সরে যান তিনি।
পরবর্তী সময়ে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করার পর আবারও সাহিত্যচর্চায় মনোনিবেশ করেন। সহকারী অধ্যাপক থাকাকালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম বই। এরপর আরবি সাহিত্য অনুবাদের মধ্য দিয়ে নিয়মিত লেখালেখি শুরু করেন তিনি। বর্তমানে তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৪৪ টি। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত লেখালেখি চালিয়ে যেতে চান এই অধ্যাপক।
ছাত্রজীবন থেকেই বই পড়ার প্রতি গভীর আগ্রহ ছিল কামরুল হাসানের। পরিবারে উপন্যাস ও নাটক পড়ার অনুমতি না থাকায় রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে লুকিয়ে বই পড়তেন তিনি। নাজিব কিলানি, আবুল আসাদ ও কবি মল্লিকের সাহিত্যকর্ম তাঁর লেখালেখির অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে।
নিজের অনুপ্রেরণার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, “আমি যখন নবম শ্রেণিতে পড়ি, তখন নাজিব কিলানির লেখা ‘আল্লাহর পথের সৈনিক’ পড়েছি। বইটিতে মুসলিম ব্রাদারহুডের ওপর নির্যাতনের জীবন্ত চিত্র আমাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। এরপর থেকে নাজিব কিলানির লেখার প্রতি বিশেষ দুর্বলতা তৈরি হয়। আবুল আসাদের সাইমুম সিরিজ এবং মল্লিক ভাইয়ের গানও আমাকে বইপ্রেমী করে তোলে। এখান থেকেই লেখালেখির অনুপ্রেরণা পাই।” তিনি আরও জানান, শিক্ষাজীবনে সাইমুম সিরিজের ৩৬টি বই পড়েছেন।
কামরুল হাসানের প্রথম অনূদিত বই ‘অভিশাপ’। এরপর আরবি সাহিত্য অনুবাদের পাশাপাশি মৌলিক সাহিত্য রচনাতেও অবদান রেখেছেন তিনি। তাঁর অনূদিত বইয়ের মধ্যে রয়েছে ‘জ্ঞান ও ইমান’, ‘মুসনাদে আহমদ’ (পঞ্চম খণ্ড), ‘অভিশাপ’, ‘মরুর ঈগল’, ‘জয়নব’, ‘আনন্দ অপেরা’, ‘তেলাপোকার ভাগ্য’, ‘সবার জন্য খাদ্য’, ‘জামরাদার স্বপ্ন’, ‘স্বর্ণরাঙা প্রভাত’, ‘ইজিস’, ‘বিশ্বাস-অবিশ্বাস’, ‘মিস জাকার্তা’, ‘সুখস্বপ্ন’, ‘দুঃস্বপ্ন’, ‘দ্য ম্যাড ম্যান’, ‘কালো ছায়া’, ‘রাজা ইডিপাস’, ‘স্বাধীনতার মিছিল’, ‘ফেরেশতার প্রার্থনা’, ‘আঙুরের রানি’,
‘জ্ঞানী রাজা সুলাইমান’ ও ‘ডাক্তারের গল্প’। তাঁর স্বরচিত বইয়ের মধ্যে রয়েছে ‘আল-আরাবিয়্যাতু আল-ইত্তিসালিয়া’, ‘আরবি সাহিত্য মঞ্জুষা’র প্রথম থেকে চতুর্থ খণ্ড, ‘নবি আমার শশীপ্রভা’, ‘সাহিত্য পাঠ’, ‘ছোটদের প্রিয় মহানবি’, ‘নির্বাচিত ইসলামি প্রবন্ধ’, ‘আল-কুরআনের উপমা: ছড়ানো-ছিটানো সুষমা’, ‘বিশ্বাসের প্রতিধ্বনি’, ‘জুলাইয়ে উত্তাল দিনগুলো’, ‘সাহিত্য অন্বেষা’ ও ‘সুবাস অম্লান’। এ ছাড়া ‘আরবি সাহিত্য মঞ্জুষা’র পঞ্চম খণ্ড, ‘আল-কুরআনের উপমা’, ‘আলাপ বিলাপ’, ‘নবি আমার শশীপ্রভা’র দ্বিতীয় খণ্ড এবং ‘মুহাম্মদ (স.) নাটক প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে।
নিজের অনূদিত বইগুলোর মধ্যে ‘জয়নব’কে বিশেষভাবে প্রিয় বলে উল্লেখ করেন অধ্যাপক কামরুল হাসান। আরবি সাহিত্যের প্রথম উপন্যাস হিসেবে পরিচিত বইটি অনুবাদ করতে গিয়ে ভাষার জটিলতা ও অভিজ্ঞতার সীমাবদ্ধতার কারণে দীর্ঘ সময় ব্যয় করতে হয়েছে তাঁকে। দীর্ঘক্ষণ চেয়ারে বসে অনুবাদ করতে গিয়ে শারীরিক সমস্যায়ও পড়েছিলেন তিনি। বইটি সম্পর্কে তিনি বলেন, প্রত্যেকটা বই আমার সন্তানের মতো।
বই লেখার আগে ভালোবাসা তৈরি করি, তারপর লিখি। ভালোবাসা তৈরি না হলে লিখি না।” বইটির এক হাজার কপি ছাপানো হয়েছিল এবং গত বছর শেষ কপিটিও বিক্রি হয়েছে। তবে আরবি সাহিত্যের পাঠকসংখ্যা কম হওয়ায় প্রত্যাশিত সাড়া পায়নি বইটি। বই বিক্রির অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি জানান, খোলা বাজারে আরবি সাহিত্যের বইয়ের চাহিদা কম। একসময় জয়পুরহাট ও বগুড়া রেলস্টেশনে বিক্রির জন্য বই দিয়েছিলেন। কিন্তু বিক্রির পর যথাযথ অর্থ না পাওয়ায় এখন আর সেখানে বই সরবরাহ করেন না।
নতুন লেখকদের উদ্দেশে অধ্যাপক কামরুল হাসান বলেন, লেখক হতে হলে প্রথমেই বেশি বেশি পড়তে হবে। পাশাপাশি সমাজ, পরিবেশ, মানুষের আচরণ, রাস্তাঘাট ও স্থাপনা থেকেও শেখার চেষ্টা করতে হবে। সুযোগ পেলে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হবে।
তাঁর মতে, লেখালেখি শুধু কাগজে শব্দ সাজানোর বিষয় নয়; বরং মানুষের জীবন, সমাজ ও চারপাশের বাস্তবতাকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়েই একজন লেখকের চিন্তা ও সৃষ্টিশীলতা সমৃদ্ধ হয়। শৈশবে মাদ্রাসার দেয়ালিকায় একটি কৌতুক দিয়ে শুরু হওয়া তাঁর সাহিত্যযাত্রা আজ অনুবাদ ও মৌলিক সাহিত্যকর্মে বিস্তৃত হয়েছে। নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে গড়ে তোলা এই পথচলা অব্যাহত রেখে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বই লিখে যাওয়াই তাঁর স্বপ্ন।