কাওসার আহমেদ.
বর্ষার পানি কমতে শুরু করেছে। ধীরে ধীরে শুষ্ক মৌসুমের দিকে এগোচ্ছে নাটোরের চলনবিল। তবে পানি কমলেও বিলের বিভিন্ন নদী, খাল ও জলাশয়ে চায়না দুয়ারি জালের ব্যবহার বন্ধ হয়নি। স্থানীয়দের অভিযোগ, এ জালে ছোট-বড় মাছের পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ পোনা ধরা পড়ছে।
এতে দেশীয় মাছের বংশবিস্তার ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে মৎস্যসম্পদ রক্ষায় নিয়মিত অভিযান ও নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
বিলজুড়ে জালের ব্যবহার
স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার খুবজীপুর, বিলশা, শ্রীপুর, পিঁপলা, বামনবাড়িয়া, মশিন্দার ১০ নম্বর ব্রিজ এলাকা, নাদোসৈয়দপুর, বিলকাঠুর, বিলব্যাসপুর, যোগেন্দ্রনগর, বিলহরীবাড়ী ও হরদমা এলাকায় চায়না দুয়ারি জালের ব্যবহার দেখা যাচ্ছে।
একই চিত্র নাটোরের সিংড়া উপজেলার ডাহিয়া, ইতালী, চৌগ্রাম, কলম, তাজপুর, শেরকোল, বেড়াবাড়ি, কাউয়াটিকরি, ইন্দ্রাসন, মাগুড়া, বিলতাজপুর, সাতপুকুরিয়া, সারদানগর ও জোলারবাতা এলাকায়। সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার রুহাই, কুন্দইল ও হান্ডিয়াল এলাকাতেও এ জালের ব্যবহার বাড়ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
স্থানীয়দের ভাষ্য, চায়না দুয়ারি জালের সূক্ষ্ম ফাঁসের কারণে ছোট মাছ ও পোনা সহজেই আটকা পড়ে। একই সঙ্গে বড় মাছও এ জালের ফাঁদ থেকে রেহাই পায় না। ফলে মাছের প্রজনন ও স্বাভাবিক বংশবিস্তার বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দীর্ঘ মেয়াদে এর প্রভাব পড়তে পারে দেশীয় মাছের প্রাপ্যতা, জলজ জীববৈচিত্র্য ও মৎস্যজীবীদের জীবিকায়।
‘আগে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত’
চলনবিলের মাছের প্রাপ্যতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারাও। গুরুদাসপুরের বিলসা গ্রামের শুরুজ বলেন, “একসময় চলনবিলে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। এখন মৎস্যজীবীদের পাশাপাশি স্থানীয় লোকজনও চায়না দুয়ারি জালসহ বিভিন্ন ধরনের জাল দিয়ে মাছ ধরছেন। এসব জালে বেশির ভাগই ধরা পড়ছে মাছের পোনা। বিশেষ করে চায়না দুয়ারি জালের ব্যবহার বাড়ায় মাছের সংখ্যা কমেছে। এ জালের ব্যবহার বন্ধে প্রশাসনের আরও জোরালো ভূমিকা প্রয়োজন।”
অভিযান হলেও বন্ধ হয়নি ব্যবহার
চায়না দুয়ারি জালের ব্যবহার বন্ধে চলতি বছরের বিভিন্ন সময়ে প্রশাসন ও মৎস্য অধিদপ্তর অভিযান চালিয়েছে। এসব অভিযানে অবৈধ কারেন্ট জাল ও চায়না দুয়ারি জাল জব্দ করে ধ্বংস করা হয়েছে।
গত ১১ জুলাই সকালে গুরুদাসপুর উপজেলার চাঁচকৈড় হাট, আত্রাই নদী, নন্দকুজা নদী, বেসানী নদী এবং চলনবিলের বিলশা, হরদমা ও পিঁপলা এলাকায় অভিযান চালানো হয়। এ সময় প্রায় ২০ হাজার মিটার অবৈধ কারেন্ট জাল ও বিপুল পরিমাণ চায়না দুয়ারি জাল জব্দ করা হয়। পরে চাঁচকৈড়ের নন্দকুজা নদীর তীরে জব্দ করা জালগুলো জনসম্মুখে আগুনে পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়।
এ ছাড়া চলতি বছরের জুনে সিংড়া ও চলনবিল অঞ্চলে ঝটিকা অভিযান চালিয়ে প্রায় ১৫০টি চায়না দুয়ারি জাল পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়। আগস্টে সিংড়ায় অভিযান চালিয়ে আরও ৬৯টি জাল জব্দ ও ধ্বংস করা হয়। জুলাইয়ে পাবনার ভাঙ্গুড়ায় অভিযান চালিয়ে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা মূল্যের জাল জব্দ করা হয়।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালানো হলেও নিয়মিত নজরদারির অভাবে অনেক এলাকায় চায়না দুয়ারি জালের ব্যবহার অব্যাহত রয়েছে। তাঁদের মতে, চলনবিলের বিস্তীর্ণ জলাভূমিতে ধারাবাহিক অভিযান ও সমন্বিত নজরদারি নিশ্চিত করা গেলে এ জালের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
যা বলছেন মৎস্য কর্মকর্তারা
গুরুদাসপুর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা রতন চন্দ্র সাহা বলেন, “চায়না দুয়ারি জালের ব্যবহার বন্ধে আমাদের অভিযান চলমান রয়েছে। কোনো এলাকায় এ ধরনের জালের ব্যবহার সম্পর্কে লিখিত অভিযোগ পেলে সেখানে অভিযান পরিচালনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
নাটোরের জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. ওমর আলী বলেন, “নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারি জালের ব্যবহার বন্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে নলডাঙ্গায় অভিযান চালিয়ে ৩৫ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে এবং বাঁশের তৈরি বানা উচ্ছেদ করা হয়েছে। তবে চলনবিল বিস্তীর্ণ এলাকা হওয়ায় একযোগে পুরো বিলজুড়ে অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন এলাকায় অভিযান পরিচালনা করা হবে।”
মৎস্যসম্পদ রক্ষায় নিয়মিত অভিযানের দাবি
চলনবিলের দেশীয় মাছ ও জলজ জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বিচ্ছিন্ন অভিযানের পাশাপাশি নিয়মিত নজরদারি, অবৈধ জালের উৎস শনাক্ত করা এবং আইন অনুযায়ী কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাঁদের মতে, সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ, ধারাবাহিক অভিযান ও জনসচেতনতা বাড়ানো গেলে চায়না দুয়ারি জালের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি চলনবিলের মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণও সহজ হবে।