কাওসার আহমেদ
বর্ষার জলে ভরে ওঠা চলনবিল একসময় ছিল জীবনের উচ্ছ্বাসে ভরা এক বিশাল জলরাশি। পানির বুক চিরে ছুটত নৌকা, জেলেদের জালে উঠত নানা প্রজাতির মাছ, আর বিলের উর্বর পলিমাটিতে দুলতো কৃষকের সোনালি ধানের স্বপ্ন।
বর্ষায় বিলের অপরূপ সৌন্দর্য দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসতেন পর্যটকেরাও। তবে এবার সেই চেনা রূপ অনেকটাই বিবর্ণ। কচুরিপানার ঘন আস্তরণে ঢেকে গেছে বিলের বিস্তীর্ণ জলাভূমি ও আবাদি জমি। এতে ব্যাহত হচ্ছে কৃষিকাজ ও নৌ চলাচল, নষ্ট হচ্ছে বিলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। পর্যটকেরাও আগের মতো স্বাচ্ছন্দ্যে ঘুরতে পারছেন না।
নাটোরের গুরুদাসপুর ও সিংড়ার ৬২ বর্গমাইলজুড়ে বিস্তৃত চলনবিলের বিলশা বিলের প্রায় ৭০০ হেক্টর জমি কচুরিপানায় আচ্ছাদিত হয়েছে। এতে আমন ধানসহ আগাম সরিষা, গম ও ইরি-বোরো আবাদ নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন কৃষকেরা। একই সঙ্গে ভরা বর্ষায় মাছের প্রজনন ও উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে।
কৃষি সংশ্লিষ্টদের ধারণা, কচুরিপানার আগ্রাসনে সরাসরি ক্ষতির মুখে পড়েছেন প্রায় ৩০ হাজার কৃষক। শুধু কৃষিই নয়, বিলের বুকে কচুরিপানার ঘন জট আটকে দিচ্ছে নৌ চলাচলের পথ। এতে ভোগান্তি বাড়ছে বিলপাড়ের মানুষের; সমস্যায় পড়ছেন মাঝি ও দিনমজুরেরা।
কচুরিপানায় ঢাকা বিল
সরেজমিনে দেখা যায়, চলনবিলের বিস্তীর্ণ এলাকা কচুরিপানায় ঢেকে গেছে। কোথাও কোথাও এত ঘন হয়ে আছে যে নিচে পানিও দেখা যাচ্ছে না। এতে আবাদি জমিতে প্রবেশ ও চাষাবাদ ব্যাহত হচ্ছে। কচুরিপানার জটে সংকুচিত হয়ে পড়েছে নৌপথ। মাঝিদের কচুরিপানা ঠেলে নৌকা চালাতে হচ্ছে। কোথাও কোথাও পানির স্বাভাবিক প্রবাহও বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য
বর্ষার স্রোতে উজান থেকে ভেসে আসা কচুরিপানা খাল-বিল ও আশপাশের জলাশয় হয়ে চলনবিলের বিভিন্ন অংশে জমা হচ্ছে। তবে বিলে স্রোতের প্রভাব কম থাকায় সেগুলো সহজে বের হতে পারছে না। ফলে কোথাও কোথাও জমাট বেঁধে তৈরি হয়েছে ঘন সবুজের বিস্তীর্ণ আস্তরণ।
গুরুদাসপুরের খুবজীপুরের বিলশা, শ্রীপুর, পিপলা, বামনবাড়িয়া, মশিন্দার ১০ নম্বর ব্রিজ এলাকা, নাদোসৈয়দপুর, বিলকাঠুর, বিলব্যাসপুর ও বিয়াঘাটের যোগেন্দ্রনগর, বিলহরীবাড়ী, হরদমাসহ সিংড়ার ডাহিয়া, ইতালী, চৌগ্রাম, কলম, তাজপুর ও শেরকোল এবং সিরাজগঞ্জের তাড়াশ, রুহাই, কুন্দইল, হান্ডিয়ালসহ অন্তত ৩০ গ্রামের বিস্তীর্ণ বিলাঞ্চল কচুরিপানার সবুজ চাদরে ঢাকা পড়েছে।
পানি নামলেও বাড়বে কৃষকের খরচ
পানি নেমে গেলেও কৃষকদের দুশ্চিন্তা কাটছে না। কারণ, জমিতে জমে থাকা কচুরিপানা সরিয়ে চাষাবাদের উপযোগী করতে তাঁদের গুনতে হবে বাড়তি টাকা। কৃষকদের ভাষ্য, এক বিঘা জমি কচুরিপানামুক্ত করতে প্রয়োজন হচ্ছে ১০ থেকে ১২ জন শ্রমিক।
প্রতিজন শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকা। এতে শুধু কচুরিপানা পরিষ্কার করতেই বিঘাপ্রতি প্রায় ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা অতিরিক্ত খরচ হবে। ফলে কচুরিপানা না সরালে সময়মতো আবাদ করা যাবে না, আবার সরাতে গেলেও বাড়তি খরচের বোঝা টানতে হবে কৃষকদের।
বাড়তি এই ব্যয়ের সঙ্গে যোগ হয়েছে শ্রমিক সংকট। টাকা দিয়েও প্রয়োজনমতো শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে অনেক কৃষক সময়মতো জমি পরিষ্কার করতে পারছেন না। কেউ কেউ ধারদেনা করে শ্রমিক নিয়ে কচুরিপানা সরানোর চেষ্টা করছেন।
বিলশা, যোগেন্দ্রনগর, বিলব্যাসপুর ও কুন্দইল গ্রামের কৃষক বরহান উদ্দিন, আব্দুল খালেক, হাসেম আলী ও খবির উদ্দিনসহ কয়েকজন বলেন, কচুরিপানা পরিষ্কার করতেই অনেক টাকা খরচ হচ্ছে। কয়েক বছর ধরে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তাঁরা সরকারি কোনো সহযোগিতা পাননি। এখন টাকা দিয়েও প্রয়োজনীয় শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। এতে জমি প্রস্তুত করতে গিয়ে খরচ ও ভোগান্তি দুটোই বাড়ছে।
নৌ চলাচল ও পর্যটনের প্রভাব
কচুরিপানার কারণে নৌ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় পর্যটকদেরও ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। বর্ষায় চলনবিলের পানির সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসা মানুষজন অনেক জায়গায় নৌকা নিয়ে বিলের ভেতরে যেতে পারছেন না। কচুরিপানায় ঢেকে গেছে বিলের পানির বড় অংশ। ফলে আগের মতো খোলা জলরাশি ও নৌভ্রমণের পরিবেশও পাওয়া যাচ্ছে না।
স্থানীয়রা বলছেন, চলনবিলের অন্যতম আকর্ষণ এর বিস্তীর্ণ জলরাশি ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। কিন্তু কচুরিপানার ঘন আস্তরণে সেই সৌন্দর্য অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে। এতে পর্যটকদের আগ্রহও কমছে।
কুন্দইল এলাকার মাঝি ময়েজ খাঁ বলেন, কচুরিপানার কারণে এখন নৌকা চালাতে অনেক সমস্যা হচ্ছে। আগে সহজেই এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়া যেত। এখন কচুরিপানা ঠেলে নৌকা চালাতে হয়। এতে সময় বেশি লাগে এবং যাত্রীদেরও কষ্ট হয়। দ্রুত কচুরিপানা পরিষ্কার করা দরকার।
চলনবিলের বিলশা এলাকা পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত; বর্ষায় এখানে নৌভ্রমণে মানুষের আনাগোনা দেখা যায়।
জীববৈচিত্র্য নিয়েও শঙ্কা
চলনবিল জীববৈচিত্র্য রক্ষা কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক এম এম আলী আককাছ বলেন, চলনবিল দেশের অন্যতম প্রধান ধান উৎপাদন এলাকা। কচুরিপানার বিস্তারে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি পরিবেশ ও জলজ জীববৈচিত্র্যও হুমকিতে পড়ছে। দ্রুত কচুরিপানা অপসারণ করে বিলের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করা জরুরি।
গুরুদাসপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কে এম রাফিউল ইসলাম বলেন, এবার বিলে পানির প্রবাহ কম থাকায় কচুরিপানার বিস্তার বেড়েছে। কোথাও কোথাও বাঁধ ও সুতি দিয়ে পানির স্বাভাবিক প্রবাহও বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে। কৃষকদের দ্রুত কচুরিপানা সরিয়ে জমি চাষের উপযোগী করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার তথ্য সংগ্রহ ও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের কাজ চলছে।
গুরুদাসপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহমিদা আফরোজ বলেন, বিষয়টি জানার পর কৃষি বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করে কৃষকদের পাশে দাঁড়াতে প্রয়োজনীয় সহায়তার বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা হবে।