দেশে যারা বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে, তাদের বিষয়ে জনগণকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে তাদের অতীত কর্মকাণ্ড বিবেচনায় নিয়ে ভবিষ্যৎ কার্যক্রমের ওপর নজর রাখার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
রোববার (১৬ আগস্ট) বিকেলে কিশোরগঞ্জের পুরাতন স্টেডিয়ামে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ এবং বিভিন্ন ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের সম্মানি প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশে অনেক বিভ্রান্তকারী ও রটনাকারী রয়েছে। তাদের ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। তারা অতীতে কী করেছে, তা বিবেচনায় নিয়ে তাদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করতে হবে। কোনো বিভ্রান্তিকর প্রচারে প্রভাবিত না হয়ে দেশের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
তিনি বলেন, কেউ বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করলে অতীতের মতো জনগণকে তার উপযুক্ত জবাব দিতে হবে।
অতীতের বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কিছু গোষ্ঠীর ভূমিকার সমালোচনা করে তারেক রহমান বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৮৬ ও ১৯৯৬ সালের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ এবং গত ১৭ বছরের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তাদের রাজপথে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল না। তাঁর দাবি, গত ১৭ বছরের আন্দোলনে বিএনপি ও মিত্র দলগুলোর নেতাকর্মীরা গুম, খুন, নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হয়েছেন।
সাম্প্রতিক সংস্কার প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা দীর্ঘ ১৭ বছর রাজপথে সক্রিয় ছিল না, তারা এখন সংস্কারের নামে নানা কথা বলে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। বিএনপি ২০২২ সালে রাষ্ট্রীয় সংস্কারের একটি রূপরেখা জনগণের সামনে তুলে ধরেছিল বলেও উল্লেখ করেন তিনি। এর আগে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সংস্কারের প্রস্তাবনা তৈরি হয়েছিল বলেও দাবি করেন প্রধানমন্ত্রী।
ফ্যামিলি ও কৃষক কার্ডে গুরুত্ব
সামাজিক সুরক্ষা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তারেক রহমান বলেন, ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের কার্যকর বাস্তবায়ন, ইমাম-মুয়াজ্জিনদের ভাতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দক্ষ ও সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার কাজ এগিয়ে নিতে হবে।
কৃষি খাতের আধুনিকায়ন এবং তরুণদের কর্মসংস্থানের জন্য নতুন শিল্প-কারখানা ও প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার কথাও জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের মানুষকে আত্মনির্ভরশীল করতে না পারলে শুধু বড় বড় স্লোগান দিয়ে দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। প্রতিটি নাগরিককে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তোলাই সরকারের অন্যতম লক্ষ্য।
অন্য কোনো দেশের অনুকরণ নয়, বাংলাদেশকে আত্মনির্ভরশীল ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করে তিনি বলেন, এমন একটি বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা হবে, যেখানে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ রাষ্ট্রের কাছ থেকে তার প্রাপ্য মর্যাদা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা পাবে।
নারীর ক্ষমতায়নে ফ্যামিলি কার্ড
দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, নারীদের পিছিয়ে রেখে কোনো দেশ এগিয়ে যেতে পারে না। নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী ও ক্ষমতায়িত করতে ফ্যামিলি কার্ডের মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, নারীদের স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত বিনামূল্যে পড়াশোনার সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি ভালো ফলাফলের জন্য সরকারি সহায়তার ব্যবস্থাও করা হচ্ছে।
কৃষকের জন্য কৃষক কার্ড
কৃষকদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করা সরকারের অগ্রাধিকার উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ লক্ষ্যেই কৃষক কার্ড চালু করা হয়েছে।
তিনি জানান, ইতোমধ্যে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ করা হয়েছে, এতে প্রায় ১৩ লাখ কৃষক উপকৃত হয়েছেন। সেচ সুবিধা বাড়ানো ও পানি সংকট মোকাবিলায় ভবিষ্যতে দেশব্যাপী ২৫০ কিলোমিটার খাল খননের পরিকল্পনাও রয়েছে।
শিক্ষা ও তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন
শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শুধু প্রাতিষ্ঠানিক সনদ অর্জন নয়, শিক্ষার্থীদের খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও ভাষাগত দক্ষতার মাধ্যমে পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা হবে।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের চালু করা ‘নতুন কুঁড়ি’ প্রতিযোগিতা পুনরায় চালুর কথাও জানান তিনি। এর মাধ্যমে শিশু-কিশোরদের মেধা ও প্রতিভা বিকাশের সুযোগ তৈরি করা হবে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের কল্যাণে সরকারের উদ্যোগ তুলে ধরে তিনি বলেন, ইমাম, মুয়াজ্জিন, খতিবসহ ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের আত্মনির্ভরশীল রাখতে সামাজিক ভাতা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি অসচ্ছল, প্রতিবন্ধী ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য রাষ্ট্রীয় সহায়তা অব্যাহত থাকবে।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, স্বৈরাচারী শাসনামলে বঞ্চনার শিকার ১ লাখ ২৩ হাজার শিক্ষকের অবসর ভাতাসংক্রান্ত জটিলতা নিরসন করে তাদের অর্থ প্রদান সম্পন্ন করেছে বর্তমান সরকার।
জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনই লক্ষ্য
বিএনপির রাজনীতির মূল লক্ষ্য জনগণের ভাগ্য পরিবর্তন করা উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষায় সহায়তা, কৃষকের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং শিল্প-কারখানা স্থাপনের মাধ্যমে মানুষের জীবনমান উন্নত করাই সরকারের উদ্দেশ্য।
তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে এবং দেশের সাধারণ মানুষই এই উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের প্রত্যক্ষ সাক্ষী।
অনুষ্ঠানে সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক এজেডএম জাহিদ হোসেনের সভাপতিত্বে আরও বক্তব্য দেন বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলম, সংসদ সদস্য ফজলুর রহমান, মাজহারুল ইসলাম, জালাল উদ্দীনসহ অন্যরা।