অচল স্লুইসগেট ও দুর্বল পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার অভিযোগ, কর্মহীন হাজারো শ্রমজীবী; চরম দুর্ভোগে উপকূলবাসী।
মো. হোসেন মনপুরা (ভোলা) প্রতিনিধি
টানা তিন দিনের মুষলধারে বর্ষণে ভোলার দ্বীপ উপজেলা মনপুরা যেন এক জলাবদ্ধ জনপদে পরিণত হয়েছে। অবিরাম বৃষ্টিতে উপজেলার পাঁচ ইউনিয়নের অসংখ্য গ্রাম, গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, ফসলের মাঠ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আঙিনা এবং বসতভিটা পানিতে তলিয়ে গেছে। কোথাও হাঁটু, কোথাও কোমর, আবার কোথাও তিন থেকে চার ফুট পর্যন্ত পানি জমে থাকায় লাখো মানুষ কার্যত পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।
স্বাভাবিক জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে পুরো উপকূলজুড়ে।
মঙ্গলবার সকাল থেকে ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকায় পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটে। পানি জমে যাওয়ায় অনেক এলাকায় যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। প্রয়োজনীয় কাজেও ঘর থেকে বের হতে হিমশিম খাচ্ছেন মানুষ। বাজার, দোকানপাট ও ব্যবসা-বাণিজ্যে নেমে এসেছে স্থবিরতা। অনেক পরিবারের ঘরে ও উঠানে পানি ঢুকে পড়ায় শিশু, নারী ও বয়স্করা সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন।
সবচেয়ে সংকটে রয়েছেন দিন এনে দিন খাওয়া মানুষ। দিনমজুর, জেলে, রিকশাচালক, নির্মাণশ্রমিক ও অন্যান্য শ্রমজীবীরা কয়েক দিন ধরে কাজে যেতে পারছেন না। আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেক পরিবারের চুলায় আগুন জ্বলছে না। নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য কিনতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে নিম্ন আয়ের মানুষকে। স্থানীয়দের ভাষ্য, বৃষ্টি যত না কষ্ট দিচ্ছে, তার চেয়ে বেশি ভোগাচ্ছে জলাবদ্ধতা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বিচ্ছিন্ন কলাতলী ইউনিয়নের ঢালচর, কাজীরচর ও কলাতলী চরের বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে ডুবে গেছে। দক্ষিণ সাকুচিয়া ইউনিয়নের রহমানপুরসহ একাধিক গ্রামে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। হাজিরহাট ইউনিয়নের দাসেরহাট, চরযতিন ও সোনারচরের পূর্ব-পশ্চিম অংশ, মনপুরা ইউনিয়নের আন্দিরপাড় ও কাউয়ারটেক এবং উত্তর সাকুচিয়া ইউনিয়নের চরগোয়ালিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় একই চিত্র দেখা গেছে। অনেক কৃষকের জমিতে পানি জমে থাকায় আমন মৌসুমের প্রস্তুতি নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ফারুক, সবুজ , রাসেল , মারুফ ,সোহান, নাহিদ ও বেল্লাল বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনাও এই জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ। তাদের অভিযোগ, পর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নিশ্চিত না করেই বিভিন্ন স্থানে বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার করা হয়েছে। পাশাপাশি উপজেলার বেশ কয়েকটি স্লুইসগেট বছরের পর বছর অকেজো পড়ে থাকায় খাল দিয়ে পানি দ্রুত নামতে পারে না। ফলে সামান্য ভারী বৃষ্টিতেই লোকালয়ে পানি আটকে থেকে ভয়াবহ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়।
স্থানীয়দের দাবি, প্রতি বর্ষায় একই দুর্ভোগের পুনরাবৃত্তি হলেও স্থায়ী সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। দ্রুত অচল স্লুইসগেট মেরামত, খাল পুনঃখনন এবং আধুনিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ডিভিশন-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আসাফউদ্দৌলা বলেন, “টানা ভারী বর্ষণের কারণে মনপুরার বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। অচল স্লুইসগেট মেরামত এবং দ্রুত পানি নিষ্কাশনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”
উপকূলবাসীর প্রশ্ন, প্রতি বর্ষা এলেই যদি একই চিত্রের পুনরাবৃত্তি ঘটে, তবে স্থায়ী সমাধান কবে মিলবে? জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে সামান্য বৃষ্টিতেই মনপুরার মানুষকে একই দুর্ভোগ পোহাতে হবে—এমন আশঙ্কাই এখন স্থানীয়দের মুখে মুখে।