জাতীয় সংসদে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির পরিচালনা ও মালিকানা কাঠামো নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের। তিনি অভিযোগ করেছেন, ব্যাংকটিতে আবারও এস আলম গ্রুপ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রভাব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে, যা আমানতকারী ও সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে নতুন করে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করতে পারে।
মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে কার্যপ্রণালি বিধির ৬৮ অনুযায়ী উত্থাপিত এক নোটিশের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব অভিযোগ করেন।
তাহের বলেন, গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে ইসলামী ব্যাংক ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে শুরু করেছিল। দীর্ঘ অস্থিরতার পর গ্রাহকদের আস্থা পুনর্গঠনের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছিল। তার দাবি, ওই সময় গ্রাহকরা নতুন করে প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা আমানত জমা রাখেন, যা ব্যাংকটির প্রতি জনগণের আস্থার প্রতিফলন।
তিনি বলেন, জনগণের প্রত্যাশা ছিল বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে এবং ব্যাংকটিকে আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক কাঠামোর আওতায় আনা হবে। কিন্তু বাস্তবে ব্যাংকের অভ্যন্তরে আবারও বিতর্কিত ব্যক্তিদের দায়িত্বশীল পদে বসানোর চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
ইসলামী ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান এম জুবায়দুর রহমান এবং সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওমর ফারুকের প্রসঙ্গ তুলে বিরোধীদলীয় উপনেতা বলেন, তাদের নেতৃত্বে ব্যাংকটি ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতার পথে এগোচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ করে চেয়ারম্যান পরিবর্তন এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালককে পদত্যাগে বাধ্য করার ঘটনা নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, চেয়ারম্যান পরিবর্তনের কারণ এবং এমডির পদত্যাগের পেছনের বাস্তবতা জনগণের সামনে স্পষ্ট করা উচিত। একই সঙ্গে পূর্ববর্তী ব্যবস্থাপনা কাঠামো পুনর্বহাল এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্বে ফিরিয়ে আনার বিষয়ও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
ব্যাংকের মালিকানা কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তাহের। তার অভিযোগ, বর্তমানে এস আলম গ্রুপ ইসলামী ব্যাংকের প্রায় ৮২ শতাংশ শেয়ারের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। এতে অন্যান্য শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ব্যাংকের করপোরেট সুশাসন দুর্বল হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
তিনি বলেন, প্রকৃত শেয়ারধারীদের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং মালিকানা কাঠামোর স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে অতীতে মালিকানা পরিবর্তনের ঘটনাগুলোও পুনঃপর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগের বিষয়েও আপত্তি তুলে তিনি বলেন, যার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে, তাকে ইসলামী ব্যাংকের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান করা হয়েছে। এতে গ্রাহকদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক।
তাহেরের ভাষ্য, ইসলামী ব্যাংকের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল জনগণের আস্থা, সততা এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনা। সেই ঐতিহ্য ও মানদণ্ড বজায় রাখা না গেলে ব্যাংকটির ভবিষ্যৎ আবারও অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, যদি ব্যাংক পরিচালনায় পুনরায় এস আলম-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে আমানতকারীদের মধ্যে নতুন করে অনাস্থা তৈরি হতে পারে। এর ফলে ব্যাংক খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বিরোধীদলীয় উপনেতা বলেন, আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং সৎ, দক্ষ ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংক পরিচালনা করতে হবে। একই সঙ্গে অতীতের বিতর্কিত মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা পরিবর্তনের ঘটনাগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান তিনি।
সংসদে বক্তব্যের এক পর্যায়ে তাহের বলেন, গ্রাহকদের উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা দূর করা না গেলে পরিস্থিতি ভবিষ্যতে আন্দোলনের দিকে গড়াতে পারে। তাই দ্রুত স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করে জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।