শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পরীক্ষামূলক সংস্করণ

সমীকরণ

‘ছয় মাসে সব ঠিক করে ফেলেছি বললে মিথ্যা বলা হবে’: ড. আসাদুজ্জামান রিপন

আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, রাষ্ট্রের ‘বিএনপির পুলিশ’, ‘বিএনপির বিচারপতি’ বা ‘বিএনপির সচিব’ দরকার নেই। রাষ্ট্রের প্রয়োজন যোগ্য ও পেশাদার কর্মকর্তা। তারা যদি সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করেন, সেটিই সরকারের জন্য যথেষ্ট।

নিউজ ডেস্ক

০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪:৫১

২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর গঠিত সরকারের ছয় মাস পার হয়েছে। ১৮০ দিনের পরিকল্পনা, অর্থনীতি ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকট এবং প্রশাসনে সুশাসন—এই সময়ে সরকারের অর্জন কতটা, আর কোথায় ঘাটতি রয়ে গেছে?

এসব বিষয় নিয়েই দৈনিক সকালের টকশো ‘সকালের সমীকরণ’-এ কথা বলেছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ভাইস চেয়ারম্যান ড. আসাদুজ্জামান রিপন

তার মতে, দীর্ঘ সময় পর জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার পাওয়া একটি বড় অর্জন। তবে ছয় মাসে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয় বলেও মনে করেন তিনি। একই সঙ্গে সরকারের কোথায় আরও কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন, সে বিষয়েও নিজের মূল্যায়ন তুলে ধরেছেন বিএনপির এই নেতা।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সোনিয়া হক।

সম্পূর্ণ আলোচনা দেখতে ছবির ওপরে ক্লিক করুন

সরকারের ছয় মাস: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি

জনগণের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা ছিল একটি নির্বাচিত সরকার পাওয়া। দীর্ঘ সময় পর জনগণ নিজের ভোটে একটি সরকার বেছে নিতে পেরেছে। আমার কাছে এটিই সবচেয়ে বড় অর্জন। গণতন্ত্র নতুন করে যাত্রা শুরু করেছে। জনগণ তাদের পছন্দের প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ পেয়েছে।

নির্বাচিত সরকারই সবচেয়ে বড় অর্জন

দৈনিক সকাল: সরকারের বয়স ছয় মাস পার হয়েছে। ১৮০ দিন পর সরকারের কার্যক্রম মূল্যায়নের কথাও বলা হয়েছিল। এই সময়ে জনগণের প্রত্যাশার কতটুকু প্রাপ্তি ঘটেছে বলে মনে করেন?

ড. আসাদুজ্জামান রিপন: প্রথমে বলব, জনগণের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা হচ্ছে—তারা একটি নির্বাচিত সরকার পেয়েছে। দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর পর জনগণ নিজের ভোটে একটি নির্বাচিত সরকার পেয়েছে। আমার কাছে এটিই সবচেয়ে বড় অর্জন।

গণতন্ত্রের পথে নতুন করে যাত্রা শুরু হয়েছে। জনগণ তার ইচ্ছা অনুযায়ী সরকার বেছে নিতে পেরেছে, পছন্দের প্রধানমন্ত্রী পেয়েছে, সংসদ পেয়েছে। এর জন্য আমাদের অনেক মানুষ জীবন দিয়েছেন।

কেউ প্রশ্ন করতে পারেন, শুধুই কি একটি জাতীয় সংসদ বা একটি সরকারের জন্য মানুষ জীবন দিয়েছে? আমি বলব, ভোটের অধিকারের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি সত্যিকারের নির্বাচিত সরকার জনগণের সরকার হয়। নির্বাচিত সরকারকে ভাবতে হয়, পরবর্তী মেয়াদে আবার তাকে ভোটে জিততে হবে।

যখন পরবর্তী নির্বাচনে জেতার চিন্তা মাথায় থাকবে, তখন সরকারকে গণমুখী কাজ করতে হবে। জনগণের ‘পালস’ বুঝতে হবে। তাদের সুখ-দুঃখ ও প্রত্যাশার কথা চিন্তা করতে হবে। মানুষ কোন কারণে বিরক্ত হচ্ছে, সেটিও মাথায় রাখতে হবে।

আমার মতে, অতীতে এই জবাবদিহির জায়গাটি ছিল না। এখন সরকার ইচ্ছা করলেই জনগণকে উপেক্ষা করে চলতে পারবে না। জনগণের কাছে জবাবদিহিতার একটি জায়গা তৈরি হয়েছে।

মানুষের প্রয়োজন আর্থিক নিরাপত্তা

দৈনিক সকাল: কিন্তু গণঅভ্যুত্থানের পর মানুষের প্রত্যাশা শুধু একটি নির্বাচনেই সীমাবদ্ধ ছিল না। সাধারণ মানুষ খেয়ে-পরে শান্তিতে থাকতে চায়। দ্রব্যমূল্য, নিত্যপণ্যের দাম ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের জায়গায় সরকার কতটা প্রত্যাশা পূরণ করতে পেরেছে?

ড. আসাদুজ্জামান রিপন: গণতান্ত্রিক সরকারের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, তাকে প্রশ্ন করা যাবে। তাকে বেশি সমালোচনা শুনতে হবে। যে রাষ্ট্রে বা যে সরকারের আমলে প্রশ্ন করা যায় না, প্রশ্ন তোলা যায় না, সেটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা হতে পারে না।

আপনি ঠিকই বলেছেন, গণঅভ্যুত্থানের পর মানুষের আকাঙ্ক্ষা ছোট নয়; বরং অনেক বড়, আকাশচুম্বী।

মানুষ জবাবদিহিমূলক সরকার চায়। একই সঙ্গে সেই সরকারের কাছে জানমালের নিরাপত্তা চায়। সে তার চাকরির নিরাপত্তা চায়। তবে সবাই তো চাকরি করে না। তাই আমি এটিকে ‘ইনকাম সিকিউরিটি’ বা আয়ের নিরাপত্তা বলব। মানুষের আয়ের সংস্থান থাকতে হবে।

জীবনধারণের নিরাপত্তা বলতে শুধু চুরি-ডাকাতি বা সন্ত্রাসীর ভয় থেকে মুক্ত থাকা নয়। আমি যেন বাজারে যেতে পারি, প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে পারি, সন্তানের মুখে খাবার তুলে দিতে পারি—এটাও নিরাপত্তা। অর্থাৎ মানুষ আর্থিক নিরাপত্তা চায়।

আমাদের সংবিধানে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার কথা বলা হয়েছে। শিক্ষা, চিকিৎসা ও ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার মানুষের রয়েছে।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ৫৫ বছরের বাংলাদেশে আমরা কি প্রত্যেক নাগরিককে ক্ষুধামুক্ত করতে পেরেছি? শিক্ষার ক্ষেত্রেও দেখবেন, প্রচুর শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে। কেউ তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির পর আর পড়ছে না, কেউ অষ্টম শ্রেণির পর যাচ্ছে না, কেউ মাধ্যমিকের পর উচ্চমাধ্যমিকে যেতে পারছে না।

সবাইকে মাস্টার্স করতে হবে, এমন নয়। উন্নত দেশেও সবাই উচ্চশিক্ষার সর্বোচ্চ পর্যায়ে যায় না। কিন্তু আমাদের দেশে অনেকের শিক্ষাজীবন থেমে যাওয়ার পেছনে বড় কারণ আর্থিক সংকট।

দৈনিক সকাল: অর্থাৎ শিক্ষার ক্ষেত্রেও আপনি আর্থিক নিরাপত্তার প্রশ্নটিকেই সামনে আনছেন?

ড. আসাদুজ্জামান রিপন: অবশ্যই। একজন বাবা-মা তার সন্তানকে স্কুলে পাঠাবেন। কিন্তু স্কুলে পাঠানোর আগে তো তাকে পেট ভরে খাওয়াতে হবে। সেই বাবা-মায়ের আর্থিক সংগতি থাকতে হবে।

আমাদের দেশের অনেক দরিদ্র পরিবারের সন্তান, বিশেষ করে গৃহকর্মে যুক্ত মানুষের সন্তানদের দেখবেন অল্প বয়সেই কাজে লেগে যাচ্ছে। এটাকেই আমরা শিশুশ্রম বলি।

যে শিশুর স্কুলে থাকার কথা, পাঠ্যবইয়ে মনোযোগ দেওয়ার কথা, খেলার মাঠে থাকার কথা—তাকে আপনি হয়তো রাস্তায় ফুল বা অন্য কিছু বিক্রি করতে দেখছেন। কারণ তার বাবা-মা তাকে বাড়তি আয়ের জন্য কাজে পাঠাচ্ছেন।

এর মূলেও আর্থিক নিরাপত্তার প্রশ্ন রয়েছে। আমরা এখনো সবার জন্য সেই আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারিনি।

তবে আমাদের সরকার মাত্র ছয়-সাত মাস হলো দায়িত্ব নিয়েছে। রাতারাতি সবকিছু পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।

দেশের প্রকৃত অবস্থা জানানো উচিত ছিল

দৈনিক সকাল: এই ছয় মাসে এমন কী ছিল, যা সরকার করতে পারত কিন্তু করেনি?

ড. আসাদুজ্জামান রিপন: আমি বারবার বলেছি, একটি কাজ সরকার করতে পারত। দায়িত্ব গ্রহণের পর দেশের প্রকৃত অবস্থা জনগণের সামনে তুলে ধরতে পারত।

আমার মূল্যায়ন হচ্ছে, বিগত সময়ে দেশে শুধু কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থাই ছিল না, একই সঙ্গে ব্যাপক লুটপাটও হয়েছে। আমি ফ্যাসিজম ও লুটপাটকে আলাদা করে দেখি। একটি সরকার ফ্যাসিস্ট হতে পারে, কিন্তু সে অবশ্যই লুটেরা হবে—এমন নয়।

উদাহরণ হিসেবে হিটলারের কথা বলা যায়। হিটলার ফ্যাসিস্ট ছিলেন, কিন্তু জার্মান জনগণের সম্পদ লুট করে নিজের পরিবারের জন্য ব্রিটেন বা ফ্রান্সে পাঠিয়ে রেখেছিলেন—এমন নয়। মুসোলিনির ক্ষেত্রেও একই ধরনের আলোচনা করা যায়।

কিন্তু বাংলাদেশে বিগত সরকারের ক্ষেত্রে আমার অভিযোগ হচ্ছে, কর্তৃত্ববাদের পাশাপাশি রাষ্ট্রের সম্পদ লুট এবং বিদেশে অর্থ পাচারের ঘটনাও ঘটেছে।

আপনি দেখছেন, আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী-নেতাদের অনেকে এখন লন্ডন, ইউরোপ বা অন্য জায়গায় বিলাসবহুল জীবনযাপন করছেন। আমার বক্তব্য হচ্ছে, জনগণ ও দেশের অর্থ লুট করে বিদেশে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

ভারতেও আওয়ামী লীগের বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী অবস্থান করছেন বলে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে। সেখানে তারা কীভাবে জীবনযাপন করছেন—এই প্রশ্নও আসে।

ব্যাংকগুলোর অবস্থাও দেখুন। আমার বক্তব্য হচ্ছে, ব্যাংকের ভল্ট পর্যন্ত খালি করে ফেলা হয়েছে। একটি ব্যক্তি বা একটি গ্রুপের হাতে সাতটি ব্যাংকের মালিকানা যাওয়ার মতো ঘটনাও বাংলাদেশে ঘটেছে।

দৈনিক সকাল: তাহলে দায়িত্ব নেওয়ার পর সরকারের কী করা উচিত ছিল?

ড. আসাদুজ্জামান রিপন: সরকারের উচিত ছিল দায়িত্ব নেওয়ার কিছুদিন পরই একটি শ্বেতপত্রের মতো কিছু প্রকাশ করা।

দায়িত্ব নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই যদি সব তথ্য না থাকে, এক মাস পরে না পারলে তিন মাস পরে করত। তিন মাসেও না পারলে ছয় মাস পরে করত।

এখন ছয় মাস পার হয়েছে। সরকার তো বুঝেছে কোথায় কী নেই, কোন খাতে কী সমস্যা। এলএনজি সময়মতো কেনা যাচ্ছে কি না, আমদানি কমে যাচ্ছে কেন, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান কেন আমদানি করতে পারছে না, ডলারের ঘাটতি কোথায়, ঋণখেলাপির পরিস্থিতি কী—এসব এখন সরকারের জানা থাকার কথা।

সরকার জনগণকে বলতে পারত, ‘আমরা একটি ভগ্নস্তূপের মধ্যে দায়িত্ব গ্রহণ করেছি।’

‘সাড়ে সাত কোটির জন্য আট কোটি কম্বল’

দৈনিক সকাল: আপনি ঐতিহাসিক একটি উদাহরণও দিতে চাচ্ছিলেন।

ড. আসাদুজ্জামান রিপন: হ্যাঁ। ১৯৭২ সালে শেখ মুজিবুর রহমান দেশে ফিরে অকপটে বলেছিলেন, পাকিস্তানি বাহিনী দেশকে লুট করে একটি ভগ্নস্তূপ রেখে গেছে। তিনি জনগণের কাছে সময় চেয়েছিলেন। মানুষও সেটি গ্রহণ করেছিল।

আমার কিশোর বয়সে এসব কথা শুনেছি। মানুষ বাস্তব পরিস্থিতি বুঝেছিল।

কিন্তু মানুষ কখন বিরক্ত হয়? যখন দেখে সুশাসন নেই।

শেখ মুজিবুর রহমানের একটি বহুল আলোচিত বক্তব্য আছে। তিনি বলেছিলেন, ‘সাড়ে সাত কোটি মানুষের জন্য আট কোটি কম্বল আসলো, আমার কম্বল গেল কোথায়?’

সাড়ে সাত কোটি মানুষের জন্য আট কোটি কম্বল এলে হিসাব অনুযায়ী প্রত্যেকের অন্তত একটি করে কম্বল পাওয়ার কথা। একটি পরিবারে সাতজন থাকলে সাতটি কম্বল পাওয়ার কথা।

একজন প্রধানমন্ত্রী যখন নিজেই প্রশ্ন করেন, ‘আমার কম্বল গেল কোথায়?’ তখন বোঝা যায়, ব্যবস্থাপনার মধ্যে সমস্যা ছিল, সুশাসনের ঘাটতি ছিল।

একইভাবে তিনি আক্ষেপ করে বলেছিলেন, তার ডানে চোর, বামে চোর, সামনে চোর, পেছনে চোর। আবার ‘চোরের খনি’ পাওয়ার কথাও বলেছিলেন।

আমি এই উদাহরণগুলো দিচ্ছি এ কারণে যে, দেশের প্রকৃত পরিস্থিতি জনগণের কাছে বলা যায়। বর্তমান বিএনপি সরকারেরও উচিত ছয় মাস পরে দাঁড়িয়ে বলা—আমরা বাংলাদেশকে কোন অবস্থায় পেয়েছি, কোথায় কতটা সমস্যা ছিল এবং আমরা কী করছি।

এক টাকার জিনিস দশ টাকায় কিনে সেই প্রকল্পের জন্য ঋণ নেওয়া হয়েছে। এখন সেই ঋণের কিস্তি বর্তমান সরকারকে দিতে হচ্ছে। আমি এটাকে বলি, ‘চুরির টাকার কিস্তি শোধ করা।’

দৈনিক সকাল: আগের সময়ের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের দায় বর্তমান সরকারকে বহন করতে হচ্ছে—এমনটাই কি বলতে চাইছেন?

ড. আসাদুজ্জামান রিপন: অবশ্যই। ধরুন, এক টাকার জিনিস দশ টাকায় কেনা হয়েছে এবং সেই প্রকল্পের জন্য ঋণ নেওয়া হয়েছে। এখন সেই ঋণের কিস্তি তো বর্তমান সরকারকেই দিতে হচ্ছে।

আমি এটাকে বলি, ‘চুরির টাকার কিস্তি শোধ করা।’

আগের সময়ে যদি অতিরিক্ত মূল্যে কোনো কিছু কেনা হয়ে থাকে, সেই ঋণের কিস্তি বর্তমান সরকারকে শোধ করতে হচ্ছে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন, এলএনজি আমদানি বা অন্য প্রয়োজনীয় খাতে অর্থ ব্যয় করার সক্ষমতার ওপরও চাপ পড়ে।

এই বাস্তবতা জনগণের সামনে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা দরকার।

সরকার বলতে পারে, ‘এই পরিস্থিতি আমরা পেয়েছি। আমরা জানি, আপনাদের আমাদের কাছে অনেক প্রত্যাশা আছে। আমরা আপনাদের সুশাসন দিতে চাই, তবে আমাদের কিছুটা সময় প্রয়োজন।’

আইনশৃঙ্খলা ও পুলিশের কার্যকারিতা

দৈনিক সকাল: সুশাসনের কথায় আসি। ছিনতাই, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও দখলদারত্ব বন্ধের ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ে সরকারের উদ্যোগ কতটা দেখছেন? সম্প্রতি সংসদ ভবন এলাকাতেও ছিনতাইয়ের শিকার হয়ে এক নারীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। আইনশৃঙ্খলা তো সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকার কথা।

ড. আসাদুজ্জামান রিপন: স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে অবশ্যই তাই। একটি সরকারের কাছে আপনি প্রত্যাশা করবেন, পুলিশ তার নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও নিয়ন্ত্রণে থাকবে।

পুলিশ সরকারের নিয়ন্ত্রণে আছে। কিন্তু কাজ করার জন্য আপনার কার্যকর ‘টুল’ বা যন্ত্র প্রয়োজন। যে যন্ত্র দিয়ে কাজ করবেন, সেটি যদি ভোঁতা হয়ে যায়, তাহলে সেটি দিয়ে কার্যকরভাবে কাজ করা কঠিন।

আমার মতে, বর্তমান সরকার যে পুলিশ বাহিনী পেয়েছে, প্রতিষ্ঠান হিসেবে সেটি অত্যন্ত ভঙ্গুর অবস্থায় ছিল। দীর্ঘ সময় ধরে বিগত সরকার পুলিশকে এত বেশি রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করেছে যে প্রতিষ্ঠানটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

আমার অভিযোগ হচ্ছে, পুলিশকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হিসেবে রাখার পরিবর্তে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছে। গুম, হয়রানি, মাদক মামলার ভয় দেখানো এবং অর্থ আদায়ের মতো গুরুতর অভিযোগও অতীতে পুলিশের বিরুদ্ধে উঠেছে।

পোশাক পরে এ ধরনের কাজ করা হলে সেটি তো একধরনের ডাকাতির মতোই।

দৈনিক সকাল: আপনার বক্তব্য হচ্ছে, রাজনৈতিক ব্যবহারের কারণে পুলিশের পেশাদারত্ব নষ্ট হয়েছে?

ড. আসাদুজ্জামান রিপন: আমার মূল্যায়ন সেটিই। বিগত সরকারের সময়ে পুলিশকে নির্বাচনসহ রাজনৈতিক কাজে ব্যবহার করা হয়েছে।

এমন অবস্থাও তৈরি হয়েছিল যে পুলিশের অনেক সদস্য মনে করতেন, তারাই সরকারকে ক্ষমতায় রেখেছেন। আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গেও বিভিন্ন টকশোতে আমার কথা হয়েছে। ব্যক্তিগত আলোচনায় তাদের কেউ কেউ বলতেন, পুলিশ এমপিদের কথাও অনেক সময় শুনত না।

কারণ তাদের মধ্যে এমন একটি মনোভাব তৈরি হয়েছিল—‘তোমাকে তো আমরাই এমপি বানিয়েছি।’

একটি প্রতিষ্ঠানকে যখন এভাবে দীর্ঘ সময় ব্যবহার করা হয়, তখন তার স্বাভাবিক পেশাদার কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এরপর গণঅভ্যুত্থান হয়েছে। সেই সময় পুলিশও জনগণের তোপের মুখে পড়েছে, পুলিশের মধ্যেও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। ফলে গণঅভ্যুত্থান ও গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতিতে পুলিশের মধ্যে একধরনের ট্রমা তৈরি হয়েছে।

দৈনিক সকাল: এখন পুলিশের মধ্যে কী ধরনের সমস্যা দেখছেন?

ড. আসাদুজ্জামান রিপন: আমার পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, পুলিশ অনেকটাই নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে। তারা সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে—কোনটা করবে, কোনটা করলে আবার সমস্যায় পড়বে, এ ধরনের দ্বিধা রয়েছে।

পোশাক পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু মনস্তাত্ত্বিকভাবে তারা অনেকটা নিচে নেমে গেছে।

এখানে আমি একটি কথা পরিষ্কার করতে চাই। আমি রাজনীতি করি মানুষের জন্য, দেশের জন্য। রাজনীতি আমার পেশা নয়। রাজনীতি করে নিজের পেট চালানো, চুরি-বাটপারি বা দুর্বৃত্তপনা করা আমার উদ্দেশ্য নয়।

এই জায়গা থেকেই বলছি, পুলিশকে আবার কার্যকর অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হবে।

দৈনিক সকাল: পুলিশ সদর দপ্তরের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ১ হাজার ২৮৯ জন খুন হয়েছেন, ১১ হাজার ১৬৫ জন নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, ৫১২টি অপহরণ, ৪০৫টি ছিনতাই এবং চুরি-ডাকাতিসহ পুলিশের ওপর ৩৫০টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এই পরিস্থিতিকে কীভাবে দেখছেন?

ড. আসাদুজ্জামান রিপন: আমি এটাকে শুধু অস্থিরতা বলব না, আমি বলব ‘ইনার্শিয়া’। অর্থাৎ একধরনের স্থবিরতা।

তাদের মধ্যে সিদ্ধান্তহীনতা আছে, ইতস্তত ভাব আছে—কী করবে, কী করবে না, তা নিয়ে দ্বিধা রয়েছে।

আমি সরকারি কেউ নই। এমপি বা মন্ত্রীও নই। যে দল সরকার পরিচালনা করছে, সেই দলের একটি পদে আছি। ফলে আমার কথা শুনে কেউ ভাবতে পারেন, আমি সরকারকে সমর্থন করার জন্য এসব বলছি।

কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতিটা চিন্তা করতে হবে। গণঅভ্যুত্থানের সময় এবং তার পরবর্তী দেড় বছরে যে পরিস্থিতি ছিল, তার সঙ্গে পুলিশের অবস্থাও বিবেচনা করতে হবে।

শুধু পুলিশ নয়, বেসামরিক প্রশাসনেও একই ধরনের সমস্যা রয়েছে।

আমার কাছে বরং মনে হয়, পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারত। আমাদের দেশের মানুষ সামগ্রিকভাবে ভালো বলেই হয়তো তা হয়নি।

কার্যকর পুলিশ, প্রশাসন ও বিচার বিভাগ প্রয়োজন

দৈনিক সকাল: অপরাধপ্রবণতা এবং আইনশৃঙ্খলার প্রয়োজনীয়তা বোঝাতে আপনি নেপালের বন্যার একটি উদাহরণ দিয়েছিলেন।

ড. আসাদুজ্জামান রিপন: মানুষ চরিত্রগতভাবেই অনেক সময় অপরাধপ্রবণ হয়ে পড়ে। নেপালে এত বড় বন্যা হলো। ব্যাংকও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হলো, ব্যাংকের ভল্ট পর্যন্ত ভেসে গেল।

এমন একটি দুর্যোগে মানুষের প্রথম কাজ হওয়ার কথা নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়া এবং বিপদে থাকা মানুষকে উদ্ধার করা। কিন্তু দেখা গেল, কেউ কেউ ভেসে যাওয়া ব্যাংকের ভল্ট বা অর্থের দিকে ছুটছে।

নিজের জীবন ঝুঁকিতে থাকা সত্ত্বেও কারও মাথায় অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার চিন্তা আসতে পারে।

এই কারণেই কার্যকর আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কার্যকর পুলিশ দরকার, কার্যকর বেসামরিক প্রশাসন দরকার এবং বিচার বিভাগও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

দৈনিক সকাল: বিচার বিভাগ নিয়েও আপনার সমালোচনা আছে?

ড. আসাদুজ্জামান রিপন: অবশ্যই। গণঅভ্যুত্থানের পর বিচারকদেরও পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা আমরা দেখেছি। প্রশ্ন হচ্ছে, বিচারককে কেন পালাতে হবে?

বাংলাদেশে কি এই প্রথম অভ্যুত্থান হয়েছে? ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ঘটনা হয়েছে, ৭ নভেম্বরের ঘটনা হয়েছে, ১৯৯০ সালে গণঅভ্যুত্থান হয়েছে। তখন কি এভাবে বিচারকদের পালিয়ে যেতে হয়েছে?

আমার বক্তব্য হচ্ছে, যখন কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয় এবং এমন কাজ করে, যার জন্য নিজের মধ্যেই ভয় তৈরি হয়, তখন পরিস্থিতি পরিবর্তন হলে স্বাভাবিকভাবে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

আমাদের দেশে তো গানও হয়েছে—‘বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা আজ জেগেছে সেই জনতা।’ অর্থাৎ বিচারব্যবস্থার জবাবদিহির প্রশ্ন এ দেশের মানুষের কাছে নতুন নয়।

দৈনিক সকাল: একই সমস্যা কি বেসামরিক প্রশাসনেও দেখছেন?

ড. আসাদুজ্জামান রিপন: হ্যাঁ। বিগত সরকারের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে যারা প্রশাসনে কাজ করেছেন, তাদের অনেকেই এখন নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন বলে আমার মনে হয়।

অনেকে এখন এমনভাবে চলছেন, যেন কিছুই জানেন না। ফলে প্রশাসনের কাজও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

পুলিশসহ বিভিন্ন সরকারি চাকরিতে বিগত সরকারের সময়ে নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয় যাচাইয়ের অভিযোগ ছিল। কার পরিবার বিএনপি করে, কে ভিন্নমতের—এসব পর্যন্ত দেখা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।

সেই সময়ে নিয়োগ পাওয়া সবাইকে তো এখন একসঙ্গে বাদ দেওয়া সম্ভব নয়। তারা এখনো ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছেন। তাদের নিয়েই সরকারকে কাজ করতে হচ্ছে।

আমার পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, তাদের একটি অংশ সক্রিয়ভাবে কাজ না করে সময় পার করছে।

বিদ্যুৎ-গ্যাস খাতে দুর্নীতি ও কৃত্রিম সংকটের আশঙ্কা

দৈনিক সকাল: বিদ্যুৎ ও গ্যাস খাতে এখনো দুর্নীতি কিংবা কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা হচ্ছে বলে মনে করেন?

ড. আসাদুজ্জামান রিপন: বিদ্যুৎ-গ্যাস খাতে দুর্নীতির অভিযোগ অবশ্যই আছে। কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টাও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

কারণ এখানে দুই-চার বা দশ-বিশ টাকার ব্যবসা নয়; বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা।

কৃত্রিম সংকট তৈরি করে যদি গ্যাস বা এলএনজি আমদানির খরচ বাড়ানো যায়, তাহলে কেউ কেউ রাতারাতি বিপুল অর্থের মালিক হয়ে যেতে পারে। ফলে স্বার্থান্বেষী বা ধান্দাবাজ মহলের তৎপরতা থাকবে—এটা মাথায় রাখতে হবে।

কিন্তু একই সঙ্গে সরকারকে বুঝতে হবে, তারা এমন একটি ব্যবস্থার মধ্যে দায়িত্ব নিয়েছে, যেখানে কাজ করার জন্য যেসব প্রশাসনিক ‘টুলস’ রয়েছে, তার অধিকাংশই আগের সরকারের রেখে যাওয়া।

সবকিছু একদিনে বাদ দিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। তাদের নিয়েই সরকারকে চলতে হবে। তাই যুদ্ধংদেহী মনোভাব নয়; ধীরস্থির পরিকল্পনার মাধ্যমে নতুন করে এগোতে হবে।

গভর্ন্যান্সের প্রশ্নেও রাতারাতি সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে না। কিন্তু তার মানে এই নয় যে হাল ছেড়ে দিতে হবে।

বিনিয়োগের জন্য চারটি বিষয় জরুরি

দৈনিক সকাল: মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে। মূল্যস্ফীতি, বাসাভাড়া, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও তেলের দাম—সব মিলিয়ে চাপ বাড়ছে। আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো এবং বিনিয়োগ বাড়াতে সরকারের অগ্রগতি কীভাবে দেখছেন?

ড. আসাদুজ্জামান রিপন: বিনিয়োগের জন্য আমার মতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্যারামিটার আছে।

প্রথমত, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ আপনি কলকারখানা করবেন, সেখানে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি লাগবেই।

দ্বিতীয়ত, স্থিতিশীলতা দরকার। একটি স্থিতিশীল সরকার ও রাজনৈতিক পরিবেশ থাকতে হবে।

তৃতীয়ত, আইনশৃঙ্খলা শক্তিশালী থাকতে হবে।

চতুর্থত, সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে।

একজন বিনিয়োগকারী একটি ফাইল দিলেন। তিন মাস পর গেলে তাকে বলা হলো—জানি না, কাল আসেন। দুই মাস পরে আবার গেলে বলা হলো—ফাইল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এটা সুশাসন নয়।

বিনিয়োগ আনতে হলে প্রথমে এনার্জি সিকিউরিটি নিশ্চিত করতে হবে।

দৈনিক সকাল: কিন্তু বর্তমানে তো বিদ্যুৎ সংকট ও লোডশেডিং আছে। অনেক কারখানা প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ পাচ্ছে না।

ড. আসাদুজ্জামান রিপন: ঠিক। কিন্তু বিকল্পও চিন্তা করতে হবে।

সরকার শুধু বলবে, আগের সরকার এই অবস্থা করে গেছে—এতেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। জনগণ আগের সরকারের ভূমিকা জানে। কিন্তু এখন জনগণকে উদ্ধার করবে কে?

নেপালে বন্যা হলে সেখানকার সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে মানুষকে উদ্ধার করা, পুনর্বাসন করা এবং পুনর্গঠন করা।

একইভাবে আমাদের দেশে যদি বিপর্যস্ত অর্থনীতি, বিপর্যস্ত আইনশৃঙ্খলা এবং বিপর্যস্ত প্রশাসন থাকে, তাহলে বর্তমান সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়ানো, পুনর্গঠন করা এবং জনগণকে স্বপ্ন দেখানো।

ছাদকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে ব্যবহারের প্রস্তাব

দৈনিক সকাল: বিদ্যুতের ক্ষেত্রে আপনি সোলার প্যানেল নিয়ে একটি বড় পরিকল্পনার কথা বলছেন। সেটি কী?

ড. আসাদুজ্জামান রিপন: আমি মনে করি, বিদ্যুতের ক্ষেত্রে একটি প্রাগম্যাটিক সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়।

সরকার বলতে পারে, প্রতিটি বাড়ির ছাদে সোলার প্যানেল ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

গ্রামে মানুষ যেমন বাড়ির আঙিনায় নিজের প্রয়োজনের জন্য গাছ লাগায়, একইভাবে ছাদকেও বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে ব্যবহার করা যায়।

দৈনিক সকাল: কিন্তু সোলার প্যানেল ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের দামও তো বাড়ছে।

ড. আসাদুজ্জামান রিপন: আমি সেটাই বলছি। ধরুন, ঢাকা শহরে দশ লাখ বাড়ি আছে। দশ লাখ বাড়ির জন্য সোলার প্যানেল গুলিস্তান বা গুলশানের দোকান থেকে খুচরা কিনলে হবে না।

সরকার যখন নীতিগত সিদ্ধান্ত নেবে, তখন বিপুল পরিমাণে সোলার প্যানেল আমদানি করতে হবে।

পাকিস্তানও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে চীনের সোলার প্যানেলের বড় বাজারে পরিণত হয়েছে।

এখন ধরুন, একটি বাড়িতে সোলার প্যানেল বসাতে দশ লাখ টাকা লাগবে। একজন বাড়ির মালিকের কাছে হয়তো এই মুহূর্তে দশ লাখ টাকা নেই। শুধু সরকার বলে দিল—সোলার লাগান; তাহলে তো তিনি লাগাতে পারবেন না।

এখানেই ব্যাংকের ভূমিকা আসতে পারে।

দৈনিক সকাল: ব্যাংক কীভাবে অর্থায়ন করবে?

ড. আসাদুজ্জামান রিপন: ব্যাংকগুলোর কাছে বিনিয়োগযোগ্য তারল্য আছে, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে বিনিয়োগের জায়গা পাচ্ছে না—এমন তথ্যও আমরা দেখছি।

নতুন কলকারখানায় বিনিয়োগ কম হলে এই অর্থ সোলার প্রকল্পে বিনিয়োগ করা যেতে পারে।

একজন বাড়ির মালিক ব্যাংকে যাবেন। তিনি বাড়ির মালিক—এটি প্রমাণ করবেন। এরপর ব্যাংক নির্দিষ্ট অনুপাতে তাকে অর্থায়ন করবে। সেটা ৫০ শতাংশ, ৭০ শতাংশ বা নীতিমালা অনুযায়ী অন্য কোনো হার হতে পারে।

ব্যাংকের এই ঋণ দিতে দ্বিধা করার কারণ কম। কারণ আল্লাহর দেওয়া সূর্যের আলো পাওয়া যাচ্ছে। প্যানেল বসানোর পর থেকেই বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে।

বাংলাদেশ ইউরোপ বা আমেরিকার মতো কম সূর্যালোকের দেশ নয়। এখানে পর্যাপ্ত সূর্যের আলো রয়েছে।

দৈনিক সকাল: উৎপাদিত বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় কীভাবে যুক্ত হবে?

ড. আসাদুজ্জামান রিপন: প্রতিটি বাড়ির সোলার প্যানেল যদি পরস্পরের সঙ্গে এবং শেষ পর্যন্ত জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তাহলে বাড়িগুলো বিদ্যুৎ উৎপাদক হয়ে যাবে।

যেমন ইন্টারনেট বা ডিশ লাইনের ক্ষেত্রে বাড়ি থেকে বাড়ি সংযোগ রয়েছে, একইভাবে একটি সমন্বিত ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

ধরুন, একটি বাড়ি আজ ১০০ টাকার বিদ্যুৎ উৎপাদন করল। সেই বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে গেল। বিদ্যুৎ বিভাগ সেই বিদ্যুৎ অন্য কোনো কারখানা বা গ্রাহকের কাছে বিক্রি করল। গ্রাহক বিল দিল।

সেই অর্থের একটি অংশ ব্যাংকের ঋণ পরিশোধে চলে যেতে পারে।

তাহলে ব্যাংকের সামনে একটি বড় বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে, বাড়ির মালিক বিদ্যুৎ উৎপাদন করবেন, জাতীয় গ্রিড বিদ্যুৎ পাবে এবং শিল্পকারখানাও বিদ্যুৎ পাবে।

আমি মনে করি, এটিকে বড় পরিসরে চিন্তা করা সম্ভব।

প্রতিটি বাড়ির সোলার প্যানেল জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে বাড়িগুলো বিদ্যুৎ উৎপাদক হয়ে উঠবে। ব্যাংক বিনিয়োগের সুযোগ পাবে, জাতীয় গ্রিড বিদ্যুৎ পাবে এবং শিল্পকারখানাও উপকৃত হবে।

প্রতিহিংসা ও বিচার এক নয়

দৈনিক সকাল: রাজনৈতিক সহাবস্থান, জবাবদিহিতা এবং বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গড়ার অঙ্গীকার করা হয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে বেরিয়ে আসার বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখছেন?

ড. আসাদুজ্জামান রিপন: প্রথমে প্রতিহিংসা ও বিচারের পার্থক্য বুঝতে হবে।

প্রতিহিংসা মানে হচ্ছে—ওরা আমাদের জেলে পাঠিয়েছে, নির্যাতন করেছে, তাই আমরাও তাদের একইভাবে শেষ করে দেব। আমি সেটার কথা বলছি না।

মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা সশস্ত্রভাবে বিরোধিতা করেছে, মানুষ হত্যা করেছে, তাদের কেউ কেউ বিচারের সম্মুখীন হয়েছে। হিটলারের সময়কার অপরাধের বিচারও বহু বছর পরে হয়েছে।

সুতরাং প্রতিহিংসা এক জিনিস, বিচার আরেক জিনিস।

একজন ছিনতাইকারী যদি কাউকে হত্যা করে, নিহত ব্যক্তির পরিবার কি বলবে—আমি প্রতিহিংসা চাই না, তাই বিচারও চাই না? নিশ্চয়ই নয়।

তারা বিচার চাইবে।

প্রতিহিংসা হচ্ছে বিচারবহির্ভূতভাবে কাউকে নিঃশেষ করে দেওয়া। আর ন্যায়বিচার হচ্ছে আইন অনুযায়ী অপরাধের বিচার করা।

দৈনিক সকাল: গণঅভ্যুত্থানের সময় নিহতদের বিচারের ক্ষেত্রেও কি একই কথা বলছেন?

ড. আসাদুজ্জামান রিপন: অবশ্যই। গণঅভ্যুত্থানে ১২৫টি শিশু হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে বলে যে হিসাব এসেছে, সেই শিশুর মা কি বলবেন—আমি বিচার চাই না?

তিনি প্রতিহিংসা নাও চাইতে পারেন, কিন্তু সন্তানের হত্যার বিচার চাইবেন।

আমি একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে, একজন বাবা হিসেবে, একজন ভাই হিসেবে, একজন স্বামী হিসেবে বলছি—প্রতিহিংসা করার প্রয়োজন নেই। কিন্তু ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

যে মা সন্তান হারিয়েছেন, তার সন্তানের হত্যাকারীর বিচার হবে না কেন?

যারা দেশের সম্পদ লুট করে বিদেশে সম্পদ করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে, তাদের বিচার হবে না কেন?

একজন সাবেক ভূমিমন্ত্রীর বিদেশে শত শত ফ্ল্যাট থাকার যে খবর প্রকাশিত হয়েছে—সেসব অভিযোগের বিচার হবে না কেন?

এখানে প্রধানমন্ত্রীর ‘প্রতিহিংসা নয়’ বক্তব্যের সঙ্গে বিচারকে গুলিয়ে ফেললে চলবে না। প্রতিহিংসা ও বিচার সমার্থক নয়।

প্রতিহিংসা হচ্ছে অন্যায়ভাবে কারও ওপর জুলুম করা। কিন্তু মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে।

আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ জনগণই নির্ধারণ করবে

দৈনিক সকাল: আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?

ড. আসাদুজ্জামান রিপন: আমার বক্তব্য হচ্ছে, কোনো রাজনৈতিক দল ভুল রাজনীতি করলে তাকে শেষ করার জন্য প্রতিশোধ নেওয়ার প্রয়োজন হয় না। জনগণই তার সিদ্ধান্ত দেয়।

উদাহরণ হিসেবে মুসলিম লীগের কথা বলা যায়।

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টিতে মুসলিম লীগ ছিল প্রধান রাজনৈতিক শক্তি। তৎকালীন পূর্ববাংলাও পাকিস্তানের অংশ হয়েছিল। কিন্তু মাত্র সাত বছরের মধ্যে, ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে ভুল রাজনীতির কারণে মুসলিম লীগ প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। এরপর আর আগের অবস্থায় ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি।

অর্থাৎ ভুল রাজনীতি করলে জনগণই একটি দলকে প্রত্যাখ্যান করতে পারে।

আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রেও আমার বক্তব্য হচ্ছে, গণঅভ্যুত্থানকে যদি তারা এখনো ষড়যন্ত্র বলে, নিজেদের ভুল স্বীকার না করে, মানুষের মৃত্যুর দায় নিয়ে অনুশোচনা না করে এবং বিগত সময়ের কর্মকাণ্ডের জন্য কোনো ‘রিমোর্স’ বা অনুতাপ না দেখায়, তাহলে তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ জনগণই নির্ধারণ করবে।

মানুষকে হত্যা, গুম এবং বিভিন্ন বাহিনীকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের যেসব অভিযোগ রয়েছে, সেগুলোর বিচার অবশ্যই হতে হবে।

রাষ্ট্রের দরকার যোগ্য মানুষ

দৈনিক সকাল: বৈষম্যের বিরুদ্ধে যে অভ্যুত্থান হলো, সেই বৈষম্য কি এখন সব জায়গায় দূর করা সম্ভব হচ্ছে? বিশেষ করে সরকারি নিয়োগে স্বজনপ্রীতি বন্ধ এবং পূর্ণ স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয়েছে কি?

ড. আসাদুজ্জামান রিপন: আমি বিষয়টি দুই ভাগে দেখব।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ, পুলিশে নিয়োগ, বিজিবিতে নিয়োগ, সেনাবাহিনীতে নিয়োগ, বিচার বিভাগে নিয়োগ—এগুলো নিয়মিত সরকারি নিয়োগ।

এসব ক্ষেত্রে অবশ্যই দলনিরপেক্ষভাবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রের জন্য কাজ করার মতো দক্ষ ও উপযুক্ত মানুষকে নিয়োগ দিতে হবে।

এখানে দলবাজির কোনো সুযোগ নেই।

সেনাবাহিনীতে একজন সৈনিক বা কর্মকর্তা নিয়োগের সময় তিনি কোন দল করেন, সেটা কেন দেখা হবে? নিয়োগের নির্দিষ্ট যোগ্যতা ও শর্ত আছে। যিনি সেসব শর্ত পূরণ করবেন, তিনিই নিয়োগ পাবেন।

দৈনিক সকাল: কিন্তু বর্তমান সরকারের সময়েও তো রাজনৈতিক নিয়োগ হয়েছে?

ড. আসাদুজ্জামান রিপন: কিছু ‘পলিটিক্যাল অ্যাপয়েন্টমেন্ট’ হয়েছে, এটি ঠিক। বিশেষ করে কিছু করপোরেশন, আধা সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের নিয়োগ হয়েছে।

কিন্তু আপনি দেখবেন, বিএনপির কোনো নেতাকে সচিব বানিয়ে দেওয়া হয়নি। সাবেক ছাত্রদল বা যুবদলের কোনো নেতাকে এনে পুলিশের আইজিপি বানিয়ে দেওয়া হয়নি। বিচারপতি পদেও এভাবে কাউকে বসানো যায় না।

এসব পদে নিয়ম ও যোগ্যতা অনুযায়ী নিয়োগ দিতে হবে।

আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি এবং আমার দলও মনে করে—

রাষ্ট্রের বিএনপির পুলিশ দরকার নেই। বিএনপির বিচারপতি দরকার নেই। বিএনপির সচিব দরকার নেই। রাষ্ট্রের দরকার উপযুক্ত ও যোগ্য মানুষ।

তারা যদি সত্যিকার অর্থে রাষ্ট্রের কাজ করেন, তাহলেই যথেষ্ট।

কর্মসংস্থান ও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি

দৈনিক সকাল: কর্মসংস্থানের বিষয়টিতে আসি। নির্বাচনী ইশতেহারে নতুন কর্মসংস্থান তৈরির আশ্বাস ছিল। দেশের বিপুলসংখ্যক বেকার তরুণ-তরুণী এখন সেই প্রতিশ্রুতির দিকে তাকিয়ে আছেন। বন্ধ রাষ্ট্রীয় শিল্পকারখানা চালু করার মাধ্যমে কর্মসংস্থান তৈরির সুযোগ কতটা?

ড. আসাদুজ্জামান রিপন: সরকার ছয়টি পাটকল বেসরকারিভাবে চালু করার বিষয়ে কাজ করছে। কিন্তু শুধু ছয়টি পাটকল দিয়ে খুব বড়সংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান হবে না।

এখানে আরেকটি বাস্তবতা বুঝতে হবে।

বিএনপি যখন নির্বাচনী ইশতেহারে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তখন দলটি সরকারে ছিল না। সেই প্রতিশ্রুতিগুলো একটি নির্দিষ্ট বা ‘আইডিয়াল’ পরিস্থিতিকে সামনে রেখে করা হয়েছিল।

কিন্তু সরকারে আসার পর বাস্তবতা বদলে যেতে পারে।

দৈনিক সকাল: অর্থাৎ আপনি বলছেন, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির সময়কার বাস্তবতা এবং সরকার পরিচালনার বাস্তবতা এক নাও হতে পারে?

ড. আসাদুজ্জামান রিপন: অবশ্যই। পৃথিবীর বড় বড় শক্তিধর দেশের ক্ষেত্রেও এটা হয়।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানকে নিয়ে যে ধরনের হিসাব করেছিলেন, বাস্তবে পরিস্থিতি তার পরিকল্পনা অনুযায়ী নাও এগোতে পারে। ইসরায়েল-ইরান সংঘাত, ইরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়া, হরমুজ প্রণালি নিয়ে পরিস্থিতি—এসব নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে।

একজন রাষ্ট্রপ্রধান যখন কোনো সিদ্ধান্ত নেন, তখন হয়তো তিনি একটি নির্দিষ্ট পরিস্থিতি কল্পনা করেন। পরে এমন নতুন চ্যালেঞ্জ সামনে আসে, যা শুরুতে তার হিসাবের মধ্যে ছিল না।

নেপালের ক্ষেত্রেও একই কথা বলা যায়। সেখানে তরুণদের আন্দোলনের পর নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। মানুষ নতুন সরকার নিয়ে নতুন স্বপ্ন দেখেছে। কিন্তু হঠাৎ বড় বন্যা এসে পুরো পরিস্থিতি বদলে দিয়েছে।

হিমালয়ের হিমবাহ ভেঙে পড়া বা বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ আপনি রাতারাতি মেরামত করতে পারবেন না। এটি সরকারের সামনে একটি নতুন ও অপ্রত্যাশিত চ্যালেঞ্জ।

আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির অভিঘাত

দৈনিক সকাল: বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও কি আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে?

ড. আসাদুজ্জামান রিপন: অবশ্যই আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির অভিঘাত রয়েছে।

তারেক রহমান যখন সরকার গঠন করলেন, তখন কি আমরা সবাই ভেবেছিলাম ইরানকে ঘিরে সংঘাতের এমন পাল্টা প্রতিক্রিয়া হবে? পুরো মধ্যপ্রাচ্যে এর অভিঘাত পড়বে? সারা পৃথিবীর জ্বালানি ও পরিবহনব্যবস্থায় চাপ তৈরি হবে?

হরমুজ প্রণালি নিয়ে সংকট তৈরি হলে বিকল্প পথে তেল আনতে হয়। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ে, পরিবহন খরচ বাড়ে।

এগুলো নতুন বাস্তবতা এবং অনেক সময় তিক্ত বাস্তবতা।

এর সঙ্গে আরও ভূরাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ সামনে আসতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যনীতি, অতিরিক্ত শুল্ক, অভিবাসননীতি, বিদেশি শিক্ষার্থীদের বিষয়ে নীতি—এসবও আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে নতুন পরিস্থিতি তৈরি করে।

একটি সরকারের সামনে প্রতিদিনই নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ আসবে।

মানুষকে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখাতে হবে

দৈনিক সকাল: তাহলে একটি দক্ষ সরকারের করণীয় কী?

ড. আসাদুজ্জামান রিপন: একটি দক্ষ সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে প্রতিদিন সামনে আসা নতুন চ্যালেঞ্জ প্রজ্ঞার সঙ্গে মোকাবিলা করা।

পরিস্থিতি কঠিন—এ কথা জনগণকে বলতে হবে। বাস্তবতাও জানাতে হবে। কিন্তু একই সঙ্গে মানুষকে হতাশ হতে দেওয়া যাবে না।

মানুষকে স্বপ্ন দেখাতে হবে। মানুষকে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখাতে হবে।

আমরা হয়তো এমন একটি নতুন তিক্ত বাস্তবতার মধ্যে পড়েছি, যেটা আগে আমাদের হিসাবের মধ্যে ছিল না। কিন্তু সেই বাস্তবতার মধ্যেই সরকারকে পথ বের করতে হবে।


দীর্ঘ আলোচনায় সরকারের ছয় মাসের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির পাশাপাশি অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা, পুলিশ ও প্রশাসনের কার্যকারিতা, বিনিয়োগ, জ্বালানি নিরাপত্তা, সৌরবিদ্যুৎ, বিচার ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, সরকারি নিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রভাব নিয়ে নিজের মূল্যায়ন তুলে ধরেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ড. আসাদুজ্জামান রিপন।

অনুষ্ঠানের শেষদিকে তিনি বলেন, প্রতিদিন নতুন চ্যালেঞ্জ আসবে এবং একটি দক্ষ সরকারের কাজ হচ্ছে প্রজ্ঞার সঙ্গে সেসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা। একই সঙ্গে জনগণকে হতাশ না করে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখাতে হবে।

অনুষ্ঠান: সকালের সমীকরণ
অতিথি: ড. আসাদুজ্জামান রিপন, ভাইস চেয়ারম্যান, বিএনপি
সঞ্চালনা: সোনিয়া হক
প্রযোজনা: দৈনিক সকাল

সমীকরণ

জ্বালানি সংকট রাতারাতি সমাধানের সুযোগ নেই: শহিদুল ইসলাম বাবুল

সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে যাচ্ছে। অভ্যন্তরীণ গ্যাস অনুসন্ধানেও কাজ হচ্ছে। ভোলার গ্যাস কীভাবে জাতীয় ব্যবস্থায় যুক্ত করা যায়, সেটা নিয়ে উদ্যোগ আছে। পৃথিবীর যেখান থেকে গ্যাস পাওয়া সম্ভব, সেখান থেকে কিনতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে বেশি দামেও বুকিং করতে হচ্ছে। সরকারের হাতে তো আলাদিনের চেরাগ নেই। আমাকে বা আপনাকে সরকারে বসালেও রাতারাতি এ সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হবে না।

প্রোগ্রাম ডেস্ক

০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭:৩৪

দেশের চলমান জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট, দ্রব্যমূল্য, কৃষি, শিক্ষা, দুর্নীতি-চাঁদাবাজি, স্থানীয় সরকার নির্বাচন, আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরার সম্ভাবনা এবং বর্তমান সরকারের ছয় মাসের অর্জন ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে দৈনিক সকালের টক শো ‘সকালের সমীকরণ’-এ খোলামেলা কথা বলেছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক ও সংসদ সদস্য শহিদুল ইসলাম বাবুল

প্রায় এক ঘণ্টার আলোচনায় সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরার পাশাপাশি সংকট ও সীমাবদ্ধতার কথাও স্বীকার করেন তিনি। জ্বালানি সংকটের জন্য বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও অতীতের নীতিকে দায়ী করে তিনি বলেন, রাতারাতি এ সংকট সমাধানের সুযোগ নেই। একই সঙ্গে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিদ্যুৎ সাশ্রয় এবং উৎপাদনমুখী খাতে জ্বালানি সরবরাহকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেন।

কৃষকদের ঋণ মওকুফ, ফ্যামিলি কার্ড, শিক্ষাব্যবস্থার মানোন্নয়ন, কারিগরি শিক্ষা, রাজনৈতিক সহনশীলতা ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়েও নিজের অবস্থান তুলে ধরেন তিনি।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সোনিয়া হক।

সম্পূর্ণ আলোচনা দেখতে ছবির ওপরে ক্লিক করুন

জ্বালানি সংকট উত্তরণের উপায় ও বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ

সরকার জনগণের ভোটে এসেছে। সরকার ভালো না লাগলে পরবর্তী নির্বাচনে জনগণ তাকে বদলে দিতে পারবে। বিএনপি যদি প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে না পারে, জনগণ আগামী নির্বাচনে বিএনপিকে ভোট না দিয়ে অন্য দলকে আনবে। এই সুযোগটি জনগণের হাতে থাকা—এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য।

ছয় মাসে সরকারের মূল্যায়ন

দৈনিক সকাল: বর্তমান সরকারের ছয় মাস পার হয়েছে। অনেকে বলছেন, সরকারের ‘হানিমুন পিরিয়ড’ শেষ। একজন সংসদ সদস্য হিসেবে বিএনপি সরকারকে ১০-এর মধ্যে কত নম্বর দেবেন?

শহিদুল ইসলাম বাবুল: আমি নির্দিষ্টভাবে নম্বর দেওয়ার জায়গায় যেতে চাই না। বরং বিষয় ধরে ধরে মূল্যায়ন করা ভালো। প্রথমেই দৈনিক সকালের ‘সকালের সমীকরণ’ অনুষ্ঠানের সাফল্য কামনা করছি।

সাফল্য ও ব্যর্থতা শুধু সরকারের ক্ষেত্রেই নয়, প্রত্যেক মানুষের জীবনেই থাকে। একজন মানুষ সব ক্ষেত্রে, সব সময় সমানভাবে সফল হতে পারেন না। একইভাবে একটি সরকারও সব জায়গায় শতভাগ সফল হবে—এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়।

একটি সরকার যদি ৬০ মাসের জন্য আসে, সেখানে ছয় মাস খুব বেশি সময় নয়। আপনি এটাকে হানিমুন পিরিয়ড বলতে পারেন। তবে ছয় মাসে পুরো সরকারকে চূড়ান্তভাবে মূল্যায়ন করার মতো যথেষ্ট সময় হয়েছে বলে আমি মনে করি না। তারপরও ইংরেজিতে একটি কথা আছে—‘মর্নিং শোজ দ্য ডে’। সেই বিবেচনায় অবশ্যই আলোচনা ও মূল্যায়ন হতে পারে।

জ্বালানি সংকট শুধু বাংলাদেশের নয়

দৈনিক সকাল: তাহলে জ্বালানি সংকট দিয়েই শুরু করি। বর্তমান পরিস্থিতিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

শহিদুল ইসলাম বাবুল: জ্বালানির বিষয়টি বর্তমানে শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়; এটি একটি বৈশ্বিক সংকট। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই সংকটটি আরও তীব্র হয়েছে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আরও একটি দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা আছে। আমাদের জ্বালানি, গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতে বিদেশি নির্ভরতা বাড়ানো হয়েছে এবং অভ্যন্তরীণ উৎসগুলোকে ক্রমেই দুর্বল করা হয়েছে। বিশেষ করে আমাদের নিজস্ব গ্যাসক্ষেত্রগুলোতে অনুসন্ধান ও খননের যে প্রয়োজন ছিল, দীর্ঘ সময় তা যথেষ্টভাবে করা হয়নি। ফলে আমরা ক্রমেই আমদানিনির্ভর বাস্তবতার দিকে গেছি।

আমি অবশ্যই জ্বালানি বিশেষজ্ঞ নই। দেখে, শুনে ও যতটুকু বুঝেছি, সেই জায়গা থেকে কথাগুলো বলছি।

দৈনিক সকাল: কিন্তু বিএনপি যখন আগে ক্ষমতায় ছিল, তখনও তো জ্বালানি খাতে বড় ধরনের সংকট ছিল। তখন আপনারা কী করেছিলেন?

শহিদুল ইসলাম বাবুল: ২০-২১ বছর আগের জ্বালানি বাস্তবতা আর আজকের বাস্তবতা এক নয়। তখনও সংকট ছিল। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য জ্বালানি ব্যবস্থাপনা সব সময়ই জটিল।

বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রেও জ্বালানির ধরন গুরুত্বপূর্ণ। তেল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করলে খরচ অনেক বেড়ে যায়। গ্যাস বা অন্য উৎসের তুলনায় তেলভিত্তিক উৎপাদনের ব্যয় অনেক বেশি।

এখন আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাস ও তেলের দাম বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বেশি দাম দিয়েও জ্বালানি পাওয়া যাচ্ছে না। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি ও স্পট মার্কেটের মধ্যে দামের পার্থক্য আছে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি থাকলে নির্দিষ্ট দামে সরবরাহের নিশ্চয়তা কিছুটা থাকে, কিন্তু স্পট মার্কেটে পরিস্থিতি ভিন্ন।

নতুন সরকার ছয় মাস হলো এসেছে। এই সময়ের মধ্যে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলোচনা চলছে, নতুন উৎস থেকে জ্বালানি আনার চেষ্টা হচ্ছে। এসব প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ।

দৈনিক সকাল: মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালের সমস্যাও কি সংকট বাড়িয়েছে?

শহিদুল ইসলাম বাবুল: অবশ্যই। ভাসমান টার্মিনালে দুর্ঘটনার কারণে একটা সময় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গ্যাস সরবরাহে সমস্যা হয়েছে। পরে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে, কিন্তু পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে সময় লাগে।

আর আমাদের বড় জ্বালানি উৎস মধ্যপ্রাচ্য। সেখানেও সংকট তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে ইউরোপে গ্যাসের চাহিদা বেড়েছে। রাশিয়া থেকে ইউরোপের পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহের পরিস্থিতি বদলেছে। শীতকালে ইউরোপে ঘর গরম রাখার জন্য প্রচুর গ্যাস প্রয়োজন হয়।

ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে একটি চাপ তৈরি হয়েছে। গ্যাসের সংকটের সঙ্গে বিদ্যুতের সংকটও সরাসরি জড়িত।

শিল্পকারখানা ও অর্থনীতিতে জ্বালানি সংকটের প্রভাব

দৈনিক সকাল: সরকারের দায়িত্বশীল পর্যায় থেকে বলা হয়েছে, জ্বালানি সংকট কাটাতে প্রায় দুই বছর সময় লাগতে পারে। কিন্তু এর মধ্যে শিল্পকারখানা সমস্যায় পড়ছে, উৎপাদন কমছে, ব্যবসায়ীরা ঋণখেলাপি হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছেন। অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব কীভাবে দেখছেন?

শহিদুল ইসলাম বাবুল: প্রভাব অবশ্যই আছে। বিদ্যুৎ ছাড়া অর্থনীতি চলবে না। কিন্তু কখনো ঘূর্ণিঝড়, ভূমিকম্প বা অন্য কোনো বিপর্যয় হলে সেটা কি সরকার ডেকে আনে?

বিএনপি সরকার গঠনের পর মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এর কারণে গ্যাস-তেলের দাম ও সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে। এই অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করে জ্বালানি কিনতে হচ্ছে।

আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে সংকটের মধ্যে ব্যবস্থাপনাটা কতটা ভালো করা যায়, সেটা দেখা। এমন তো নয় যে পুরো দেশ অন্ধকার হয়ে গেছে। হ্যাঁ, উৎপাদন ও উন্নয়নে বিঘ্ন ঘটছে, গরমে মানুষ কষ্ট পাচ্ছে। আমরা সেটা অস্বীকার করছি না। সরকারও মানুষের কষ্টের বিষয়ে দুঃখ প্রকাশ করেছে।

কিন্তু একই সঙ্গে এটাও দেখতে হবে, সংকটটা কীভাবে তৈরি হয়েছে এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে সর্বোচ্চ কী করা সম্ভব।

দৈনিক সকাল: ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিদ্যুৎ সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। তাদের কর বা ঋণের ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা দেওয়া যায় কি?

শহিদুল ইসলাম বাবুল: আমি যতটুকু দেখেছি, সরকার কারখানা ও উৎপাদনমুখী খাতে তুলনামূলক বেশি বিদ্যুৎ দেওয়ার চেষ্টা করছে। উৎপাদন চালু রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

সব কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে—এ ধরনের কিছু তথ্য নিয়েও পরে সংশোধন এসেছে। তবে কোথাও কোথাও সমস্যা হচ্ছে, সেটা সত্য।

সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে যাচ্ছে। অভ্যন্তরীণ গ্যাস অনুসন্ধানেও কাজ হচ্ছে। ভোলার গ্যাস কীভাবে জাতীয় ব্যবস্থায় যুক্ত করা যায়, সেটা নিয়ে উদ্যোগ আছে। পৃথিবীর যেখান থেকে গ্যাস পাওয়া সম্ভব, সেখান থেকে কিনতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে বেশি দামেও বুকিং করতে হচ্ছে।

সরকারের হাতে তো আলাদিনের চেরাগ নেই। আমাকে বা আপনাকে সরকারে বসালেও রাতারাতি এ সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হবে না। দীর্ঘদিনের নীতি ও বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতা—দুটোরই প্রভাব আছে।

সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে প্রণোদনার উদ্যোগ

দৈনিক সকাল: বাসাবাড়ি ও ব্যক্তি পর্যায়ে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়াতে ভর্তুকি, স্বল্প সুদের ঋণ বা অন্য কোনো প্রণোদনার পরিকল্পনা আছে কি?

শহিদুল ইসলাম বাবুল: সৌরবিদ্যুৎ অবশ্যই কাজে লাগানো সম্ভব। তবে এটাও রাতারাতি হবে না।

সরকারি অফিস-আদালতের ছাদে সৌরশক্তির মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বাসাবাড়ি ও কারখানায় নিজস্ব নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনেও উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে।

এই খাতে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও সরঞ্জামের ওপর কর সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগও আছে। একটি কারখানা যদি তার প্রয়োজনীয় বিদ্যুতের একটা অংশ নিজেই সৌরশক্তি থেকে উৎপাদন করতে পারে, সেটাও জাতীয় গ্রিডের জন্য সাশ্রয়।

যেখানে যে সম্ভাবনা আছে, সেটাকে কাজে লাগানো দরকার।

কৃষির জন্য জ্বালানি নিশ্চিত করার তাগিদ

দৈনিক সকাল: সামনে সেচ ও শুষ্ক মৌসুম। ধান উৎপাদনে বিদ্যুৎ ও ডিজেলের চাহিদা বাড়বে। কৃষি উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে সরকারের প্রস্তুতি কী?

শহিদুল ইসলাম বাবুল: বিষয়টি সরকারের মাথায় আছে। কৃষি উৎপাদনে ডিজেলের বড় প্রয়োজন হয়। প্রয়োজনীয় ডিজেল এনে মজুত রাখা এবং কৃষির জন্য সরবরাহ নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।

প্রয়োজনে অন্যান্য খাতে সাশ্রয় করে হলেও কৃষি উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি নিশ্চিত করতে হবে। আমি যতটুকু জানি, সরকার বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে এবং প্রস্তুতি আছে।

তবে শুধু সরবরাহ থাকলেই হয় না। মজুতদারি, চোরাচালান বা কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে কি না, সেদিকেও নজর রাখতে হবে। সব সংকট যে প্রাকৃতিকভাবেই তৈরি হচ্ছে, সেটাও বলা যাবে না। কোনো ধরনের অন্তর্ঘাত বা কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা হচ্ছে কি না, সরকারকে সেটাও দেখতে হবে।

ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও বিদ্যুতের ব্যবহার

দৈনিক সকাল: বিদ্যুৎ সংকটের জন্য ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকে দায়ী করা হচ্ছে। এগুলোর চলাচল সীমিত হলে চালকদের কর্মসংস্থান ও সাধারণ মানুষের যাতায়াতেও প্রভাব পড়বে। আপনি কী মনে করেন?

শহিদুল ইসলাম বাবুল: ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চার্জ করতে সুনির্দিষ্টভাবে কত বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়, সেই পরিসংখ্যান আমার কাছে নেই। তবে গত পাঁচ-দশ বছরে এগুলোর সংখ্যা বিপুলভাবে বেড়েছে। লাখ লাখ যানবাহন হলে সেগুলো চার্জ করতে নিশ্চয়ই উল্লেখযোগ্য বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়।

আবার এর মাধ্যমে মানুষের কর্মসংস্থানও হয়েছে—এটাও সত্য।

আমি এগুলো বাতিল করার কথা বলছি না। বরং দেখতে হবে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করা যায় কি না। সৌরশক্তি বা অন্য নবায়নযোগ্য উৎস থেকে চার্জ দেওয়ার ব্যবস্থা করা গেলে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমতে পারে।

একই সঙ্গে শিল্পকারখানা, হাসপাতাল ও জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ স্থানে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

দৈনিক সকাল: তাহলে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের বড় জায়গা কোথায়?

শহিদুল ইসলাম বাবুল: আমাদের বিদ্যুৎ চুরি, সিস্টেম লস ও অপচয়ের জায়গাগুলো দেখতে হবে। নাগরিকরা সচেতন হলে এবং গণমাধ্যম এ বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করলে উল্লেখযোগ্য বিদ্যুৎ সাশ্রয় করা সম্ভব বলে আমি বিশ্বাস করি।

বড় অফিস, শপিং মল ও বিভিন্ন জায়গায় প্রচুর এসি চলে। অনেক ভবন এমনভাবে নির্মাণ করা হয়েছে যে এসি ছাড়া থাকা কঠিন। এখন ভবনগুলো তো ভেঙে ফেলা সম্ভব নয়। কিন্তু সাময়িকভাবে বাজারের সময়সীমা নিয়ন্ত্রণ করা যায় কি না, সরকারি অফিসে যেখানে সম্ভব প্রাকৃতিক আলো-বাতাস ব্যবহার করা যায় কি না—এসব ভাবতে হবে।

আপনার ঘরে যে বাতিটি প্রয়োজন নেই, সেটি বন্ধ করলেও সাশ্রয় হয়। বিন্দু বিন্দু করেই তো সিন্ধু হয়।

অটোরিকশার ক্ষেত্রেও বিকল্প চার্জিং ব্যবস্থা করা যায়। আবার এসব যানবাহনের লাইসেন্স, ফিটনেস ও নির্দিষ্ট রুটের বিষয়ও দেখতে হবে। কর্মসংস্থান প্রয়োজন, কিন্তু তার মানে বিশৃঙ্খলা তৈরি করা যাবে না।

‘সাফল্য খুঁজলে যেমন পাওয়া যাবে, দুর্বলতাও পাওয়া যাবে’

দৈনিক সকাল: দীর্ঘদিন পর ভোটের মাধ্যমে একটি নির্বাচিত সরকার এসেছে, কার্যকর সংসদ রয়েছে। ফলে সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশাও অনেক বেশি। সেই প্রত্যাশা পূরণে ছয় মাসে সরকার কতটা সফল?

শহিদুল ইসলাম বাবুল: ভালো-মন্দ দুটোই থাকবে। বাংলাদেশের মতো বিপুল জনগোষ্ঠীর একটি দেশে বেকারত্ব, অভাব-অনটন, অপরাধসহ অনেক সমস্যা রয়েছে। এত ছোট ভূখণ্ডে এত মানুষ—এটাও একটা বড় বাস্তবতা।

মানুষের প্রত্যাশা অবশ্যই অনেক। দীর্ঘদিন মানুষ বিভিন্ন উন্নয়নের গল্প শুনেছে। আমি প্রশ্ন করতে চাই—এত উন্নয়ন যদি হয়ে থাকে, তাহলে আজকের সমস্যাগুলো এত তীব্র কেন?

আমি বলছি না যে কোনো উন্নয়ন হয়নি। মেট্রোরেল হয়েছে, বিভিন্ন অবকাঠামো হয়েছে। কিন্তু সাফল্য খুঁজলে যেমন পাওয়া যাবে, তেমনি ব্যর্থতা বা দুর্বলতাও পাওয়া যাবে। সবকিছুকে একপাক্ষিকভাবে দেখলে হবে না।

দৈনিক সকাল: মানুষ এখন সরাসরি সরকারের কাছে জবাব চাইছে—জিনিসপত্রের দাম কমছে না কেন, বিদ্যুৎ-গ্যাসের সমস্যা কেন। তাদের কী বলবেন?

শহিদুল ইসলাম বাবুল: জনগণের প্রত্যাশা থাকতেই পারে। আমরা সরকারে এসেছি, মানুষের দায়িত্ব নিয়েছি। এটা আমরা অস্বীকার করি না।

মানুষ ক্ষুব্ধ—সেটাও সত্য। আমার নিজের ঘরেও বিদ্যুৎ থাকে না, অনেক সময় গ্যাস থাকে না। আমার এলাকার মানুষও ফোন করে অভিযোগ করেন।

আমি যদি বলি, ছয় মাসে সব ঠিক করে ফেলেছি, সেটা মিথ্যা বলা হবে। মানুষ তখন আরও বেশি ক্ষুব্ধ হবে।

প্রধানমন্ত্রীও মানুষের কষ্টের বিষয়ে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু একই সঙ্গে দেখতে হবে এই সংকট কোথা থেকে তৈরি হয়েছে।

মানুষ ক্ষুব্ধ—সেটা সত্য। আমার নিজের ঘরেও বিদ্যুৎ থাকে না, অনেক সময় গ্যাস থাকে না। আমি যদি বলি ছয় মাসে সব ঠিক করে ফেলেছি, সেটা মিথ্যা বলা হবে।

দৈনিক সকাল: আপনার মতে সংকটটা কোথা থেকে তৈরি হয়েছে?

শহিদুল ইসলাম বাবুল: বিদ্যুৎ খাতে অতীতে যেসব চুক্তি হয়েছে, তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর যে নির্ভরতা তৈরি হয়েছে এবং বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রের বকেয়া—এসবের চাপ বর্তমান সরকারকে বহন করতে হচ্ছে।

বিদ্যুৎ কিনতে হচ্ছে, পাওয়ার প্ল্যান্টের বকেয়া পরিশোধ করতে হচ্ছে, আবার নতুন করে তেল-গ্যাসও কিনতে হচ্ছে।

অন্যদিকে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে যথেষ্ট কাজ হয়নি। বাপেক্সকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানো যেত।

এখন নিজস্ব উৎসে গ্যাস অনুসন্ধান ও কূপ খনন-পুনঃখননের কাজ শুরু হয়েছে। ভোলার গ্যাসকে সরাসরি পাইপলাইনে যুক্ত করার জন্যও ব্যয়বহুল প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে।

কিন্তু এগুলো রাতারাতি করা যায় না। গ্যাস, বিদ্যুৎ বা তেলের সমস্যার সমাধানে কারও হাতে জাদুমন্ত্র নেই।

দৈনিক সকাল: রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে সরকার কী ভাবছে?

শহিদুল ইসলাম বাবুল: সেখানে কাজ চলছে। এটাও ব্যয়বহুল প্রকল্প। আমি যতটুকু শুনেছি, পর্যায়ক্রমে সেখান থেকে বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার কথা।

শুরুতেই বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে—এমন নয়। ধীরে ধীরে উৎপাদন বাড়বে। জাতীয় গ্রিডে নতুন বিদ্যুৎ যুক্ত হলে সেটা অবশ্যই ইতিবাচক। তবে এটাও সময়সাপেক্ষ।

‘জনগণ চাইলে সরকার বদলে দিতে পারবে’

দৈনিক সকাল: এবার সরাসরি বলুন—ছয় মাসে বিএনপি সরকার জনগণকে কী দিয়েছে?

শহিদুল ইসলাম বাবুল: প্রথম বিষয় হচ্ছে সুশাসন ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা। আমি মনে করি, দেশে এখন এমন একটি সংসদ আছে, যেখানে সরকারি দল আছে, বিরোধী দল আছে এবং জবাবদিহিতা আছে। কার্যকর সংসদ থাকা গুরুত্বপূর্ণ।

আর সবচেয়ে বড় কথা হলো, সরকার জনগণের ভোটে এসেছে। সরকার ভালো না লাগলে পরবর্তী নির্বাচনে জনগণ তাকে বদলে দিতে পারবে। বিএনপি যদি তার প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে না পারে, জনগণ আগামী নির্বাচনে বিএনপিকে ভোট না দিয়ে অন্য দলকে আনবে।

এই সুযোগটি জনগণের হাতে থাকা—এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য।

দৈনিক সকাল: কিন্তু সাধারণ মানুষ দৃশ্যমানভাবে কী পেল?

শহিদুল ইসলাম বাবুল: আমি বলব, সুশাসনের একটি দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে। হয়তো এটা রাস্তা-সেতুর মতো দৃশ্যমান নয়।

আজ আপনি আমাকে যেকোনো প্রশ্ন করতে পারছেন। নির্ভয়ে একজন এমপি, মন্ত্রী বা সরকারকে প্রশ্ন করার পরিবেশ থাকা গুরুত্বপূর্ণ। আমি এলাকায় গেলেও সাধারণ মানুষ, এমনকি বাচ্চারাও আমাকে প্রশ্ন করে। আমি সেটা উপভোগ করি।

আমি চাই, একজন এমপিকে প্রশ্ন করা যাবে, একজন মন্ত্রীকে প্রশ্ন করা যাবে, সরকারকে প্রশ্ন করা যাবে। প্রশ্ন করার কারণে কেউ হয়রানির শিকার হবে না—এই পরিবেশটাই গণতন্ত্রের একটি বড় অর্জন।

কৃষকদের জন্য সরকারের উদ্যোগ

দৈনিক সকাল: আপনি কৃষক সংগঠনের সঙ্গে কাজ করেন। কৃষকদের জন্য এই সরকার কী করেছে?

শহিদুল ইসলাম বাবুল: বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কৃষির গুরুত্ব এখনো অনেক। কিন্তু প্রান্তিক কৃষক বা কৃষিশ্রমিকের জীবন দেখুন—অনেকে মায়ের চিকিৎসা করাতে পারেন না, সন্তানকে ভালো স্কুলে পড়াতে পারেন না।

কৃষকের কথা মুখে অনেক বলা হয়, কিন্তু তাদের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন কতটা আসে, সেটা দেখতে হবে।

বিএনপির অতীত সরকারগুলোতেও কৃষিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জিয়াউর রহমানের সময় খাল খনন, কৃষি উৎপাদন বাড়ানো, সেচ ও বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল। বেগম খালেদা জিয়ার সময়ও কৃষকদের জন্য ঋণ ও ভূমিসংক্রান্ত বিভিন্ন সুবিধা দেওয়া হয়েছিল।

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসেও কৃষিঋণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রায় ১৫ লাখ কৃষকের জন্য প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার কৃষিঋণ মওকুফের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে আমি জানি। গ্রামের একজন প্রান্তিক কৃষকের কাছে ১০ হাজার টাকার ঋণ মওকুফও অনেক বড় ব্যাপার।

দৈনিক সকাল: নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি কার্ডসহ বিভিন্ন কর্মসূচির কথা ছিল। সেগুলোর অগ্রগতি কী?

শহিদুল ইসলাম বাবুল: ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষি কার্ড নিয়ে কাজ চলছে। গ্রামে গেলে নারীরা আমাকে জিজ্ঞেস করেন—কবে ফ্যামিলি কার্ড পাবেন। অর্থাৎ মানুষের মধ্যে এ নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

মসজিদ-মন্দির, ইমাম-মুয়াজ্জিন ও পুরোহিতদের জন্য ভাতার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ শুরু হয়েছে।

স্কুলের শিশুদের জন্য মিড-ডে মিল, ইউনিফর্ম এবং অন্যান্য সুবিধা কীভাবে দেওয়া যায়, তা নিয়েও পরিকল্পনা রয়েছে।

এসবের সবকিছু ছয় মাসেই শতভাগ বাস্তবায়িত হয়ে যাবে—এমন নয়। কিন্তু প্রক্রিয়াগুলো শুরু হয়েছে।

শিক্ষায় বিনিয়োগের ফল দীর্ঘমেয়াদি

দৈনিক সকাল: শিক্ষা খাতে সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনা কী বলে মনে করেন?

শহিদুল ইসলাম বাবুল: শিক্ষা একটি জাতির মেরুদণ্ড। আমাদের বিশ্লেষণ হচ্ছে, পৃথিবীর যেসব জাতি উন্নতি করেছে, তাদের বাজেটে শিক্ষাকে বড় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এবার শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। শিক্ষায় বিনিয়োগের ফল আগামী বছরই পাওয়া যাবে না। এর ফল ২০ বা ২৫ বছর পরও আসতে পারে। কিন্তু এখন বিনিয়োগ না করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

শুধু অর্থনৈতিক সংকট কাটালেই হবে না। অর্থনীতি একসময় পুনরুদ্ধার করা যায়, বিদ্যুতের সংকটও একসময় কাটানো যায়। কিন্তু একটি প্রজন্মের শিক্ষা যদি ধ্বংস হয়ে যায়, তরুণরা যদি মাদকাসক্ত হয়ে যায়, তখন সেই ক্ষতি ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত কঠিন।

দৈনিক সকাল: এবারের এসএসসি-এইচএসসির ফলাফল নিয়েও অভিযোগ আছে। পাসের হার কমেছে। আপনি এটাকে কীভাবে দেখছেন?

শহিদুল ইসলাম বাবুল: পড়াশোনা না করে অটোপাস দেওয়ার সংস্কৃতি তৈরি করা ঠিক নয়। শিক্ষার মান নিশ্চিত করতে হবে।

আপনি যখন স্কুলে পড়েছেন, তখনকার শিক্ষার মান আর এখনকার শিক্ষার মানের মধ্যে পার্থক্য আছে কি না—সেটা দেখুন।

আমাদের প্রকৃত মানের শিক্ষা দিতে হবে। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে, পেশাদারত্ব তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষকদের আর্থিক নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদার বিষয়টিও দেখতে হবে।

শুধু পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করলাম—এই মানসিকতা থেকে বের হতে হবে। শিক্ষার্থীদের বুঝতে হবে, পড়াশোনা করতে হবে, পরীক্ষা দিতে হবে এবং যোগ্যতার প্রমাণ দিতে হবে।

দৈনিক সকাল: তাহলে কি সবার উচ্চশিক্ষার প্রয়োজন নেই?

শহিদুল ইসলাম বাবুল: আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়, সবার জন্য একই ধরনের উচ্চশিক্ষা প্রয়োজন নেই। যারা উচ্চশিক্ষায় যাবে, তাদের একটি ন্যূনতম মান থাকা দরকার। রাষ্ট্র যখন একজন শিক্ষার্থীর পেছনে বিনিয়োগ করে, তখন রাষ্ট্রেরও একটি ফল পাওয়ার প্রত্যাশা থাকে।

কারিগরি শিক্ষাকে আরও গুরুত্ব দিতে হবে। বাস্তবমুখী শিক্ষা দরকার।

পৃথিবীর অনেক দেশে দক্ষ জনবলের প্রয়োজন আছে। কিন্তু আমরা সেই ধরনের দক্ষ মানুষ তৈরি করতে পারছি না। বিদেশি ভাষার প্রাথমিক জ্ঞান, কার্পেন্ট্রি বা বিভিন্ন কারিগরি দক্ষতা শেখানো গেলে তরুণদের আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে সুযোগ বাড়বে।

এতে কর্মসংস্থান যেমন হবে, তেমনি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেরও নতুন পথ খুলবে।

রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিকভাবেই মোকাবিলা

দৈনিক সকাল: কেউ কেউ এখনো বলছেন, দেশ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। আপনি কী বলবেন?

শহিদুল ইসলাম বাবুল: সরকার মানেই রাজপথ কাঁপিয়ে চলতে হবে, বিরোধী দলকে মেরে-কেটে শেষ করে দিতে হবে—আমি এই ধারণায় বিশ্বাস করি না।

গত ছয় মাসে কোনো রাজনৈতিক দলের অফিসে বিএনপি তালা দিয়েছে কি না, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে রাষ্ট্রীয়ভাবে দমন করা হয়েছে কি না—সেটাও দেখতে হবে।

একটি গণতান্ত্রিক দেশে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি থাকবে। মতের পার্থক্য থাকবে। কিন্তু তাদের রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে হবে।

দৈনিক সকাল: কিন্তু আওয়ামী লীগ তো বড় রাজনৈতিক দল ছিল। তাদের কার্যক্রম বন্ধ হয়েছে। এর দায় বিএনপি এড়াতে পারে?

শহিদুল ইসলাম বাবুল: আওয়ামী লীগের কার্যক্রম বিএনপি সরকার বন্ধ করেনি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রশাসনিকভাবে যে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, তখনো বিএনপি প্রশাসনিক আদেশে রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার বিরোধিতা করেছে।

আমাদের অবস্থান হচ্ছে—প্রশাসনিক আদেশে কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ হওয়া উচিত নয়। সেটা আওয়ামী লীগ হোক বা জামায়াত হোক।

এখন বিষয়টি আইন ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্যে গেছে। বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করবে। বিএনপি সেখানে হস্তক্ষেপ করবে না।

আমি ব্যক্তিগতভাবে চাই, আইনগত প্রক্রিয়া মোকাবিলা করে আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে ফিরে আসুক। আমরা আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবেই দেখতে চাই। তাদের মোকাবিলা করে বিএনপি অতীতেও ক্ষমতায় গেছে।

দৈনিক সকাল: অর্থাৎ আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখতে আপনাদের আপত্তি নেই?

শহিদুল ইসলাম বাবুল: কোনো আপত্তি নেই। আওয়ামী লীগকে মোকাবিলা করে আমরা অতীতেও নির্বাচন করেছি।

রাজনীতিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে। কে জিতবে, সেটা জনগণ নির্ধারণ করবে।

আর আপনি আজ আমাকে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করতে পারছেন—এটাই তো প্রশ্ন করার স্বাধীনতা। আমি এটাকেই গণতন্ত্রের একটি অর্জন হিসেবে দেখি।

স্থানীয় সরকার নির্বাচন উন্মুক্ত হওয়া উচিত

দৈনিক সকাল: সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। জামায়াত সক্রিয়, এনসিপিও নতুন দল হিসেবে মাঠে রয়েছে। আওয়ামী লীগের লোকজনও স্বতন্ত্রভাবে অংশ নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। নির্বাচনকে সরকার কীভাবে দেখছে?

শহিদুল ইসলাম বাবুল: নির্বাচন আয়োজন করে নির্বাচন কমিশন। সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানের পরিবেশ তৈরি করে।

বিএনপির কথা যদি বলেন, আমরা উদার ও উন্মুক্ত গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি। স্থানীয় সরকার নির্বাচন, বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন একসময় বাংলাদেশের মানুষের কাছে উৎসব ছিল।

নির্বাচনকে আতঙ্কে পরিণত করা উচিত নয়। স্থানীয় নির্বাচন স্থানীয় মানুষের নির্বাচন হিসেবেই হওয়া উচিত।

দৈনিক সকাল: স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক না থাকার সিদ্ধান্তকে কীভাবে দেখছেন?

শহিদুল ইসলাম বাবুল: আমি এই সিদ্ধান্তকে ইতিবাচকভাবে দেখি। ধানের শীষ, নৌকা বা দাঁড়িপাল্লার মতো দলীয় প্রতীক স্থানীয় সরকার নির্বাচনে না থাকলে প্রতিযোগিতাটা আরও স্থানীয় হতে পারে।

রাজনৈতিক দল কাউকে সমর্থন দিতে পারে—এমন আলোচনা আছে। তবে ব্যক্তিগতভাবে আমি চাই, আরও উন্মুক্ত নির্বাচন হোক।

প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন, কাউকে জিতিয়ে আনা হবে না। প্রার্থীদের নিজেদের যোগ্যতায় জিতে আসতে হবে।

দৈনিক সকাল: বিএনপির তৃণমূল এখন কতটা সংগঠিত?

শহিদুল ইসলাম বাবুল: সংগঠিত না থাকলে নির্বাচনে জেতা যাবে না। আমার নিজের নির্বাচনী এলাকাতেই ২৫টি ইউনিয়ন রয়েছে। অনেকেই প্রার্থী হতে চান, আমার কাছে আসেন।

আমি সবাইকে বলেছি—দলের সমর্থন পেলেই যে জিতে যাবেন, এমন ভাবার সুযোগ নেই।

আমি চাই, উন্মুক্ত মাঠ থাকুক। যে মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারবে, সে নির্বাচনে জিতে আসবে।

এমনকি বিএনপি কাউকে মনোনয়ন বা সমর্থন দিলেও তাকে জিতিয়ে আনার দায়িত্ব সরকার, এমপি বা দলের নয়। তাকে নিজের কাজ, যোগ্যতা ও মানুষের সমর্থনের মাধ্যমে জিততে হবে।

একজন বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীও যদি না জেতেন, তাতেও সমস্যা নেই। নির্বাচনের প্রতি সম্মান থাকতে হবে এবং মানুষের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটতে দিতে হবে।

দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি প্রসঙ্গে

দৈনিক সকাল: বিএনপি দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্সের’ কথা বলছে। কিন্তু বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধেও চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে।

শহিদুল ইসলাম বাবুল: দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ।

এখন পর্যন্ত বিএনপির কোনো এমপি বা বড় নেতার বিরুদ্ধে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচারের মতো অভিযোগের খবর আমরা শুনিনি। আমি আশা করি, ভবিষ্যতেও শুনব না।

প্রধানমন্ত্রী প্রথম দিন থেকেই আমাদের এ বিষয়ে সতর্ক করেছেন।

তবে আমি এটাও বলব, দুর্নীতি পৃথিবীর অনেক দেশেই আছে। কম-বেশি আছে। দুর্নীতি আছে বলেই দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন হয়।

রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি কমাতে হবে। একই সঙ্গে ব্যক্তি পর্যায়ের ছোট ছোট দুর্নীতিও রয়েছে। এগুলো একদিনে বন্ধ করা সম্ভব নয়। ছয় মাসের সরকার দিয়ে তো নয়ই, অনেক ক্ষেত্রে একটি মেয়াদের সরকার দিয়েও পুরোপুরি নির্মূল করা কঠিন।

আমাদের দেশে দুর্নীতি একটি সামাজিক ব্যাধির মতো দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে।

দৈনিক সকাল: চাঁদাবাজির অভিযোগটা তাহলে অস্বীকার করছেন না?

শহিদুল ইসলাম বাবুল: না, আমি বলছি না যে কোথাও চাঁদাবাজি হয় না। যার যখন প্রভাব থাকে, কোথাও কোথাও এ ধরনের ঘটনা ঘটে।

কিন্তু চাঁদাবাজিকে একটি শিল্পে পরিণত করা আর বিচ্ছিন্নভাবে কোথাও ঘটনা ঘটা এক বিষয় নয়।

আমি এটাকে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সমস্যাও মনে করি। কোথায় কী হচ্ছে, সবকিছু আমার বা আপনার পক্ষে জানা সম্ভব নয়। আমার নিজের এলাকাতেও কোনো কোনো অভিযোগ কখনো কানে আসে।

ছয় মাসে পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়। তবে আমি বিশ্বাস করি, পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে এবং আরও উন্নতি করতে হবে।

‘আওয়ামী লীগের সবাই অপরাধী নয়’

দৈনিক সকাল: আওয়ামী লীগ বা শেখ হাসিনার ফিরে আসার আলোচনা নিয়ে সরকার নাকি চিন্তিত—এ ধরনের কথাও শোনা যাচ্ছে। আপনারা কি আসলেই চিন্তিত?

শহিদুল ইসলাম বাবুল: আমরা ১৭ বছর ধরে রাজনৈতিক লড়াই করেছি। রাজপথে লড়েছি। এখন কে কবে আসবেন, সেই চিন্তায় যদি আমাদের ঘুম নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে রাজনীতি করে লাভ কী?

আমাদের রাজনৈতিক জীবনই আন্দোলন, প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের মধ্য দিয়ে গেছে। কাজেই এ ধরনের ভয় দেখিয়ে লাভ নেই।

দৈনিক সকাল: তাহলে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ আপনি কীভাবে দেখছেন?

শহিদুল ইসলাম বাবুল: কেউ রাতারাতি বিএনপি হয়ে যায় না, আবার কেউ রাতারাতি আওয়ামী লীগও হয়ে যায় না। আওয়ামী লীগের একটি বড় সমর্থকগোষ্ঠী বাংলাদেশে আছে—এটা বাস্তবতা।

তাদের সবাইকে তো দেশ থেকে বের করে দেওয়া যাবে না। আবার আওয়ামী লীগ সমর্থন করলেই প্রত্যেক ব্যক্তি অপরাধী—এটাও ঠিক নয়।

কেউ একসময় নৌকায় ভোট দিয়েছেন, তার মানে তিনি ভয়ংকর অপরাধ করেছেন—এমন চিন্তা করা যায় না।

যারা অপরাধ করেছেন, তারা আইনের মুখোমুখি হবেন। কিন্তু একজন সাধারণ ভোটার, সমর্থক, ছোট নেতা এবং অপরাধে জড়িত একজন নেতাকে একইভাবে দেখা যাবে না। মানুষের মধ্যে পার্থক্য আছে।

যারা সমাজে স্বাভাবিকভাবে বসবাস করছেন, ভোট দেওয়ার অধিকার আছে, আইন তাদের বাধা না দিলে স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রেও তাদের নাগরিক অধিকার বিবেচনায় নিতে হবে।

দৈনিক সকাল: তাহলে কি আপনি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ‘পুনর্বাসনের’ পক্ষে?

শহিদুল ইসলাম বাবুল: আমি অপরাধীদের পুনর্বাসনের কথা বলছি না। যারা অপরাধ করেছেন, তাদের আইনের মুখোমুখি হতে হবে।

আমি সাধারণ সমর্থক ও নাগরিকদের কথা বলছি। আওয়ামী লীগের সব মানুষ অপরাধী—এটা বলা যাবে না।

আইনগতভাবে আওয়ামী লীগ যদি আবার রাজনীতিতে ফিরে আসে, তারা উন্মুক্তভাবে রাজনীতি করবে—সেটাতেও আমার আপত্তি নেই।

রাজনীতি করতে হলে জনগণের কাছে যেতে হবে, নিজেদের অতীত কর্মকাণ্ডের ব্যাখ্যা দিতে হবে এবং জনগণের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে হবে।

যারা অপরাধ করেছেন, তাদের আইনের মুখোমুখি হতে হবে। কিন্তু আওয়ামী লীগের সব মানুষ অপরাধী—এটা বলা যাবে না।

রাজনৈতিক পরিচয়ে প্রতিহিংসা নয়

দৈনিক সকাল: তৃণমূল বিএনপির একটি অভিযোগ আছে—আওয়ামী লীগের পদধারী অনেককে জায়গা দিতে গিয়ে দীর্ঘদিন নির্যাতিত বিএনপির কর্মীদের সঙ্গে কেন্দ্র অমানবিক আচরণ করছে। অভিযোগটি কি সত্য?

শহিদুল ইসলাম বাবুল: নির্বাচনের প্রেক্ষাপট একটু ভিন্ন। আপনি যখন নির্বাচন করতে যাবেন, তখন মানুষকে আলাদা করে বলতে পারবেন না—‘তুমি আওয়ামী লীগ, তুমি আমাকে ভোট দিতে পারবে না।’

আপনাকে সবার কাছেই ভোট চাইতে হবে।

কেউ আমাকে ভোট দিলে তার প্রতিও আমার একটি দায়বদ্ধতা তৈরি হয়। আর আমি যখন সংসদ সদস্য হয়েছি, তখন শুধু বিএনপির মানুষের নয়—আমার এলাকার সব মানুষের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষার দায়িত্ব আমার।

কেউ আবেগ থেকে বলতে পারেন, যারা আমাদের ওপর নির্যাতন করেছে, তাদের সবাইকে প্রতিশোধের মুখোমুখি করতে হবে। দীর্ঘদিন নির্যাতিত একজন কর্মীর মধ্যে সেই আবেগ থাকা অস্বাভাবিক নয়।

কিন্তু বেগম খালেদা জিয়াও প্রতিহিংসার রাজনীতি না করার কথা বলেছেন। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া যাবে না।

আমাদের পথ হতে হবে আইনের পথ। অপরাধী হলে বিচার হবে, কিন্তু রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে সাধারণ মানুষের ওপর প্রতিহিংসা করা যাবে না।

‘গণতন্ত্রে সরকার চিরস্থায়ী নয়’

দৈনিক সকাল: সবশেষে, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আপনার বার্তা কী?

শহিদুল ইসলাম বাবুল: আমাদের রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে। সরকার ও বিরোধী দল থাকবে। একে অপরের সমালোচনা হবে। জনগণ সরকারকে প্রশ্ন করবে।

কিন্তু প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আইন হাতে তুলে নেওয়া যাবে না। যে অপরাধ করেছে, তার বিচার আইন অনুযায়ী হবে।

সরকারেরও ভুল থাকতে পারে, ব্যর্থতা থাকতে পারে। আবার অর্জনও থাকবে। জনগণ সেই বিচার করবে এবং নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের সিদ্ধান্ত জানাবে।

গণতন্ত্রের সৌন্দর্যই হচ্ছে—সরকার চিরস্থায়ী নয়। জনগণ চাইলে সরকার পরিবর্তন করতে পারে।

দেশটা আমাদের সবার। তাই দলমত-নির্বিশেষে সবাইকে নিয়ে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে হবে।


দীর্ঘ আলোচনায় জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণ, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, সৌরবিদ্যুৎ, কৃষি উৎপাদন, সরকারের ছয় মাসের অর্জন, কৃষিঋণ মওকুফ, ফ্যামিলি কার্ড, শিক্ষার মান, কারিগরি শিক্ষা, স্থানীয় সরকার নির্বাচন, দুর্নীতি-চাঁদাবাজি এবং আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজের মূল্যায়ন তুলে ধরেন সংসদ সদস্য শহিদুল ইসলাম বাবুল।

তিনি বলেন, একটি সরকারের ভুল, ব্যর্থতা ও অর্জন—সবই থাকতে পারে। জনগণ তার বিচার করবে এবং নির্বাচনের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত জানাবে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও প্রতিহিংসার পরিবর্তে আইন, গণতন্ত্র ও জনগণের সিদ্ধান্তের প্রতি সম্মান দেখাতে হবে।

অনুষ্ঠান: সকালের সমীকরণ
অতিথি: শহিদুল ইসলাম বাবুল, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী কৃষক দল ও সংসদ সদস্য
সঞ্চালনা: সোনিয়া হক
প্রযোজনা: দৈনিক সকাল