ঢাকার ফুটপাত পথচারীদের চলাচলের উপযোগী করার পাশাপাশি হকারদের জীবিকা নিশ্চিত করতে ওয়ার্ডভিত্তিক হকার ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। তাঁর মতে, শুধু হকার উচ্ছেদ করে ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা সম্ভব নয়। এ জন্য চাঁদাবাজির অর্থনীতি বন্ধের পাশাপাশি হকারদের বিকল্প কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে হবে।
বৃহস্পতিবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এ প্রস্তাব তুলে ধরেন।
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, ঢাকার ফুটপাত ঘিরে বড় ধরনের চাঁদাবাজির অর্থনীতি গড়ে উঠেছে। ২০১৬ সালে ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) এক গবেষণায় ঢাকায় ফুটপাতকেন্দ্রিক চাঁদাবাজির বার্ষিক পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা বলে অনুমান করা হয়েছিল। অন্যদিকে, ২০২৪ সালে হকার্স ফেডারেশনের হিসাবে এ পরিমাণ প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা।
তিনি বলেন, ফুটপাত রাষ্ট্রের সম্পত্তি হলেও সেখানে ব্যবসা করেন হকাররা। কিন্তু ভাড়া আদায় করে রাজনৈতিক প্রভাবশালী ও চাঁদাবাজ চক্র। ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে ফুটপাতকেন্দ্রিক চাঁদা আদায়ের নিয়ন্ত্রণকারী গোষ্ঠীর পরিবর্তন হলেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না।
এ সময় ঢাকা মহানগর পুলিশের চাঁদাবাজ ও দখলদারদের তালিকা নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনের তথ্যও তুলে ধরেন তিনি। তাঁর দাবি, অপরাধের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে চিহ্নিত ২৭৮ জনের মধ্যে ২৩০ জন বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের বর্তমান বা সাবেক নেতাকর্মী। তবে এসব তথ্যের স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন।
পাটওয়ারীর আশঙ্কা, চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালী চক্রকে নিয়ন্ত্রণ না করে শুধু হকার উচ্ছেদ করা হলে কিছুদিন পর আবার ফুটপাত দখল হয়ে যাবে। তখন নতুন করে চাঁদা আদায়ের মাধ্যমে একই ব্যবস্থা চালু হতে পারে। ফলে উচ্ছেদ, পুনর্দখল ও চাঁদাবাজির চক্র অব্যাহত থাকবে।
হকারদের জীবিকার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ঢাকায় হকার এবং তাঁদের ওপর নির্ভরশীল প্রায় ১০ লাখ মানুষের জীবিকা এ খাতের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে। বিকল্প কর্মসংস্থান বা ব্যবসার উপযুক্ত জায়গা নিশ্চিত না করে হকারদের উচ্ছেদ করা হলে তাঁরা আবারও ফুটপাতে ফিরে আসতে বাধ্য হবেন।
তিনি আরও বলেন, হকার ব্যবস্থাপনা নীতিমালা, ডিজিটাল কার্ড ও নির্ধারিত বিক্রয় এলাকা চালুর উদ্যোগ থাকলেও কতজন হকার নিবন্ধিত হয়েছেন, কতজন বাস্তবে ব্যবসার জায়গা পেয়েছেন এবং সরকারি কোষাগারে কত টাকা জমা হচ্ছে, তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ করা প্রয়োজন।
সমাধান হিসেবে প্রতিটি ওয়ার্ডে হকার ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। তাঁর প্রস্তাব অনুযায়ী, হকারদের নির্বাচিত প্রতিনিধি, স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী এবং সিটি করপোরেশনের প্রতিনিধিদের নিয়ে এসব কমিটি গঠন করা যেতে পারে।
কমিটির মাধ্যমে কোন এলাকায় কতজন হকার বসতে পারবেন, কোন সময়ে ব্যবসা করবেন এবং তাঁদের কাছ থেকে কী পরিমাণ ফি নেওয়া হবে, তা নির্ধারণ করা হবে। এ ক্ষেত্রে পথচারীদের চলাচল, ক্রেতার উপস্থিতি এবং হকারদের আয়ের বিষয়টি বিবেচনায় রাখার প্রস্তাব দেন তিনি।
এ ছাড়া হকারদের প্রতিটি বরাদ্দ প্রকাশ্য ডিজিটাল তালিকায় রাখা, সরকারি ফি সরাসরি নির্ধারিত অ্যাকাউন্টে জমা নেওয়া এবং প্রতিটি লেনদেনের বিপরীতে রসিদ দেওয়ার কথা বলেন তিনি। পাশাপাশি চাঁদাবাজির অভিযোগ জানানোর জন্য স্বাধীন অভিযোগ ব্যবস্থাও চালুর প্রস্তাব দেন।
পাটওয়ারীর প্রস্তাব, প্রথমে ঢাকার কয়েকটি ওয়ার্ডে পরীক্ষামূলকভাবে এ ব্যবস্থা চালু করে এর ফলাফল মূল্যায়ন করতে হবে। পরে কার্যকারিতা বিবেচনায় পুরো ঢাকায় তা সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। একই সঙ্গে বিকল্প স্থানে হকারদের ব্যবসার ব্যবস্থা করার পর সংশ্লিষ্ট ফুটপাত দখলমুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
তিনি বলেন, যেখানে ক্রেতা নেই, সেখানে দোকান বরাদ্দ দেওয়া পুনর্বাসন নয়। আবার জীবিকার বিকল্প নিশ্চিত না করে উচ্ছেদ করাও স্থায়ী সমাধান হতে পারে না। পথচারীদের চলাচলের অধিকার, হকারদের জীবিকা এবং সিটি করপোরেশনের বৈধ রাজস্ব—এই তিনটি বিষয়কে একই ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে হবে।
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর মতে, শুধু ফুটপাত পরিষ্কার করলেই সমস্যার সমাধান হবে না; এর সঙ্গে জড়িত চাঁদাবাজির অর্থনীতিও বন্ধ করতে হবে। অন্যথায় উচ্ছেদ ও পুনর্দখলের ঘটনা চলতেই থাকবে।