মাদকের টাকা থেকে ভাগ না পেয়ে কিছু সাংবাদিক পুলিশকে অকার্যকর বলে সংবাদ প্রকাশ করছেন বলে মন্তব্য করেছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেছেন, পুলিশের কোনো সদস্য অপরাধে জড়িত থাকলে তাঁর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) পুরান ঢাকার চকবাজারে ‘কমিউনিটি ইসলামিক ব্যাংক সিস্টেম’-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে এসব কথা বলেন আইজিপি।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, কেউ যেন আইন নিজের হাতে তুলে না নেন। গুজব ও মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে একটি গোষ্ঠী মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, পলাতক সরকারের ১৭ বছরের শাসনামলে বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেশকে অকার্যকর করে দেওয়া হয়েছিল।
আইজিপি বলেন, পাড়া-মহল্লায় মাদকের বিস্তার ঘটেছে। অতীতে ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের কেউ কেউ মাদক ব্যবসা থেকে মাসোহারা নিতেন। পুলিশের কিছু সদস্যও এসব কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন, এখনো কেউ কেউ রয়েছেন। তবে পুলিশ বিভাগ অপরাধে জড়িত নিজেদের সদস্যদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিচ্ছে। গত দুই মাসে ২৭ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে বলে জানান তিনি।
মাদক গ্রহণ ও ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রসঙ্গে আলী হোসেন ফকির বলেন, ব্যক্তিস্বাধীনতার অর্থ যা ইচ্ছা তা করার অধিকার নয়। মদ্যপান করে মাতলামি কিংবা কোকেন ও হেরোইনের মতো মাদক গ্রহণের মতো কর্মকাণ্ডকে ব্যক্তিস্বাধীনতার নামে বৈধতা দেওয়া যায় না। সবাইকে আইন, নৈতিকতা ও সামাজিক মূল্যবোধ মেনে চলতে হবে।
পুলিশের সমালোচনা প্রসঙ্গে আইজিপি বলেন, কথায় কথায় পুলিশের ওপর চড়াও হলে এবং দায়িত্ব পালনে সহযোগিতা না করলে সমাজে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। একদিকে পুলিশকে অশিক্ষিত বলে সমালোচনা করা হয়, অন্যদিকে কনস্টেবল নিয়োগে শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। অথচ সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কাজ করতে হয় পুলিশকে। এ জন্য দক্ষ ও শিক্ষিত জনবল প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের ব্যর্থতা, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ কিংবা শিল্পকারখানায় বেতন নিয়ে শ্রমিক অসন্তোষের মতো বিভিন্ন পরিস্থিতিতে পুলিশকে দায়িত্ব পালন করতে হয়। আবার আইন প্রয়োগ করে কাউকে কারাগারে পাঠালে পুলিশের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা হরণের অভিযোগ ওঠে। এভাবে পুলিশকে অকার্যকর করে দেওয়ার পরও সব দায় পুলিশের ওপর চাপানো হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মাদকবিরোধী অভিযান প্রসঙ্গে আইজিপি অভিযোগ করেন, মাদক ব্যবসার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে কেউ কেউ নিজেরাই দলবদ্ধ হয়ে চাপ সৃষ্টি করছেন এবং সেখান থেকে গোপনে অর্থ নিচ্ছেন। তাঁর দাবি, এসব জায়গা থেকে অর্থ না পেয়ে কিছু সাংবাদিক পুলিশকে অকার্যকর বলে সংবাদ প্রকাশ করছেন। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, পুলিশ আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় মানবাধিকার লঙ্ঘন কিংবা অনাকাঙ্ক্ষিত বলপ্রয়োগ করেনি।
পুলিশের জবাবদিহির বিষয়ে তিনি বলেন, কোনো পুলিশ সদস্য অপরাধ করলে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ব্যবস্থা না নিলে সে বিষয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ রয়েছে। তবে মিথ্যা অভিযোগ ও গুজবে বিভ্রান্ত না হয়ে প্রকৃত ঘটনা শনাক্ত করে প্রতিকার নিশ্চিত করতে হবে।
নির্বাচন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আইজিপি বলেন, কে ক্ষমতায় আসবে বা রাজনৈতিকভাবে কী ঘটবে, তা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিবেচ্য বিষয় নয়। আইন ও সংবিধান অনুযায়ী যেখানে যে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন, পুলিশ তা-ই করবে। প্রয়োজন হলে এবং সরকার অনুমোদন দিলে ক্রসফায়ারের মতো বলপ্রয়োগমূলক ব্যবস্থাও নেওয়া হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, পুলিশ বলপ্রয়োগ করলে তাকে ফ্যাসিস্ট পুলিশ বলা হয়, আবার নীরব থাকলে দুর্বল পুলিশ আখ্যা দেওয়া হয়। এ পরিস্থিতিতে পুলিশকে দায়িত্ব পালনের উপযুক্ত পরিবেশ দিতে হবে। দেশের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা, শান্তি ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর পুলিশের পরিস্থিতি তুলে ধরে আলী হোসেন ফকির বলেন, সে সময় অনেক পুলিশ সদস্য রাস্তায় দায়িত্ব পালন করতে ভয় পেতেন। সেই অবস্থা কাটিয়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়া এবং মানুষের জন্য শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পুলিশ দিনরাত কাজ করছে বলে দাবি করেন তিনি।
পুলিশকে ব্ল্যাকমেইল না করার আহ্বান জানিয়ে আইজিপি বলেন, পুলিশকে যেমন ব্ল্যাকমেইল করা যাবে না, তেমনি পুলিশের সদস্যদেরও ব্ল্যাকমেইলের শিকার হওয়া যাবে না। বিভিন্ন বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে সবাই নিজের পক্ষে সিদ্ধান্ত চান উল্লেখ করে তিনি এ ধরনের মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে কমিউনিটি ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির পরিচালক, ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং ব্যাংকটির বিভিন্ন পর্যায়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।